শিরোনাম

জামিন শুনানিতেও নেই মোয়াজ্জেম

প্রিন্ট সংস্করণ॥নুর মোহাম্মদ মিঠু  |  ০১:৩০, জুন ১২, ২০১৯

ফেনীর আলোচিত নুসরাত হত্যাকাণ্ডে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে করা মামলায় যেন নাটক-নাটক খেলায় মত্ত রয়েছে পুলিশ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহল। বিশ্বব্যাপী আলোচিত এ ঘটনায় অন্যসব অপরাধীরা আইনের আওতায় এলেও আদৌ আইনের চোখে ধুলা দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন।

ফেনী থেকে রংপুর নাটকের ইতি কি আদৌ শেষ করতে পারবে পুলিশ বিভাগসহ সরকার— এমন প্রশ্নে ঘুরপাক খাচ্ছে গোটা দেশের মানুষ। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে উড়ন্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ।

এমন একটি আলোচিত ঘটনায় জড়িত অন্যসব আসামিদের এবং ক্ষমতাসীন দলের জড়িত নেতাকর্মীদেরও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হলেও কেন ওসি মোয়াজ্জেমকে ধরা যাচ্ছে না— এমন প্রশ্নের উত্তরও মিলছে না সহজেই!

আইনের লোক হওয়াই কি ওসি মোয়াজ্জেমের পার পেয়ে যাওয়ার কারণ? যদি তাই না হয় তাহলে পুলিশের উপরমহল কেন জানে না ওসি মোয়াজ্জেম কোথায়? এবং কীভাবে তিনি পালাতে সক্ষম হলেন, কেন তাকে নজরদারিতে রাখা হলো না?

এমন প্রশ্নের উত্তর আজ সারা দেশের মানুষের। পাশাপাশি মানবাধিকারকর্মীদেরও ভাষ্য, মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেপ্তারে ব্যর্থতা পুলিশবাহিনীর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করবে। এটা যদি পুলিশের গাফিলতি হয়, তাহলে আমাদের জন্য সেটা খুবই উদ্বেগের বিষয়।

আর যদি সেটা পুলিশের অযোগ্যতার বিষয় হয়, তাহলে সেটা আরও বড় উদ্বেগের ব্যাপার। কারণ অন্যায়ের প্রতিকার পাবার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা এতে নষ্ট হয়ে যায়। এদিকে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে করা মামলার প্রেক্ষিতে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও আগাম জামিন আবেদন করেন তিনি।

জামিন আবেদন করা পর্যন্ত আদালতের প্রতি আস্থা থাকলেও জামিন আবেদন শুনানির আগেই তিনি আস্থাহীনতার পরিচয় দিয়েছেন বলে মনে করছেন অনেকেই। গতকাল মঙ্গলবার তার করা আবেদনের শুনানির দিন ধার্য থাকলেও তিনি উপস্থিত না হয়েই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

প্রশ্ন উঠছে, গ্রেপ্তার এড়াতেই কি নিজের করা জামিন আবদনের শুনানিতেও অনুপস্থিত ওসি মোয়াজ্জেম পুলিশ ঢিলেঢালা ভূমিকার সুযোগ কাজে লাগিয়েই নিজেকে আড়াল করতে সক্ষম হয়েছেন? যদি তাই না হয়- তাহলে ফেনী জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় পরোয়ানা পাওয়ার কথা কেন অস্বীকার করলো এবং পুলিশের রংপুর রেঞ্জ কার্যালয় থেকে কেন বলা হয়েছে পরোয়ানাটি বিধি মোতাবেক হয়নি। আবার যখন পরোয়ানাটি পাবার কথা স্বীকার করা হয় ঠিক এরই মধ্যে দোটানার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফেরারি বনে যান ওসি মোয়াজ্জেম। গুরুত্বপূর্ণ এরকম একটি বিষয়ে কেন দোটানায় ভুগছে পুলিশ— এমন প্রশ্নও আজ জনমনে।

এদিকে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন আমার সংবাদকে বলেন, গতকাল শুনানির দিন ধার্য থাকলেও ওসি মোয়াজ্জেম তাতে অনুপস্থিত ছিলেন।

যে কারণে শুনানি হয়নি। যেহেতু ওসি মোয়াজ্জেম নিরুদ্দেশ সেহেতু পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে জানতে চাইলে সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, আরও দুদিন সময় রয়েছে। যদি তিনি সারেন্ডার করেন তাহলে বিষয়টি শুনানির মধ্য দিয়ে আদালত তার সিদ্ধান্ত জানাতে পারবেন। কিন্তু এর মধ্যেও যদি তিনি সারেন্ডার না করেন কিংবা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম না হয় তাহলে আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ জানাবেন।

এর আগে ওসি মোয়াজ্জেম হাইকোর্টে জামিন আবেদন করলেও আদালতে আসছেন না। আত্মসমর্পণও করছেন না। তার গ্রেপ্তার এবং পালানোর বিষয়ে মন্ত্রীসহ অনেকেই কথা বলছেন, তারপরও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি অথবা তিনি এখন পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেননি। তার খুঁটির জোর কোথায়? এমন প্রশ্ন তুলেছেন এ আইনজীবী। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম ইঁদুর-বিড়াল খেলছেন।

ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারে ব্যর্থ হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করা হবে বলে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আগামী তিনদিনের মধ্যে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে যদি ব্যর্থ হয় বা তিনি আত্মসমর্পণ না করেন তাহলে ১৬ জুন হাইকোর্টে সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হবে। ওসি মোয়াজ্জেমের নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনায় পুলিশ বলছে, অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন তিনি।

এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। তার একদিন পরই সোমবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসিকে গ্রেপ্তারে সরকারের দিক থেকে কোনো গাফিলতি নেই। বিষয়টি নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে এবং প্রধানমন্ত্রীও খুবই সিরিয়াস। আমাদের পার্টির লোকও তো এখন জেলে এ ঘটনায়। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার গাফিলতি নেই।

এ নিয়ে সরকারপ্রধান অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে এবং সে কারণে এখানে কারো শৈথিল্য দেখানোর কোনো অবকাশ নেই। ধরা এখনো পরেনি, শিগগিরই হয়তো শুনবেন ধরা পড়েছে। ওবায়দুল কাদের এও বলেছেন, ফেরারি আসামি ধরা একটু কঠিন। তার এ মন্তব্যে জনমনে ব্যাপক সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু সারা বিশ্বে আলোচিত এমন একটি ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত একজন আসামি, যিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা তিনি কীভাবে পালিয়ে গেলেন, সে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা-নানা গুঞ্জন চললেও এ নিয়ে কোনো কথা বলেননি তারা। অনেকেই এজন্য পুলিশের গাফিলতি এবং স্বজনপ্রীতির কারণে এমনটি ঘটেছে বলেও অভিযোগ করছেন।

এদিকে, নুসরাত হত্যার ঘটনায় ১৬ জন আসামির বিরুদ্ধে দেয়া চার্জশিট ইতোমধ্যেই আমলে নিয়েছে আদালত। আগামী ২০ জুন এ মামলার চার্জ গঠনের দিন ধার্য করা হয়েছে। মামলার বাদি পক্ষের আইনজীবী শাহজাহান সাজু গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, আদালত নুসরাত হত্যায় গ্রেপ্তার ২১ জনের মধ্যে পাঁচজনকে অব্যাহতি দিয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত