শিরোনাম

ওদের কাছে ঢামেক হাসপাতাল জিম্মি

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০৮:৪৩, মে ১৭, ২০১৯

ওরা দালাল ! ওরা ভিজিটর ! ওরা চিকিৎসক, নার্সসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে একাকার। হাসপাতালে চিকিৎসকের রুম খোলার সঙ্গে সঙ্গে ওরা গিয়ে বসে থাকেন। ওদের কাছে জিম্মি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরাও।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ঘিরে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির ভিজিটর-দালাল ও প্যাথলজির প্রতিনিধি ছাড়াও প্রায় এক হাজার দালাল প্রতারকের অবস্থান। এদের কাছে হাসপাতালের প্রশাসনও জিম্মি।

আবার ঢামেক হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা, ব্যবস্থাপত্র, ওষুধ খাওয়ানো, খাবার বণ্টন, স্যালাইন-ইনজেকশন পুশ করা, বেডের ব্যবস্থা, ঝাড়ু দেওয়াসহ সবকিছুই এক শ্রেণির দালাল ও প্রতারকরা টাকার বিনিময়ে করছেন।

এসব দালাল ও প্রতারকদের দাপটের কারণে প্রকৃত ডাক্তার, নার্স ও হাসপাতালের কর্মকর্তারাও ঘাবড়ে যান। আর দালাল ও প্রতারকরা হাসপাতালে ‘স্পেশাল ওয়ার্ডবয়’ হিসেবেই বেশিরভাগ সময় পরিচয় দিয়ে আসছেন।

কিন্তু আসলে তারা কেউ হাসপাতালের স্টাফ বা স্পেশাল বয় নয়। আর এই প্রতারক ও দালালের সংখ্যা প্রায় ৩ শতাধিক রয়েছে। পুরনো ওয়ার্ডবয় ও ওয়ার্ড-মাস্টারদের সহযোগিতায় তারা হাসপাতালে ওষুধ চুরি ও খাবার চুরি, রোগীর স্বজনদের টাকা, মোবাইল এমনকি স্বর্ণালঙ্কার চুরিসহ নানা অপকর্ম বীরদর্পে চালিয়ে আসছে।

শুধু তাই নয়, হাসপাতালের নিয়োগকৃত স্টাফরা তাদের দিয়ে কাজ করিয়ে সরকারি বেতনের সাথে উপরি আয় করছেন। আর এ জন্যই তাদের হাসপাতালে আস্তানা করতে দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওথেরাপি বিভাগের এক চিকিৎসকের রুমে সকাল ১০টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসক নেই। কিন্তু তার রুমে ৩ থেকে ৪ জন ওষুধ কোম্পানির দালাল ও ভিজিটর অবস্থান করছেন। কিছুক্ষণ পর ওই চিকিৎসক ওই রুমে প্রবেশ করেন। এরপর একজন রোগী প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই ওই চিকিৎসক বিভিন্ন ওষুধ চিকিৎসাপত্রে লিখে দেন।

কিন্তু ওই রোগীর চিকিৎসা দিতে মনোনিবেশ না করেই অনেকগুলো ওষুধ ও এক যন্ত্রের নাম এবং ব্যায়ামের কথা লিখে দিয়ে তাকে বিদায় করেন। পরে ওই রোগী চিকিৎসকের রুম থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন দালাল তার পেছনে পেছনে বের হন। একপর্যায়ে ওই রোগীর হাতে থাকা প্রেসক্রিপশন নিয়ে তার মোবাইল ফোনে ছবি তোলেন।

এসময় একজন একটি মেশিন ক্রয় করতে বলে জানান ডাক্তার লিখে দিয়েছেন। এভাবেই হাসপাতালের প্রতিটা চিকিৎসকের রুমের অবস্থা। হাসপাতালে বহির্বিভাগের অবস্থা আরও খারাপ। সেখানে ভিজিটর বা দালালরাই তাদের কোম্পানির ওষুধের নাম লিখে দিয়ে বাইরের দোকান থেকে ক্রয় করতে বলেন।

অন্য এক সূত্র জানায়, ঢামেক হাসপাতালের ২০১ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বরত আনসার সদস্য ও আনসারে পিসি আইসিইউর ব্যবসায় লিপ্ত। তিনি সেখান থেকে চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে এক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।

নির্ধারিত টাকার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকায় আইসিইউর বেড পাওয়া যায়। হাসপাতালের কর্মচারীদের দালাল মুসফিক ওরফে মজনু ওয়ান স্টপ কর্মচারী। তিনি রোগীদের জরুরি বিভাগ থেকে মেডিসিন বিভাগে পাঠায়। এর সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের চালক জলিল ও আ. হোসেন স্পেশাল কর্মচারী ৩০ জনের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে আদায় করেন। এরপর ওই টাকা সরদার স্বপন, মুসফিক ওরফে মজনু, শহিদ ও আ. হোসেন ভাগাভাগি করে নেন।

জানা যায়, হাসপাতালে প্রবেশ করা ভিজিটরগণ চিকিৎসকদের বাসা বাড়ি এমনকি হাসপাতালেও চিকিৎসকের রুমে এসি, ফ্রিজ, টিভিসহ বিভিন্ন প্রকার উপহার সামগ্রি দিয়ে থাকেন। আর এর বিনিময়ে তারা ওইসব কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধের নাম রোগীর প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন।

শুধু তাই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতরা ঢামেকের এক শ্রেণির কর্মচারীর সহযোগিতায় হাসপাতালে নিরাপদে অবস্থান করছে। আর তারা হাসপাতালের চার পাশে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। কর্মচারী নেতা ও ওয়ার্ড মাস্টারদের সহযোগিতায় ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কাজ করার সুযোগ নিয়ে নিরাপদে রাত যাপন ও রোগীদের কাছ থেকে নানা পরিচয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতালে কর্মরত স্পেশাল ওয়ার্ড বয়রা জানিয়েছেন, তিনশর মতো ওয়ার্ড বয় রয়েছেন। তাদের চাকরি স্থায়ী হওয়ার আশায় তারা কাজ করছেন। তারা তাদের জীবন-বৃত্তান্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে দিয়ে রেখেছেন।

কিন্তু তাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। এদের অধিকাংশই তাদের আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে হাসপাতালে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এ ব্যাপারে হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার সেল ফোনে ফোন করা হলেও তিনি তার সেল ফোনটি রিসিভ করেনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত