শিরোনাম

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ  |  ০১:৪০, জুন ১৩, ২০১৯

দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরপরও প্রতি বছরই দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বিপুল শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। আর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার শঙ্কা জাগাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের মনে। শুধু ২০১৮ সালেই প্রাথমিক স্তরে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ ও মাধ্যমিক স্তরে ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। আর এই ঝরে পড়াকে এখনো বেশ উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটা গুণগত পরিবর্তনের চেষ্টা গত কয়েক বছর ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে। শতভাগ শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকার শিক্ষার জন্য বেশ কিছু পদ্ধতিও চালু করেছে। এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তনও এসেছে। উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ ও স্কুল ফিডিংয়ের মতো বড় কর্মসূচি চালুর ফলে প্রাথমিক স্তরে শিশুদের অংশগ্রহণ প্রায় শতভাগ। এ স্তরে শিশুদের পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার হারও মোটামুটি ভালো।

কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় এদের মাধ্যমিক স্তরে ধরে রাখা যাচ্ছে না। মাধ্যমিক স্তরে এসে বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। তবে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ সরকারকে আরও গুরুত্বসহকারে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, ঝরে পড়ার কারণ খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির দেয়া তথ্যানুযায়ী শুধু ২০১৮ সালেই দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ঝরে পড়েছে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর মাধ্যমিক স্তরে একই সময়ে ঝরে পড়েছে ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী।

চট্টগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক জরিপ (২০১৮) অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা হতে ঝরে পড়ার হার ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, দারিদ্র্য, অভিভাবকের অসচেতনতা, শিশুশ্রম, অশিক্ষা, বাল্যবিবাহ ও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে।

আর চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার তুলে ধরেন। শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ সালে ৫৫ দশমিক ৩১ শতাংশ, ২০১০ সালে ৫৫ দশমিক ২৬ শতাংশ, ২০১১ সালে ৫৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, ২০১২ সালে ৪৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৪৩ দশমিক ১৮ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৪১ দশমিক ৫৯ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৪০ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৩৮ দশমিক ৩০ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৩৭ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ।

শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনির উপস্থাপিত তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথম দিকে ঝরে পড়ার হারে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ব্যবধান বেশি থাকলেও ক্রমান্বয়ে এই ব্যবধান কমেছে। ২০০৯ সালে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ছিল ৪২ দশমিক ১৫ শতাংশ আর মেয়েদের এই হার ছিল ৬৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অপরদিকে, ২০১৮ সালে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার ৩৬ দশমিক ০১ শতাংশ আর মেয়েদের ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ। এদিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার এই পরিসংখ্যান এখনো বেশ উদ্বেগের বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক আমার সংবাদকে বলেন, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার গত ১০ বছরে ৫৫ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশতে নেমে এসেছে। ফলে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলা যায়। তবে এখনো এত সংখ্যক শিক্ষার্থী কেনো ঝরে পড়ছে তা নির্ণয় করতে হবে। তারপর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা, ঝরে পড়ার এই হার আসলেই উদ্বেগের।

তিনি আরও বলেন, সাধারণত দুটি কারণে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। এর মধ্যে একটি আর্থিক কারণ অন্যটি পারিবারিক কারণ। যারা আর্থিক কারণে ঝরে পড়ে, তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে। বিশেষ করে যারা পারিবারিক কারণে ঝরে পড়ে তাদেরকে সচেতন করতে হবে। এখনো অনেক পরিবার রয়েছে যারা মনে করে শিক্ষার কোনো দরকার নেই। এর থেকে কাজ করলে অর্থ পাবে। শিক্ষা যে শুধু টাকা উপার্জনের জন্য নয় তা উপলব্ধি করানো জরুরি। এসব পরিবারকে বোঝাতে হবে, মানুষিক বিকাশের জন্যও শিক্ষাটা জরুরি।

ড. আরেফিস সিদ্দিক বলেন, এরপরও শতভাগ ঝরে পড়া রোধ করা সম্ভব নয়। তবে ঝরে পড়ার হার কমানো সম্ভব। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারকেও উদ্বেগজনক বলে মনে করেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কাজী আবু নাসের আজাদ।

তিনি আমার সংবাদকে বলের, যদি প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ হয়, তাহলে এটা বেশ উদ্বেগের বিষয়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী শিশুদের ঝরে পড়ার হার শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে শিক্ষকরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের কর্তৃপক্ষকে আরো ভাবতে হবে। একই সাথে ঝরে পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, মন্ত্রী মহোদয় এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার এই হারকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. এমাজউদ্দিন আহমদ আমার সংবাদকে বলেন, দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার বড় কারণ বেকারত্ব। দেশে কর্মস্থানের অভাবে শিক্ষা থেকে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

শিক্ষিত হয়ে বসে থাকার চেয়ে অন্যকিছু করার চেষ্টা করছে। ফলে শিক্ষাবিমুখতা বাড়ছে। আবার আর্থিক কারণেও অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমিয়ে আনতে ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টির তাদিগ দেন এই শিক্ষাবিদ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত