শিরোনাম

খালেদা জিয়ার মুক্তি তারেকের হাতে!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০০:২৮, মে ২৬, ২০১৯

খালেদাকে কারাগারে রেখে লন্ডন নেতার নির্দেশে ক্ষমতাসীনদের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বিএনপিতে। এখন খালেদাপন্থিদের বাদ দিয়ে দলে চলছে পুনর্গঠন। সরকারকে অবৈধ বলে ফের নির্বাচিত ৫ নেতাকে সংসদে পাঠিয়ে সরকারকে বৈধতাও দেয়া হয়।

এখন ফের এই সরকারের অধীনে আরেকটি সিটের স্বপ্নে তারেকের নির্দেশে উপনির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি। কিন্তু খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে ৪৬৫ দিনের হিসেব পাচ্ছে না বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। দিন-বছরের হিসাব পেরিয়েছে তিন মাস আগে। এখন কারাগারেই চলছে খালেদার জীবনধারা। দল থেকে বিক্ষিপ্তভাবে বলা হচ্ছে খালেদার বড় রোগ হয়েছে। তিনি খেতে পারছেন না, হাঁটতে পারছেন না।

এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ এই সময়ে খালেদার মুক্তিতে তারেক জিয়ার কী ভূমিকা ছিলো তা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে জাতীয়তাবাদী আদর্শের বড় একটি অংশ। দলীয় সূত্রের ভাষ্য, খালেদাকে মাইনাস করে তারেকের অবস্থান পাকাপোক্ত হচ্ছে বিএনপিতে। তারেক জিয়া আগামীতে বিএনপির নেতৃত্ব দিতে এখনই দলে তার অনুগতদের নিয়ে সেটআপ সম্পন্ন করছেন। খালেদার উপস্থিতি থাকলে তার কর্মপরিকল্পনা অনেকটাই সফল হবে না।

তাই মির্জা ফখরুলকে হাতে রেখে তার ইচ্ছের সবকিছুই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এখন আর শীর্ষ পর্যায়ের কারো সিদ্ধান্তে দল চলছে না। এ নিয়ে অনেকে ক্ষুব্ধ থাকলেও শেষ বয়সে এসে সম্মান রক্ষায় কেউ মুখও খুলছেন না।

তবে সিনিয়রদের ভাষ্য, খালেদা জিয়ার মুক্তি এখন তারেক জিয়ার হাতে! লন্ডন নেতা যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দেন খালেদাকে মুক্তির জন্য তবেই খালেদা মুক্তি পাবেন। কিন্তু তিনি তা দিচ্ছেন না। লন্ডনে তিনি অনেক সভা-সেমিনার করলেও এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য এককভাবে কোনো প্রোগ্রাম করেননি।

প্রতিদিনই দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে নানান মাধ্যমে কথা বলছেন কিন্তু মায়ের মুক্তির জন্য জোরালোভাবে কোনো নির্দেশনা দিচ্ছেন না বলেও অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার অভিযোগ রয়েছে। দল পরিচালনার নির্দেশনা আছে কিন্তু খালেদা মুক্তির জন্য নেই দলে কোনো ভূমিকা। খালেদাকে কারাগারে রেখে তারেক-ফখরুলের স্বার্থবাদী ভূমিকা দলে এখন অনেকটাই স্পষ্ট বলে দাবি অনেকের।

তবে খালেদার মুক্তি হলে বিএনপি বাঁচবে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতারা। খালেদা জিয়াকে মুক্তির জন্য কেন দল থেকে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক ভূমিকা আসেনি এ নিয়ে লন্ডন নেতাসহ শীর্ষ সব নেতার ওপর ক্ষুব্ধ মাঠের নির্যাতিত ত্যাগী নেতারা। ঘরোয়া বৈঠকে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে অনেকে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

সমপ্রতি ছাত্রদলের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেন্দ্রীয়দের জোট, ফোট, ভোট, সংসদ সব তো হলো! কিন্তু দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য কি হলো? আমি অধম সেটা আজও বুঝতে পারলাম না! বলি কি, সবকিছু বাদ দিয়ে একমাত্র দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য একটা আলাদা সংগঠন তৈরি করা উচিত। আর সেটা করা উচিত তৃণমূল নেতাকর্মীদের। যেটা আন্দোলনের অংশ হিসেবে নয়, একমাত্র আন্দোলনের জন্যই গঠিত হবে সেটা হলো ম্যাডামের মুক্তির। অধিকার চাওয়ার জন্য নয়, অধিকার আদায় করার জন্য হবে।

এর আগে খালেদা জিয়ার মুক্তিতে একটি আবদ্ধ কক্ষে গণঅনশনে দলের শীর্ষ এক নেতা এভাবেই প্রকাশ্যে বলেছেন- গোঁজামিল দিয়ে চলবে না এখানে, গোঁজামিল বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে ডাকুন মহাসচিব, স্বেচ্ছায় কারাবরণ করবো আমরা।

রাজপথে নামুন কর্মসূচি দিন... অন্যদিকে স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, আন্দোলন ছাড়া বেগম জিয়ার মুক্তি অর্জন করা সম্ভবপর হবে না। এটা আমরা বুঝি সবাই। আর কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে আইনি প্রক্রিয়ায় নয়, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্যদিয়েই মুক্ত করতে হবে বলে জানিয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

আর এজন্য দলের নেতাকর্মীদের বড় ধরনের আন্দোলন-সংগ্রামের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এদিকে আন্দোলন না করে বিএনপির বড় পদধারী নেতারা কি করছেন। ঘরে-বাইরে এর ব্যাখ্যা না তুলে ধরে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে খালেদা জিয়ার দল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দলীয় ফোরামে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে লন্ডনে পলায়নরত তারেক জিয়া এখন সিদ্ধান্তের মালিক। তারেক জিয়ার নির্দেশেই বিএনপি চলছে। দলে এ নিয়ে অনেক ঝড়ও বইছে। খালেদার মুক্তিতে যাকেই ভূমিকা পালন করতে বলা হয়, তখন সবাই সবকিছু তারেক জিয়ার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।

অনেক নেতা এভাবেই বলছেন, তারেক জিয়ার সঙ্গে আমার এ বিষয়ে কথা হয়েছে, এ মুহূর্তে দলে আমার কি ভূমিকা থাকা দরকার তারেক জিয়া আমাকে নির্দেশনা দিয়েছেন, আমি সেই মতেই কাজ করছি।

খালেদা জিয়ার মুক্তিতে ভূমিকা পালনের জবাবদিহির জায়গায় এলে স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা ও নির্বাহী সদস্যসহ সবাই এমন উত্তর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন।

দলীয় নেতাকর্মীদের মত, এমন দাবির প্রেক্ষিতে দলের কর্মকাণ্ডগুলোতেও এর প্রভাব দৃশ্যত। অন্যদিকে দু-একজন স্থায়ী কমিটির নেতাকে নিয়ে ফখরুল চাঙ্গা গুলশানে। প্রায় প্রতিদিনই তিনি গুলশানে আসছেন। কিছু নেতা নিয়ে বৈঠকও করছেন।

দলে এমন অভিযোগও রয়েছে, শান্তিপ্রিয় কিছু নেতা নিয়ে ফখরুল তার বাসায়ও অনেক প্রোগ্রাম করে যাচ্ছেন।আবার এখন ফখরুল ঘনঘন চিকিৎসার কথা বলে দেশের বাইরেও যাচ্ছেন। অনেকের অভিযোগ ফখরুল দেশের বাইরে গিয়ে তারেকের সঙ্গে বৈঠক করেন। তারেককে বুঝিয়ে আসেন। আর সঙ্গে নিয়ে আসেন তারেকের প্রেসক্রিপশন। খালেদাকে কারাগারে রেখে দীর্ঘ এই সময়ে মহাসচিবের ভূমিকা কি ছিলো এ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে।

খালেদাকে কারাগারে রেখে ৪৬৫ দিন ফখরুল শুধু আবেগ-ক্রন্দনেই সময় পার করেছেন। নরম ভাষায় মানবন্ধনে-প্রেস ব্রিফিংয়ে মুক্তির জন্য আহ্বান করেছেন। বহু সময় খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ এলে গণতন্ত্রের জন্য অঝোরে কান্নাও করেছেন। আবার কখনো আবেগাপ্লুতও হয়ে গিয়েছিলেন।

এ নিয়ে দলের অনেক নেতা ক্ষুব্ধও! যেখানে দল পরিচালনায় মহাসচিব দৃঢ নয়, সেখানে তাহলে তৃণমূলের কী অবস্থা হবে। মহাসচিবের আবেগ-কান্নায় দলে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বলেও দাবি উঠেছে। অনেকে মন ভেঙে মাঠে নামার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন।

আর রুহুল কবির রিজভী চাঙ্গা পল্টনে। ২৪ ঘণ্টার বড় অংশজুড়েই তিনি সিরিজ মিটিংয়ে ব্যস্ত। যখন মন চাচ্ছে তখন মাঝে মধ্যে ১৫-২০ লোক নিয়ে মিছিলও করছেন। তবে তারেকের সঙ্গে যে খালেদার মতে অমিল তা সমপ্রতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, দলের চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ নিয়ে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের দূরত্ব নিয়ে অনেক কথা রাজনৈতিক মাঠে থাকলেও তেমন গুরুত্ব পায়নি।

তবে সমপ্রতি বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে তারেকের সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই শীর্ষনেতার দারুণভাবে স্পষ্ট হলো। উপনির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত স্থায়ী হয়নি কমিটিতে, মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক বসেনি। খালেদা জিয়াকেও জানানো হয়নি কিছুই। উল্টো তাকে প্রার্থী করতে মনোনয়নপত্র পাঠানো হয়।

দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো গণমাধ্যমকে বলছে, তারেক রহমানের তত্ত্বাবধানে বিএনপির সাংগঠনিক প্রক্রিয়া যেভাবে চলছে, তা মেনে নিতে পারছেন না নীতিনির্ধারকদের প্রায় সবাই। বগুড়া আসন নিয়ে তারেকের আচরণে খালেদা জিয়াও চরম ক্ষিপ্ত।

এছাড়া সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে তারেক রহমানের মতপার্থক্যের বিষয়টি খালেদা জিয়ার কানে গেছে। বিষয়টি নিয়ে খালেদা জিয়া চরম বিব্রতবোধ করেন বলেও খালেদা অনুসারীদের দাবি।

বিষয়টি নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব আবদুস সাত্তার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বেগম জিয়ার কাছে বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র পাঠানো হলেও তিনি স্বাক্ষর করেননি।

নেতাকর্মীরা বলছেন, বগুড়ায় প্রার্থী না হয়ে খালেদা জিয়া একটি বার্তা দিয়েছেন। এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয় এবং তাদের সঙ্গে সমঝোতা যে তিনি করতেন চান না তা স্পষ্ট করেছেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত