শিরোনাম

প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ক্ষতিকর ওষুধের রমরমা ব্যবসা!

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী  |  ০০:৪০, মে ২৩, ২০১৯

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে চলছে অবৈধ ও ক্ষতিকর ওষুধের রমরমা বাণিজ্য। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ঢাকার আশপাশে গড়ে উঠেছে অনেক নিম্নমানের ওষুধের কারখানা। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায়ও এমন কারখানার সন্ধান মিলেছে বিভিন্ন সময় প্রশাসনের অভিযানে।

তারা দু-একটি ওষুধের অনুমোদন নিয়ে তার আড়ালে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বহু ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। আর এর মাধ্যমে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে তারা এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় এমন বেশকিছু অভিযোগ এসেছে। ওইসব অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মালিক ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নানা অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

জানা গেছে, সাভারের ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালস, সাভারের লিমিট ল্যাবরেটরিজ ইউনানি, দর্শনার ওয়েস্ট ফার্মাসিউটিক্যালস, ঢাকার মানিকনগরের হাইম্যাং ইউনানি ফার্মাসিউটিক্যালস, পাবনার এম. এইচ. ইউনানি ল্যাবরেটরিজ ও ইন্ট্রা ফার্মাসিউটিক্যালস, সিলেটের রোজমার্ক ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানি), বগুড়ার সবুজ ফার্মাসিউটিক্যালস (আয়ু.), যশোরের আশরাফুল ল্যাবরেটরিজ (ইউনানি), ঢাকার কদমতলীর দিহান ফার্মাসিউটিক্যালস (আয়ু.) এবং মুন্সীগঞ্জের এমপেক্স ইউনানি ল্যাবরেটরিজের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ আছে।

জানা গেছে, সাভারের ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালস ইউনানির মালিক আলিম উদ্দিন। সাভারের ব্যাংক টাউনে ম্যাবকোর অফিসে কোনো সাইনবোর্ড ব্যবহার করেন না। এতে তার প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ওষুধ প্রসাশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে তৈরি করছেন পিউটনসহ অনেক ভেজাল ও নিম্নমানের ক্ষতিকারক ওষুধ।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা তার ‘প্রফিট পার্টনার’ হিসেবে এসব অবৈধ কাজে সহায়তা করছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা হলেন- পরিচালক রুহুল আমিন, সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক আশরাফ হোসেন, সহকারী পরিচালক মো. ইয়াহ্ইয়া এবং ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক এটিএম গোলাম কিবরিয়া।

এদের মধ্যে শফিকুল ইসলাম ওষুধ প্রশাসনে সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তা বলে নিজেকে বিভিন্ন সময় জাহির করেন। এসব কর্মকর্তা মোটা অংকের মাসোহারা নিয়ে ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিক আলিম উদ্দিনের ক্ষতিকর ওষুধ পিউটনসহ অন্যান্য ওষুধের ব্যবসা চালিয়ে যেতে সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিক আলিম উদ্দিন সম্পর্কে অভিযোগে বলা হয়েছে, অবৈধ ও ভেজাল ওষুধের ব্যবসা করে তিনি প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। তার এই বিশাল অর্থের ভাণ্ডার হলো ক্ষতিকর পিউটন সিরাপ।

তিনি ডিগ্রি ছাড়াই একজন ডাক্তার। এক সময় ঢাকার একটি ইউনানি ওষুধ কোম্পানির সহকারী পদে চাকরি করতেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কারখানার নিয়মনীতি না মেনেই আলিম উদ্দিন ২০১১ সালে পেয়ে যান ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের লাইসেন্স। তিনি এখন হয়েছেন ‘বিশিষ্ট ওষুধ প্রস্তুতকারক’।

অথচ পিউটন নামে যে সিরাপটি এই কোম্পানি বাজারজাত করছে, সেটি নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলামের তৎপরতার কারণে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর অনেক কোম্পানির ওষুধ পরীক্ষা করে উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধ করাসহ কারখানা সিলগালা করলেও ম্যাবকোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মিথ্যা। কেউ শত্রুতা করে এসব অপবাদ ছড়াচ্ছে। ম্যাবকো বা আলিম উদ্দিনের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের ব্যক্তিগত যোগাযোগ নেই। কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনেরও সম্পর্ক নেই। তাদের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ এসেছে। সেটা তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জানা গেছে, পিউটন সিরাপটি মূলত শক্তিবর্ধক, পুষ্টিবর্ধক ও পাকস্থলীর দুর্বলতা নাশক সিরাপ হিসেবে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে। পিউটন সিরাপ সম্পর্কে ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা বলছেন, পিউটন খেলে মোটাতাজা হওয়া যায়। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না পিউটন সিরাপটি কতটা ক্ষতিকারক। এই সিরাপটি বেশ কিছুদিন খাওয়ার পর শরীরে পানি জমে যায়, শরীরে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে, এমনকি কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটি খেলে সাময়িকভাবে শরীর মোটা হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা অত্যন্ত ক্ষতিকারক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিক আলিম উদ্দিন বলেন, তিনি সব ধরনের নিয়ম-নীতি মেনেই ব্যবসা করছেন। তার কোম্পানির তৈরি ওষুধ নিয়ে শতাধিক রিপোর্ট আছে। সেখানে কোনো ব্যত্যয় মেলেনি।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ীই তিনি সব ধরনের ওষুধ প্রস্তুত করেন। পিউটন সিরাপে ক্ষতিকর কোনো উপাদান নেই বলে তার দাবি। আর এক্ষেত্রে অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

ম্যাবকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা বেমালুম অস্বীকার করেন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের আরেক সহকারী পরিচালক আশরাফ হোসেন।

আর অধিদপ্তরের পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, ইউনানি ফার্মাসিউটিক্যালসের কোনো ফাইল আমি দেখি না। ফলে তাদের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের প্রশ্নই ওঠে না। ম্যাবকোর বিষয়টি সহকারী পরিচালক শফিকুল ইসলাম তদারকি করছেন। আমার জানা মতে, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে তদন্ত হয়েছে। ফলাফল হাতে পাওয়ার পর সেখানে কোনো অনিয়ম দেখা গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্সের’ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দুর্নীতি অথবা ওষুধ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনো অনিয়ম, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত