শিরোনাম

আবারো ফাঁসছেন ডিআইজি মিজান

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:৪৩, জুন ১৩, ২০১৯

পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান দুদকের মামলায় আবারো ফেঁসে যাচ্ছেন। সম্পদ অনুসন্ধান তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ঘুষ দেয়ার তথ্য ফাঁস করেই তিনি পুনরায় ফেঁসে যাচ্ছেন। অপরদিকে, দুদক কর্মকর্তাও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ থেকে সহজেই রেহাই পাচ্ছেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল পুরান ঢাকার কারা অধিদপ্তরের এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ডিআইজি মিজান নিশ্চয়ই অপরাধ ঢাকতে ঘুষ দিয়েছেন। তার আগের অপরাধের বিচার চলছে। নতুন করে যদি ঘুষ দেয়ার মতো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

অপরদিকে ডিআইজি মিজানুর রহমানের সম্পদ অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে পরিচালক মর্যাদার এক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নতুন অনুসন্ধান কর্মকর্তা হলেন দুদক পরিচালক মঞ্জুর মোরশেদ। গতকাল বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদক প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল হক খান।

ঘুষ লেনদেন ও তথ্য পাচারের অভিযোগে আগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপরই নিয়োগ দেয়া হলো মঞ্জুর মোরশেদকে। গত ২৩ মে ডিআইজি মিজানুর রহমানের সম্পদ অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন এনামুল বাছির। আগের ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদন আমলে নেয়নি দুদক।

কত সম্পদ ডিআইজি মিজানুর রহমানের?
আবারো আলোচনায় আসলে পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমান। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নেমে দুদক কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেয়ার তথ্য ফাঁস করেছেন। আর তার অভিযোগের পক্ষে ঘুষ লেনদেনের অডিও কথোপকথন প্রকাশ করেন তিনি। এতে স্বাভাবিকভাবেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সকলের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে, যিনি দুর্নীতি থেকে বাঁচতে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে পারেন; আসলে তিনি কত সম্পদের মালিক।

পুলিশ সদরদপ্তর ও দুদক সংশ্লিষ্টদের মাঝে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিআইজি মিজানের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ার তথ্য ফাঁস হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হয়েও ডিআইজি মিজান কীভাবে ঘুষ দিলেন? যেখানে ঘুষ দেয়া ফৌজদারি অপরাধ। আর এই বিষয়টি পুলিশ দপ্তরের নজরে এসেছে বলে এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

অপরদিকে, ডিআইজি মিজানের ঘুষ দেয়ার অভিযোগের তথ্য ফাঁসের পরই দুদক কর্মকর্তা বাসিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, ডিআইজি মিজান শুধু নিজের নামেই সম্পদ গড়েননি, ভাই ও ভাগ্নের নামেও সম্পদ করে দিয়েছেন। আর তার সম্পদের মধ্যে সাভারে পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটিতে নিজের নামে পাঁচ কাঠা জমি। পূর্বাচল নতুন শহর এলাকায় পাঁচ কাঠা জমি।

ঢাকায় পুলিশ অফিসার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির পুলিশ টাউনে সাড়ে সাত কাঠার প্লট। বরিশালের মেহেদিগঞ্জ পৌরসভায় ৩২ শতাংশ জমিতে দুই হাজার ৮০০ বর্গফুটের দোতলা ভবন। তার প্রথম স্ত্রী সোহেলিয়া আনার রত্নার নামে উত্তরা রেসিডেন্সিয়াল মডেল টাউনে এক হাজার ৭৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। নিউ বেইলি রোডে ছোট ভাই মাহবুবুর রহমান স্বপনের নামে দুই হাজার ৪০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট।

রাজধানীর কোতোয়ালি থানার পাইওনিয়ার রোডে ভাগ্নে এসআই মাহমুদুল হাসানের নামে এক হাজার ৯১৯ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। কানাডার টরন্টোতে রয়েছে ডিআইজি মিজানের নামে একটি ফ্ল্যাট। একটি কালো পাজেরো জিপ ব্যবহার করেন ডিআইজি মিজান। তবে তার প্রকৃত মালিক কে, সে বিষয়ে তথ্য জানাতে পারেনি দুদক।

এছাড়া মিজানের দুই সন্তান কানাডায় পড়াশোনা করে। বরখাস্ত হওয়া দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির গত ২৩ মে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশসহ অনুসন্ধান প্রতিবেদন সেগুনবাগিচায় দুদক প্রধান কার্যালয়ে জমা দেন। তাতে ডিআইজি মিজানের চার কোটি দুই লাখ ৮৭ হাজার টাকার সম্পদ আছে। এর মধ্যে তার নিজের নামে আছে এক কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার টাকার স্থাবর ও ৯৬ লাখ ৯২ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ।

দুদক সূত্র জানায়, ডিআইজি মিজান তার আয়কর নথিতে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে এক কোটি ৫৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ডিআইজি মিজানের স্ত্রী রত্নার বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়নি। তবে তার বিরুদ্ধে এখনো অনুসন্ধান চলছে। আর রত্নার আয়কর নথিতে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে ৮৫ লাখ ৪৬ হাজার ৯৩৫ টাকার তথ্য দিয়েছেন। আর তার আয়ের উৎস পাওয়া গেছে ১২ লাখ ৫৫ হাজার ৯৮৩ টাকার।

দুদক পরিচালক বাছির এর আগেও ৪০ মাস সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন : দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কৃত দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির এর আগেও একবার ৪০ মাস সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। তখন ৩৫০ কোটি টাকা উদ্ধার সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ওই তদন্তে অসততার অভিযোগ উঠলে তাকে বরখাস্ত করা হয়। পরে পরিস্থিতি সামলে উঠে চাকরিতে পুনর্বহাল এবং পদোন্নতিপ্রাপ্ত হন। ডিআইজি মিজানুর রহমানের দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান, তথ্য ফাঁস ও ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় বিতর্কিত এ কর্মকর্তা নিজের নামে কোনো সম্পদ নেই বলে দাবি করেছেন।

অনুসন্ধানে তার নামে রাজধানীর মেরাদিয়ায় ছয় শতাংশ জমির ওপর স্থাপিত একটি স্কুলের সন্ধান মিলেছে। এ ছাড়া তার স্ত্রী নামে উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। স্ত্রী রুমানা শাহীন শেফা মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

তার স্ত্রী শেফার সার্ভিস অ্যাকাউন্টের বাইরে কোনো ব্যাংক হিসাব না থাকার দাবি করেছেন এনামুল বাছির। তবে রুমানা শাহীন শেফার নামে সার্ভিস অ্যাকাউন্টের বাইরে সোনালী ব্যাংকে এবং বাছিরের নামে এক্সিম ব্যাংকে দু’টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য রয়েছে বলে জানা গেছে। অপরদিকে, অসততার অভিযোগে এর আগেও ৪০ মাস সাময়িক বরখাস্ত থাকার বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে এনামুল বাছির স্বীকার করেছেন।

স্ত্রীকে ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ বানাতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দেন বাছির : দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে তার স্ত্রী শেফাকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বানাতে চেয়েছিলেন। শেফাকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পরিষদের চার সদস্য নিয়ে একটি নিয়োগ কমিটিও গঠিত হয়। তবে নিয়োগ নিয়ে ৩০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠলে গত ২৯ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে। পরে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। বিষয়টি এখন তদন্তাধীন রয়েছে।

সূত্র জানায়, মোট চারজনকে ৩০ লাখ টাকা ঘুষও দিয়েছিলেন দুদক কর্মকর্তা বাছির। রুমানা শাহীন শেফা বর্তমানে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। রুমানা শাহীনকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য ভিকারুননিসার গভর্নিং বডি একটি নিয়োগ কমিটি গঠন করে। গত ২৭ এপ্রিল লিখিত পরীক্ষায় মোট ১৩ জন প্রার্থীর মধ্যে রুমানা শাহীনও পরীক্ষা দেন। সে পরীক্ষায় মাত্র সাড়ে ৩ নম্বর পান তিনি। তবুও মৌখিক পরীক্ষায় ও অ্যাকাডেমিক পারফরমেন্সের মাধ্যমে তাকে পরীক্ষায় প্রথম করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘ডিআইজি মিজান নিশ্চয় অপরাধ ঢাকতে ঘুষ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার আগের অপরাধের বিচার চলছে। নতুন করে যদি ঘুষ দেয়ার মতো অপরাধ করে থাকেন তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর কারা অধিদপ্তরের কারা-কনভেনশন সেন্টারে দিনব্যাপী ‘উদ্ভাবনী মেলা ও শোকেসিং ২০১৯’ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘তিনি কেন ঘুষ দিয়েছেন? নিশ্চয়ই তার কোনো দুর্বলতা আছে। তা না হলে সে কেন ঘুষ দেবেন? দুর্বলতা ঢাকতে তিনি ঘুষ দিয়েছেন। ঘুষ দেয়া-নেয়া দুটোই অপরাধ। তার বিরুদ্ধে আগের অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার এখনো প্রক্রিয়াধীন।’

এ ছাড়া, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরোয়ানাভুক্ত আসামি ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের গ্রেপ্তারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে ধরা যাচ্ছে না বিষয়টি ঠিক নয়। তার বাইরে যাওয়ার সব পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তিনি দেশেই আছেন। তাকে শিগগির গ্রেপ্তার করা হবে।

ফেনীতে হত্যাকাণ্ডের শিকার মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহানের জবানবন্দির ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়ানোর অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এক মামলার আসামি সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনাল পুলিশের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। উল্লেখ্য, দুর্নীতির অনুসন্ধানে নেমে দুদক কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাছির ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন।

এমন অভিযোগের পক্ষে ঘুষ লেনদেনের অডিও কথোপকথন প্রকাশের পর আবারো আলোচনায় পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমান। দ্বিতীয় বিয়ে গোপন করতে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আছে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে। দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারকে প্রভাব খাটিয়ে গ্রেপ্তার এবং এক সংবাদ পাঠিকা ও এক নারী রিপোর্টারকে যৌনহয়রানির অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে।

পুলিশের নিয়োগ, বদলিতেও একসময় ভূমিকা রাখতেন তিনি। গ্রেপ্তর ও মামলা দিয়ে হয়রানি করে টাকা আদায়ের অভিযোগও আছে এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার ছিলেন ডিআইজি মিজান। সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনারও ছিলেন তিনি। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ছিলেন। পরে সেখান থেকে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত