শিরোনাম

ওপারে মোদি সুনামিতে এপারে চলছে হিসাব!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০২:৫১, মে ২৫, ২০১৯

*অমীমাংসিত বিষয়ের সুরাহা হওয়ার আশা করছেন শেখ হাসিনা
*মোদিতে অতুষ্ট নয় বিএনপি কংগ্রেসের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা চায়
*রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব-সুরক্ষা চায় এরশাদসহ বাম দলগুলো

বিপুল সমর্থনে ফের সরকার গঠন করতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ থেকে পাচ্ছেন অজস্র শুভেচ্ছা বার্তা। এই বিপুল জয়ের পর তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো থেকেও মিলছে শুভেচ্ছা।

সংসদের বিরোধী দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টি নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি পাঠিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েছে বাম দল ন্যাপও। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে মোদিকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

ওপারে মোদি সুনামিতে এপারের রয়েছে অনেক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। ক্ষমতাসীন দল চাচ্ছে অমীমাংসিত বিষয়ের সুরাহা। আর রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব- সুরক্ষা চায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ বাম দলগুলো। সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদার দলেও আছে এ নিয়ে নানা হিসাব। আপাতত তারা মোদিতে অতুষ্ট নয়। সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে দাবি জানাচ্ছে দলটি।

জানা যায়, দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের জন্য ঢাকা থেকে সবার আগে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এপারের ক্ষমতাসীন দল। নতুন সরকার জনগণের সুখ-সমৃদ্ধিতে আরও বেশি কাজ করবে বলে আশা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। লোকসভা নির্বাচনের এই ফলাফলের পর নতুন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকার আওয়ামী লীগের কিছু অমীমাংসিত বিষয়ের সুরাহা হওয়ার আশাও করছেন শেখ হাসিনা।

গত পাঁচ বছরের বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের সম্পর্কের বেশ উন্নতি হয়েছে। উল্টোদিকে আবার কংগ্রেসের সঙ্গেও আওয়ামী লীগের সম্পর্ক বেশ ভালো বলে দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের। আওয়ামী লিগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, জনগণের ক্ষমতায় বিশ্বাসী ও জনরায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

তিনি আরো বলেন, দল প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আগ্রহী। গত পাঁচ বছরে বিজেপি ক্ষমতায় থাকার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। এবার তা আরও অগ্রসর হবে বলে আশাবাদী তারা। কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে সুরাহা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জানা যায়, ভারতে কংগ্রেসের সঙ্গেও আওয়ামী লীগের সম্পর্কটা ঐতিহাসিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় থেকে এই সম্পর্ক। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গেও কংগ্রেসের পারিবারিক সম্পর্ক আছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগের জন্য কংগ্রেসের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা অনেক সহজ।

২০০১ সালে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সরকারকে দায়ী করেন। আর ওই সময় ভারতে বিজেপি ক্ষমতাসীন ছিল। তবে দলের আরেক নেতার কথায়, বিজেপি এখন রাজনীতির চেয়ে রাজনৈতিক অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেয় বেশি।

নরেন্দ্র মোদিকেও ব্যবসাবান্ধব বলেই সবাই জানেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, ভারতের নির্বাচনে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, দেশটির সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে। সে দেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই হাসিনা সরকারের সুসম্পর্ক রয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করতে যাওয়ায় তিস্তা চুক্তিসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান হবে আশা করছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, নরেন্দ্র মোদি এবার ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছেন।

তিনি এবার প্রত্যাশাকেউ ছাড়িয়ে গেছেন। নরেন্দ্র মোদি সরকারের সাহসিকতা ও বিচক্ষণতায় দুই দেশের সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়েছে। এ ধরনের কাজ যখন সম্পন্ন হয়ে গেছে। আমরা আশা করি, তিস্তা চুক্তিসহ অমীমাংসিত বিষয় সেগুলোর সমাধান যে প্রক্রিয়াটা আছে, সে প্রক্রিয়াটা আরও দ্রুত হবে।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সম্পাদকমণ্ডলীর এক বৈঠক শেষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, বিজেপি এবার ভূমিধস জয় অর্জন করেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে টুইট করেছে, অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন।

এদিকে গতকাল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে থেকে মোদিকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই চিঠি শীঘ্রই পৌঁছে যাবে ভারতীয় হাইকমিশনে।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে বিএনপি চেয়ারপারসন গুলশানের কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে ভারতীয় জনতা পার্টির নিরঙ্কুশ বিজয়ের প্রতিক্রিয়ায় আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ভারতের জনগণ সে দেশের সরকার নির্বাচিত করতে পেরেছে।

কিন্তু আমরা সেটা করতে পারিনি। আসলে গত সংসদীয় নির্বাচনে একচেটিয়া আওয়ামী লীগের জয় হওয়ার ফলে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেই তার এমন মন্তব্য বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতের নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা চাই দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক রাষ্ট্র এবং জনগণের সঙ্গে দৃঢ় হোক।

ভারতের নতুন সরকারের কাছে বাংলাদেশের প্রত্যাশা কী? এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এই নীতিনির্ধারক বলেন, বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দুই দেশের জনগণের মধ্যে হবে। পরস্পরের সহযোগিতা ও পরস্পরের প্রতি সম্মানজনক অবস্থান থেকে আমাদের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। বিশেষ করে এই অঞ্চলে আমাদের পারস্পরিক যে সহযোগিতা, সেটা আমরা শক্তিশালী করতে পারব।

তিনি আরও বলেন, সম্পর্কটা হবে দুই দেশের পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে, যেটা আমরা সবসময় বলে আসছি। কারণ, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তিটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত বিএনপি মোদির সুনামিতে অতুষ্ট নয়। সঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গেও ভালো যোগাযোগ চায় বলে বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

বিএনপি চেয়ারপারসনের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য সচিব ও দলের বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ভারতের জনগণের ভোটে নির্বাচিত দল হিসেবে বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে এ জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে অভিনন্দন।

সকার প্রধান হিসেবে দ্বিতীয়বার নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন এ জন্য তাকেও অভিনন্দন। তার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারের কাছে প্রত্যাশা- ভারতের সঙ্গে যে অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে, যা তিনি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা করবেন। তিস্তার সমাধান চাই, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা চাই। বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের সুযোগ চাই। সীমান্তে হত্যার জিরো টলারেন্স দেখতে চাই।তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে ভারতের জনগণের রাজনৈতিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে।

শুধু ভারত নয়, জনগণের ইচ্ছায় যে কোনো দেশের সরকার গঠন হবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রায় তিন দিকে ভারত। ভারত বেষ্টিত বাংলাদেশের জনগণ যেন ভারতের মতোই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। বাংলাদেশের জনগণ যেন তাদের ইচ্ছায় সরকার বেছে নিতে পারে এবং সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ও সংরক্ষিত আসনে মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, কারা ক্ষমতায় যাচ্ছে তা নিয়ে বিএনপি চিন্তিত নয়। আমাদের কথা, সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে হবে।

অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধান চাই। এটা রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক। জাতীয় পার্টির তরফ থেকেও বিজেপিকে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি দেশের জনগণকেও অভিনন্দন জানানো হয়েছে। দলের নেতা এরশাদ বলেন, পরপর দুটি লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করছে, এটা রাজনীতির ইতিহাসে অসাধারণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিজেপির এই বিজয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। উন্নয়ন, অগ্রগতি আর আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ও ভারত আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। নরেন্দ্র মোদিকে একই অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা বেগম রওশন এরশাদ এমপি।


শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন পার্টির মহাসচিব ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙা। ভারতের নতুন সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়বে, এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছে বাম দল বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ।

মোদি সুনামি নিয়ে রাজনৈতিক মহলের আশা, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অস্তিত্ব-সুরক্ষা বিশেষ ব্যক্তি ও দেশের আশাবাদী। দেশের স্বার্থ আদায়ে মোদি সরকার রাজনৈতিক ভূমিকাও পালন করবেন বলে অনেকের মতো।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত