শিরোনাম

তবুও বেপরোয়া অসাধু ব্যবসায়ীরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম  |  ০৭:২৪, মে ২৪, ২০১৯

*ভালো আম পেতে অপেক্ষা আরও ১০ দিন
*কেমিক্যালে আম পাকানো যাবে না : চাঁপাই ডিসি
*আইন আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলী

লন লন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ন্যাংড়া আম। ১২০ টাকা কেজি, খেতে কড়া মিষ্টি। এ আম কোথায় থেকে এনেছেন— এমন প্রশ্নে ক্ষীপ্ত হয়ে বলেন, হুনে আপনার লাভ কি? রাজধানীর মতিঝিলে খুচরা আম ব্যবসায়ী মাদারিপুর সদরের পান্নু মিয়া এভাবেই কার্বাইডযুক্ত চকচকে আম বিক্রি করছেন।

মোহাম্মদুপুরের টাউনহলেও শরীয়তপুরের আ. রশিদ বলেন, ভালো আম। সাতক্ষীরার হিমসাগর। খেতে মিষ্ট, ১৫০ টাকা কেজি। শুধু ওই দুই জনই নয়, গতকাল সরেজমিন দেখা যায় রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলিতে কার্বাইডযুক্ত বাহারি রঙ্গের হিমসাগর, ন্যাংড়া আম বিক্রি হচ্ছে।

অথচ ওই আম পেতে আরও ১০ দিন অপেক্ষা করতে হবে। মন ভরানো খিরসাপাত আমতো জুনের প্রথম থেকে দ্বিতীয় সপ্তাহ লাগবে। আমের রাজধানী বলে খ্যাত কানসাট বাজারেই গুটি আমের বাজার জমে ওঠেনি।

অথচ রোজার মাসেই অতি মুনাফার আশায় একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এভাবে রাজধানীতে কার্বাইডযুক্ত আম বিক্রি করছে। ভারত থেকে চোরাই পথে আসা এ কার্বাইড বন্ধ করতে হবে।

কারণ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিরো টলারেন্স ঘোষণার পর হাইকোর্টও বাগানে পুলিশ পাহারা দেয়ার পর ফলের আড়তে তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন।

আমপাড়া ক্যালেন্ডার : আমের ভেজাল ঠেকাতে অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও রাজশাহী জেলা প্রশাসন আম পাড়ার (গাছ থেকে নামানো) সময় বেধে দিয়েছে। ১৫ মে থেকে গুটিজাতের আম ভাঙার মধ্য দিয়ে বাজারজাতকরণের শোষণা দেয়।

এছাড়া রানীপছন্দ ২৫ মে, খিরসাপাত বা হিমসাগর ২৮ মে এবং লক্ষণভোগ বা লখনা ২৬ মে, ল্যাংড়া আম ৬ জুন, আম্রপালি ও ফজলি ১৬ জুন এবং ১৭ জুলাই থেকে আশ্বিনা জাতের আম ভাঙা শুরু হবে।

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক এজেডএম নূরুল হক আমার সংবাদকে বলেন, এবার এ জেলায় কোনো আম ক্যালেন্ডার থাকছে না।

তবে আম পরিপক্ব হলেই আমচাষিরা গাছ থেকে আম নামিয়ে বাজারজাত করতে পারবেন। অপরিপক্ব আমে কেমিক্যাল মিশিয়ে পাকানো যাবে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মঞ্জুরুল হুদাও জানান, এবার এ জেলায় কোনো আম ক্যালেন্ডার নেই।

তবে চলতি মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে গোপালভোগ, জুনের প্রথম সপ্তাহে খিরসাপাত বাজারে আসবে। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রতি মৌসুমের মতো এবারও ল্যাংড়া, বোম্বে, ফজলি ও আম্রপালি বাজারে আসবে।

জেলা প্রশাসক বলেন, আমে কেমিক্যাল ব্যবহার প্রতিরোধে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। এ জন্য প্রতিটি আম বাগানে লগবই চালু করতে হবে।

মুকুলায়নের আগে ও পরে আম বিজ্ঞানী, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালকের পরামর্শ অনুযায়ী কোন সময় কোন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে তা ওই বইয়ে লিপিবদ্ধ করতে হবে।

এ নিয়ে ইতোমধ্যে তিন দফা সভা হয়েছে। সেখানে ওইসব কথা বলা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক জানান।বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যান বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুর রহিম এ প্রতিবেদককে বলেন, কার্বাইড যেহেতে আমদানি হয় না। ভারত সীমান্তে চোরাই পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

তা প্রতিরোধ করতে হবে প্রশাসনকে। তারা কি করে? এটা খুবই সস্তা, ২৫ রুপিতে এক কিলো পাওয়া যায়। এটা খুবই ক্ষতিকর।

তাই কোনোক্রমেই যাতে আমে ব্যবহার না হয় সেদিকে প্রশাসনকে নজরদারি বাড়াতে হবে। আমের বিভিন্ন জাত উদ্ভাবক এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ন্যাংড়া ও খিরসাপাত আম বাজারে— এটা অসম্ভব। বর্তমানে গুটির সময় শুরু হয়েছে।

সাতক্ষীরার হিমসাগরের পরে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরের আম আসবে বাজারে। এরপর জুনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর আম বাজারে আসবে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, মুকুলের সময় থেকেই সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায় ও সঠিক পদ্ধতিতে আম বাগানের পরিচর্যা, সেচ ও সারপ্রয়োগ এবং অনুমোদিত মাত্রায় বালাইনাশক প্রয়োগ করলে ভালো মানের আম বাজারজাতকরণেও সুবিধা হবে।

১৩ ডিগ্রি সেন্টিগেট তাপমাত্রায় ২১ দিন বা এক মাস আম রাখা যাবে। কাজেই অপরিপক্ব আমে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহারের কোনো প্রশ্নই আসে না।

রাজশাহী জেলা প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী গত ১৫ মে থেকে শুরু হয়েছে মধুমাস জ্যৈষ্ঠের প্রথম দিন থেকে আম পাড়া। এরপর থেকেই রাজশাহী শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় গুটি জাতের আম পাড়া হচ্ছে।

সর্ববৃহৎ আমের বাজার হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাটে এখনো জমেনি আমের বাজার। অল্প কিছু আম দিয়ে কেবল আড়তগুলো চালু করার চেষ্টা চলছে।

বর্তমানে গুটি আম প্রতিমণ পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১২শ-১৩শ টাকায়। আর খুচরা বাজারে তা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। গোপালভোগ আমও ২০ মে থেকে রাজশাহীতে পাড়া শুরু হয়েছে। কিন্তু এ আম আশযুক্ত হওয়ায় ভোক্তারা বেশি খান না। তাই উৎপাদনও কম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জেও শুরু হয়েছে গুটি আম পাড়া। তবে ফলন অন্য বছরের তুলনায় কম। তাই আমের রাজধানী বলে খ্যাত কানসাট বাজার এখনো জমে ওঠেনি বলে এ প্রতিবেদককে জানান, কানসাট বাজারের নিহারবানু।

তিনি আরও বলেন, ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি গুটি আম বাজারে বিক্রি হচ্ছে। তবে ন্যাংড়া ও মন ভোলানো খিরসাপাত আমের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও ১০ দিন।

তার সুরে সুর মিলিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রামচন্দ্রপুরহাটের মহসিন আলীও গতকাল বলেন, হাটে এখনো আমের বাজার জমেনি। কারণ গুটি আম কম। ন্যাংড়া ও খিরসাপাত আম পাড়া শুরু হলে জমবে আমের বাজার।

শিবগঞ্জ উপজেলা ম্যাংগো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব আহসান হাবিব জানান, তিনি এবার ২৩ বিঘা জমিতে আমচাষ করেছেন। আজ থেকে যেসব গুটি ও গোপালভোগ আম পাকতে শুরু করেছে সেসব আম বাজারজাত শুরু করবেন।

অথচ রোজার শুরু থেকেই রাজধানীতে ক্যালসিয়াম কার্বাইডযুক্ত ন্যাংড়া ও খিরসাপাত আম বেশি দামে ১৫০ থেকে ১২০ টাকা কেজি বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

গত বুধবার যাত্রাবাড়ি ফলের আড়তে র‌্যাবের অভিযান চালিয়ে এর সত্যতা পাওয়া যায়। প্রায় ১২ হাজার কেজি কার্বাইডযুক্ত আম ধ্বংস করা হয়।

এ বাজারের সাদ্দাম হোসেন নামে এক আম ব্যবসায়ীও তা স্বীকার করে বলেন, সাতক্ষীরা থেকে ফোন পেয়ে আম আনা হয়। দেখা যায় ওই আম পাকেনি তাই কার্বাইড দিয়ে পাকিয়ে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।

তার কথার সত্যতা জানতে গতকাল যোগাযোগ করা হলে সাতক্ষীরা জেলা সদরের কাজী নাসিরুদ্দিন এ প্রতিবেদককে জানান, এখানে হিমসাগর আম পাড়া শুরু হয়েছে। বাজার জমে উঠেছে।

তবে গাছে ফলন কম। এজন্য অন্য বছরের তুলনায় এবারে দাম একটু বেশি। ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা মন বা ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি আম বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকার ব্যবসায়ীরা যে যাই বলুক সাতক্ষীরায় এখনো ন্যাংড়া ও খিরসাপাত আম বাজারে ওঠেনি।

এ ব্যাপারে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভোক্তাদের উদ্দেশ্যে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, ভালো আম খেতে চাইলে আরও ১০ দিন অপেক্ষা করতে হবে।

কারণ জুনের আগে ন্যাংড়া ও খিরসাপাত আম বাজারে পাওয়া যাবে না। এখন যা পাওয়া যাচ্ছে কার্বাইডযুক্ত ভেজাল আম। যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।

অথচ ভেজালমুক্ত আমের জন্য হাইকোর্ট একটা নির্দেশও দিয়েছেন। তাই বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রপ্তানির সুযোগ হাতছাড়া : চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও সাতক্ষিরার আমচাষিরা অন্যান্য বছরের মতো এবারও আম রপ্তানির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে কয়েক বছর ধরেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে আম। এ বছরও বিদেশে রপ্তানি হবে।

তবে এফবিসিসিআইর সাবেক পরিচালক ও আম রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ গতকাল এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকারের সহযোগিতার অভাবে রপ্তানি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আনা যাচ্ছে না। এবারও তেমন হবে না রপ্তানি।

বারবার কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সুরাহা হচ্ছে না। কৃষি পণ্যে ভর্তূকি দেয়া হলেও আমে দেয়া হয় না কোনো ভর্তুকি। দেয়া হয় না কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনাও।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোল্ড স্টোরেজের কোনো সুযোগ নেই আমে। তরে জুস ফ্যাক্টরি বেশি করা হলে আমচাষিরা নায্যদাম পাবে বলে জানান তিনি।

কেমিক্যাল ঠেকাতে আম বাগান ও ফলের আড়তে তদারকি : আমে রাসায়নিক (কেমিক্যাল) ব্যবহার রোধে ২০ মে রাজধানীসহ সারা দেশের ফলের আড়তে তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

পুলিশের আইজি, র্যাবের মহাপরিচালক, বিএসটিআইয়ের চেয়ারম্যান ও পরিচালককে সাতদিনের মধ্যে এ তদারকি টিম গঠন করতে বলা হয়েছে।

গত ৯ এপ্রিল রাজশাহী অঞ্চলের আমবাগানগুলোতে রাসায়নিক ব্যবহার রোধে ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

জনস্বার্থে আইনজীবী মনজিল মোরসেদের এক রিটের শুনানিতে আদালত এ নির্দেশ দেন। প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি আজিজুর রহমান শিশির।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত