শিরোনাম

কৃষিতে ভর্তুকি ও ব্যাংকে সুশাসন দাবি

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০০:৩৯, জুন ১২, ২০১৯

গত এক দশকে মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এবার ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এই গতিকে আরও এগিয়ে নিতে নির্বাচনের আগে ইশতেহারে অনেক প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে আ.লীগ।

একাদশ নির্বাচনে জিতে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকারও গঠন করেছে। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল। অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি আসন্ন বাজেটে নতুনত্ব আনার চেষ্টাও করেছেন।

বিশেষ করে খেলাপি ঋণ ও সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেন। কর বাড়ানোর পরিকল্পনা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে বৈষম্য কমারও কথা জানান তিনি। গত মার্চে সর্বপ্রথম অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনাও শুরু করেন।

এরপর বিভিন্ন সেক্টরের শীর্ষ নির্বাহীদের চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারেও সভা করেছেন। তাদের সুবিধা-অসুবিধার দাবিগুলো জেনেছেন, শুনেছেন। তা আমলে নিয়েই কাউকে কষ্ট না দিয়ে সহজ ভাষায় আর মাত্র একদিন পরই একাদশ সংসদের প্রথম বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন বর্তমান সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী। তাই অন্যদের মতো অর্থনীতিবিদরাও নতুন মাত্রায় ভাবছেন এবারের বাজেট নিয়ে। তাদের সেই ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে আমার সংবাদের পক্ষ থেকে।

প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সিনিয়র রিপোর্টার জাহাঙ্গীর আলম ও সঞ্জয় অধিকারী

ভ্যাট আইন বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ : এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

নতুন অর্থবছরে নতুন ভ্যাট আইন হচ্ছে। আর এই ভ্যাট আইনের বড় চ্যালেঞ্জ এর বাস্তবায়ন বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। নতুন ভ্যাট আইনে মূল আইনের ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার থাকছে না। একাধিক হার হচ্ছে। এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তিনি। কেননা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট একটু বেশি।

এছাড়া টার্নওভার করের সীমাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা একটু স্বস্তি পাবেন। ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো এ দেশের বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই।

অথচ এসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেওয়ার যোগ্য। তাদের কাছ থেকে কীভাবে ভ্যাট আদায় করা হবে, সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন থাকলেও হিসাব রাখা হয় আলাদা খাতায়। অনেকে গ্রাহকদের ভ্যাটের রসিদ দেন না। এতে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি হয়।

এছাড়া আসন্ন বাজেটে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির একটি বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা। এ জন্য সবার আগে ব্যাংক খাতে বড় সংস্কার করা দরকার বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসনের বড় ধরনের অভাব আছে।

গত কিছুদিনে এই খাতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা এই খাতকে সুশাসনের ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে দিয়েছে। একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পর্ষদে দুজনের পরিবর্তে চারজন রাখার বিধান, আবার একই পরিবারের সদস্যরা ছয় বছরের পরিবর্তে নয় বছর পর্যন্ত পর্ষদের সদস্য থাকতে পারবেন— এগুলো ব্যাংক খাতের সুশাসনের ক্ষেত্রে মোটেই সন্তোষজনক নয় বলে তার অভিমত।

এ ছাড়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বা পরিচয়ের সূত্র ধরে ঋণ দেওয়া এবং ঋণ আদায়ে নমনীয় ভাব দেখানো বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে ঋণখেলাপিদের বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইন মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে বাজেটে একটি দিকনির্দেশনা থাকা উচিত।

অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে বেশকিছু সমস্যা আছে। জমি প্রাপ্তিতে অসুবিধা, জ্বালানিসংকট, সড়ক, রেলসহ বিভিন্ন বড় অবকাঠামোর সমস্যা। অবকাঠামোর সমস্যা সমাধানে ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পগুলো দ্রুত মানসম্পন্নভাবে শেষ করতে হবে। সরবরাহ পর্যায়ে জ্বালানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

এছাড়া বিনিয়োগকারীদের জমির সংকট দূর করতে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো দ্রুত চালু করা দরকার বলে জানান তিনি। বিনিয়োগ চাঙা রাখতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা সহজ করতে হবে। ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া ও ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, আগামী বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করের ন্যূনতম আয়সীমা কিছুটা বৃদ্ধি করা উচিত। কেননা গত কয়েক বছরে এটি বৃদ্ধি করা হয়নি। তাই গত কয়েক বছরের মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করের জন্য ন্যূনতম আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে তিন লাখ টাকা বা তিন লাখ টাকা করা উচিত। এতে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্তরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন।

এছাড়া, শেয়ারবাজারের লভ্যাংশের আয়ের ওপর করমুক্ত রাখার সীমা ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা যেতে পারে। আর বাজেট বক্তৃৃতায় দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত।

বাজেট চাই বাস্তবমুখী -ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ

আসন্ন বাজেটকে বাস্তবমুখী করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই বিশাল আকারের বাজেট দেওয়া হচ্ছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। পাঁচ লাখ কোটি টাকারও বেশি বাজেট দেওয়া হবে। এটা এক হিসেবে বেশি নয়। কিন্তু বাজেটটা যেন বাস্তবমুখী হয়। এটা না হলে বাজেটের সফলতা পাওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, বিরাট বাজেট দিয়ে সেটা ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। অনেক সময় বাজেটে একটি বিশাল ঘাটতি থাকে, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে অনেক ফারাক থাকে। বিশাল খাটতি হলে সরকার বিশাল ট্যাক্স, ফি ইত্যাদির লক্ষ্য নির্ধারণ করে। সরকারের রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্য থাকে, তা পূরণ হয় না। অন্যদিকে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে।

বাজেটের ঘাটতি এড়ানোর জন্য এনবিআর নানা ধরনের চাপ তৈরি করে। কর, ট্যাক্স এবং নানা ধরনের ফি আরোপ করে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ে। মানুষ বিরক্ত হয়। ব্যবসায়ীরা তো ভুক্তভোগী হয়ই, সাধারণ মানুষও এই ভোগান্তি থেকে রেহাই পায় না। অতএব বাজেট দেওয়ার সময় আয়ের উৎস ও কাঠামো ঠিক রাখতে হবে, তখন ব্যয়টাও যুক্তিসংগত ও ফলপ্রসূ হবে।

তিনি বলেন, বাজেট থেকে আপামর জনসাধারণ যেন উপকৃত হয়। এ জন্য একটা কল্যাণমুখী এবং গণবাজেট দিতে হবে। যাতে সার্বিকভাবে মানুষ বাজেট থেকে উপকার লাভ করে। শুধু বিশেষ গোষ্ঠী ও ব্যবসায়ী সমপ্রদায় বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রণোদনা দিলেই হবে না, নতুন বাজেটের ফলে সাধারণ মানুষ যেন উপকৃত হয়, সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

বাজেটের সুফলটা সবাইকে পেতে হবে। বাংলাদেশকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বাজেট জনকল্যাণমুখী করতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধি হতে থাকবে, এমন নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে আরও কিছু বিষয় সামনে আসবে। রপ্তানি বাড়বে, রেমিট্যান্স বাড়বে; কিন্তু এগুলো কিছু সুযোগ মাত্র। জীবনযাত্রার মানও বাড়তে হবে। মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি বিষয়ে বাজেটে গুরুত্ব দিতে হবে, তাহলো কর্মসংস্থান তৈরিতে জোর দিতে হবে। বাজেটের প্রধান যেসব দিক থাকবে, এর মধ্যে এগুলো অন্যতম একটি লক্ষ্য হওয়া উচিত। এজন্য বাজেটে শিল্পোন্নয়নের দিকে জোর দেওয়া উচিত। শিল্প বলতে শুধু রপ্তানি শিল্প নয়। দেশের ভেতরে যে ছোট-বড় ও মাঝারি শিল্প আছে, সেগুলোর উন্নতি করতে হবে।

আমাদের এখানে বর্তমানে সেবা খাত থেকে ভালো আয় হচ্ছে। এখন দরকার শিল্পোন্নয়নে জোর দেওয়া। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। আর উন্নয়নটা যেন শুধু কেন্দ্রমুখী না হয়। উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি প্রচুর পরিমাণে হচ্ছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে, উন্নয়নটা যেন শুধু ঢাকা এবং কিছু বড় শহরকেন্দ্রিক না হয়। সব ধরনের উন্নয়নের সুবিধা ও সুফল যেন সারা দেশের মানুষ উপভোগ করতে পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে।

প্রণোদনার ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। প্রণোদনা যেটা দেওয়া হয় সেটা কিন্তু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এবং নির্বাচিত কিছু প্রতিষ্ঠানকে। ভর্তুকি যারা পায়, তারা পেয়েই যায়। এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রণোদনার ব্যপ্তি বাড়াতে হবে। সুনির্দিষ্ট খাতে এটা সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

ট্যাক্সের ক্ষেত্রেও আওতা বাড়াতে হবে। প্রতিবছর যারা ট্যাক্স দিচ্ছেন, তাদের ওপরেই শুধু চড়াও হলে হবে না। বহু লোকের টিন নম্বর আছে, কিন্তু তারা ট্যাক্স দিচ্ছেন না। এ ছাড়া ঢাকা শহরেও অনেক ব্যবসায়ী আছেন, যারা ট্যাক্সের আওতায় নেই। শনাক্ত করে তাদের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করতে হবে।

নির্বাচনি ইশতেহারে গুরুত্ব দিতে হবে : ড. আতিউর রহমান

অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ভাবনায় বলেছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। সেই আলোকে বাজেটে গুরুত্ব দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নয়। বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছর সরকার কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে তার সূচনা এই বাজেটেই ঘোষণা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, শিক্ষার উন্নয়ন হলেও তার গুণগত উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সবার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য খাতে আরও বেশি বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য এসএমই খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এছাড়া নতুন করে যে ডেলটা প্লান করা হয়েছে তাতে হাওরসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বেশি নজর দিতে হবে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে বড় বড় অবকাঠামো হচ্ছে।

তারপরও আরও অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বেশি করে নজর দিতে হবে। যাতে করে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কারণ প্রতি বছর বাজার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে সামাজিক সুরক্ষার মাত্রা আরও বাড়াতে হবে।

এজন্য আরও বেশি করে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশে বাম্পার ফলন হলেও এবারে কৃষকরা নায্যমূল্য পাচ্ছে না। তাই আসন্ন বাজেটে কৃষিতে বেশি করে ভর্তূকি বাড়াতে হবে বলে সাবেক গভর্নর অভিমত প্রকাশ করেন।

বাজেটে বড় চ্যালেঞ্জ তিনটি : ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

আসন্ন বাজেটে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। চ্যালেঞ্জ তিনটি হলো— কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও টাকার মানের অবনমন।

গত ১০ বছরের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন সময় চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে চিড় ধরেছে। এ থেকে উত্তোরণের জন্য বাজেটে দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। তিনি বলেন, ব্যক্তি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নতি হয়নি।

৮শতাংশ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অমোচনীয় প্রতিবন্ধকতার কারণে সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মুখে রয়েছে। এটা অতিক্রম করা না গেলে উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ হবে না। শক্তিশালীরাই সবসময় সুবিধা পায়। কৃষক, নিম্ন ও মধ্য শ্রেণির উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হয়।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি বেড়েছে। প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা ধরে রাখতে হলে টাকার মান নামাতে হবে। সরকার ডলার বিক্রি করে টাকার মান স্থিতিশীল রাখছে। এটা ঠিক হচ্ছে না। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ অবস্থায় টাকার মানের অবনমন হলেও বিশেষ প্রভাব পড়বে না জনজীবনে।

তিনি বলেন, সুদের হার কমালেও ব্যক্তি খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়েনি। উল্টো তারল্য সঙ্কট বেড়েছে। সামগ্রিক সমাধান না করে শুধু সুদের হার কমিয়ে লাভ হবে না। অর্থনৈতিক নীতিমালা অনুযায়ী না চলায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন না থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে এই চিড় ধরেছে।

এ ধারা থেকে বের হতে হলে অপশাসনের সুবিধাভোগীগোষ্ঠীকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তারা যেন নীতিমালা প্রণয়নে কোনোভাবেই প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর হতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন কলকারখানায় বছরের পর বছর ধরে টানা ভর্তুকি না দিয়ে পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

কৃষিতে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ১ কোটি ৮০ লাখ কার্ডধারী কৃষক রয়েছে। তাদের প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা করে ভর্তুকি দিতে হবে। এতে মোট ব্যয় হবে ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

যা সরকারের জন্য মোটেও কঠিন কাজ নয়। ভর্তুকি না দিলে আগামীতে কৃষি চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এছাড়া আসন্ন বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারের ব্যত্যয় ঘটবে বলেও জানান তিনি।

খেলাপি ঋণ কমাতে হবে : ড. আহসান এইচ মনসুর

অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে হবে। আর ব্যাংককে শক্তিশালী করতে হলে খেলাপি ঋণ কমানোর কোনো বিকল্প নেই। আসন্ন বাজেটে খেলাপি ঋণ কমাতে উদ্যোগ নেয়া জরুরি বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সূত্রে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। সেটি হলে সামগ্রিক অর্থনীতি আরও চাঙা থাকার কথা। ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির কথা নয়। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। অর্থনীতি চাঙা থাকলে ঋণখেলাপিরা কেন টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না?

এ বিষয়ে বাজেটে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা উচিৎ। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের সঙ্গে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির তথ্য-উপাত্তের অনেক অসংগতি আছে। বলা হচ্ছে, উৎপাদন খাতের পারফরম্যান্সের কারণে এবার বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খাতে বেশি প্রবৃদ্ধি হলে কর আহরণ বেশি হওয়ার কথা। রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র ৭ শতাংশ।

এখানেও অস্পষ্টতা রয়েছে। আর ব্যবসা হলো প্রবৃদ্ধির উৎস। ব্যবসা বাড়লে ব্যাংকের আয় বৃদ্ধির কথা। কিন্তু ব্যাংকের আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এসব অসঙ্গতির মূলে রয়েছে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানাভাবে অনৈতিক কর্মকাণ্ড। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রভাব খাটিয়ে তাদের স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছেন।

আর এর প্রভাব পড়ছে সকল ক্ষেত্রে। এই ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অন্যদিকে, বেসরকারি বিনিয়োগের পথ সুগম করতে হবে। তা না হলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি কর্মসংস্থানের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

বর্তমানে এমনিতেই বেকারত্ব বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যা সমাধান করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি শেয়ারবাজারের দিকেও নজর দিতে হবে। দেশি-বিদেশি ভালো মানের কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত