শিরোনাম

লাশ সিদ্ধ করে কঙ্কাল ব্যবসা!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০১:০৬, মে ২৩, ২০১৯

মরা মানুষের লাশ সিদ্ধ করে কঙ্কাল তৈরি ও ব্যবসা ফ্রি স্টাইলে চলছে। এই ব্যবসায়ী চক্রটি নগরীর বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ওষুধের মার্কেটগুলোর দেয়ালে দেয়ালে লিফলেট ও পোস্টার সাঁটিয়ে কঙ্কাল বিক্রি করছে।

রাজধানীর কাফরুল থানার পুলিশ কয়েক বছর আগে অভিযান চালিয়ে প্রায় অর্ধশত মরা মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার এবং কঙ্কাল তৈরির কারখানা আবিষ্কার করে। আর এ ঘটনায় একজন চিকিৎসকসহ দুইজনকে আটক করা হলেও তাদের সেই কর্মকাণ্ড থেমে নেই এখনো।

সরেজমিন রাজধানীন ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে কঙ্কাল তৈরি ও ব্যবসার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

রাজধানীতে মরা মানুষের লাশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের একাধিক সদস্য ও জুরাইন কবরস্থানের লোকজনসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কবরস্থানের লাশ চুরির সঙ্গে জড়িতদের সহযোগিতায় ওই কঙ্কাল তৈরি ও ব্যবসা চালানো হচ্ছে।

কারখানার প্রভাবশালী মালিকরা বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে প্রকাশ্যে লিফলেট টাঙিয়ে কঙ্কালগুলো বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী, মর্গের লোকজন, মিটফোর্ড ও শাহবাগ ও প্রেস ক্লাবের সামনের বিএমএ মার্কেট এলাকায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও মর্গ, হাসপাতাল এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে কঙ্কাল বিক্রির লিফলেট ও পোস্টার সাঁটানো রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নোটিস বোর্ডের উপরে বেশ কয়েকটি পোস্টার টাঙানো রয়েছে। তার মধ্যে একটিতে লেখা রয়েছে ‘কঙ্কাল বিক্রয় হবে’। ২৮ হাজার টাকা থেকে ৩৬ হাজার টাকা দাম। এর মোবাইল

নম্বর দেয়া আছে। আবার আরেকজন একটি পোস্টারে লিখেছেন, ‘ফ্রেস ফুল সেট বোন্স বিক্রয় করা হবে’। এরপর তার মোবাইল নম্বর দেয়া রয়েছে। ওই মোবাইল ফোনে ক্রেতা হিসেবে কথা বললে তিনি জানান, ভালো কোয়ালিটির বোন্স নিতে হলে বেশি টাকা দিতে হবে।

একপর্যায়ে তিনি ফজলে রাব্বী হলে গিয়ে তার কাছে থাকা কঙ্কাল দেখে আসতে বলেন। তিনি আরও বলেন, ভালো কোয়ালিটির বোন্স কঙ্কাল কিনলে একই দামে কয়েক বছর পরও বিক্রি করতে পারবেন।

এরপর তিনি ৩২ হাজার টাকার নিচে দিতে পারবেন না বলে জানান। অপর একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ৩৫ হাজার টাকায় বোন্স বা কঙ্কাল দিতে পারবো।

আর তার কাছ থেকে নেয়া কঙ্কাল দুই বছর ব্যবহার করেও একই দামে পুনরায় বিক্রি করা যাবে বলেও জানান তিনি।

সূত্র জানায়, কঙ্কাল তৈরি সিন্ডিকেটে ঢামেকের কতিপয় ছাত্রনেতা, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের কতিপয় চিকিৎসক ছাড়াও বিভিন্ন মর্গে দায়িত্বরত কর্মচারী, বিভিন্ন করস্থানের দায়িত্বরতরা মিলে কঙ্কাল তৈরি করে দেদার ব্যবসা চালিয়ে আসছে।

মিটফোর্ডের এক সূত্র জানায়, প্রতিটি কঙ্কাল তৈরির জন্য ছয় থেকে আট হাজার টাকা খরচ হয়। আর তা ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। আবার এসব কঙ্কাল কোনো মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী যদি কিনে, এক বছর ব্যবহার করার পর তিনি আবার একই দামে বিক্রি করতে পারবেন।

এর আগে গত ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর রাজধানীর কাফরুল থানার পুলিশ ওই থানাধীন পূর্ব কাজীপাড়া ১৮৩/১ নম্বরের ১/এ নম্বর ফ্ল্যাটের দ্বিতীয় তলায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মো. কামরুজ্জামান ওরফে নুর ও মো. শাহীন মিয়া নামে দুইজনকে আটক করে।

তাদের তাদের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে মরা মানুষের ৩২টি মাথার খুলি, ৮০টি মানুষের হাতের কনুই, ৫২টি ফিবুলা, ১৩২টি রেডিয়াস আলনা, ৬০টি ক্লাবিকল বা গলার নিচের হাড়, ৬৪টি ফিমান, ৮০টি টিবিয়া, ৯৫টি হিপবন, ৪৭টি রিব, ২৪টি স্যাকরাম, আট কেজি মেরুদণ্ডের হাড়, ৪৫টি পাজরের হাড়সহ বিপুিল পরিমাণ কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।

আর কঙ্কাল তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম, কেমিক্যাল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কাফরুল থানার তৎকালীন এসআই ফেরদৌস আহম্মদ বাদি হয়ে মামলা করেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তারকৃতদের দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়।

ওই মামলাটি পরে তদন্ত করেন কাফরুল থানার তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টার (নিরস্ত্র) মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি তদন্ত শেষে আদালতে গত ২০১৭ সালের ৩ মার্চ চূড়ান্ত রিপোর্ট বা চার্জশিট দাখিল করেন।

ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, মামলার এজাহার নামীয় আসমি কামরুজ্জামান ওরফে নুর, মো. শাহীন মিয়া ও পলাতক আসামি তন্ময় যোগসাজশে মানুদ দেহের মাথার খুলি, মানু কঙ্কাল, ও মানব দেহের বিভিন্ন অস্থি ক্রয়-বিক্রয় করার জন্য নিজেদের দখলে রেখেছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামি মো. কামরুজ্জামান ওরফে নুর, ও মো. শাহীন মিয়ার বিরুদ্ধে ২১৬ নম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সূত্র জানায়, ওই মামলার পলাতক আসামি তন্ময় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের তৎকালীন ইন্টার্নি চিকিৎসক ছিলেন। তিনি এখনো এই ব্যবসা চালিয়ে আসছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মর্গের লেবার জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকার কবরস্থান থেকে লাশ চুরি করে অ্যাম্বুলেন্স বা লাশের গাড়ি আবার কালো গ্লাসের গাড়িযোগে ঢাকায় আনা হয়। এরপর সুনির্ির্দষ্ট কারখানায় নিয়ে চক্রের লোকজন ১০০ ডিগ্রিফারেনহাইট তাপমাত্রায় বড় হিটারে লাশগুলো সিদ্ধ করে।

এরপর কেমিক্যাল দিয়ে লাশের মাংস ও হাড় পৃথক করে তা শুকিয়ে কঙ্কাল তৈরি করা হচ্ছে। এরপর বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও ওষুধের মার্কেটে হাতে লেখা মোবাইল নম্বরসহ কাগজ টাঙিয়ে দেয়া হয়।

মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট ক্রেতারা যোগাযোগ করলে প্রতিটি কঙ্কালের জন্য ৩২ থেকে ৩৮ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। আর টাকা বিকাশের মাধ্যমে আদায় করা হচ্ছে। পরে সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে ওই কঙ্কাল পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

আর এসব কঙ্কালের ব্যবসার সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের এক শ্রেণির চিকিৎসক ও ছাত্রনেতারা জড়িয়ে পড়ছেন।

এদিকে আঞ্জুমান মফিদুর ইসলামের দাফন সেবা প্রকল্পের কর্মকর্তা মহিউদ্দিন জানান, গত বছর জুলাই থেকে গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত মোট ৭২৯টি অজ্ঞাত লাশ ফ্রি দাফন করা হয়েছে। আর একই সময়ে মধ্যে ৬১৫ লাশের দাফন সেবা দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ) মাসুদুর রহমান বলেন, আমার মনে হয় এসব ব্যবসা এখন হাসপাতালে চিকিৎসকরাই করছেন। কিছুদিন আগে মেডিকেলে প্রথম বর্ষে ভর্তি হলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের জন্যই এসব লিফলেট ও পোস্টা টাঙিয়ে কঙ্কাল বিক্রি করছেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত