শিরোনাম

বাম্পার ফলনেও কৃষকের সর্বনাশ

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম  |  ০৭:৪৯, মে ১৭, ২০১৯

 

*দাম না পেয়ে রাস্তায় ধান ছিটিয়ে কৃষকদের প্রতিবাদ
*রাজনৈতিক প্রভাবে কৃষকের ধান কেনা যাচ্ছে না : কৃষিমন্ত্রী
*সুযোগ যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও মিলমালিকদের পেটে

‘আশা করেছিলাম আমনের ক্ষতি পুষিয়ে নেবো বোরো ধানে। কিন্তু ভাগ্যে জুটেছে উল্টো। এবার বোরা চাষে খরচ বেশি হলেও তার ধারে কাছেও নেই দাম। হাটে আমদানি বেশি। তাই ৭০০ টাকা মণেও ধান নেয়ার লোক পাওয়া যায় না। সরকার ১০২০ টাকা মণ কেনার ঘোষণা দিলেও তা কল্পনাই মনে হচ্ছে।

মিলমালিকরা সে সুযোগ নেবে। আমরা শুধু কলুর বলদের মতো খেটে মরছি।’ ধানের বাজার জানতে চাইলে এভাবে গতকাল নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর থানার করিমপুর গ্রামের এনামুল হক নিজের ক্ষোভের কথা জানান। তার মতোই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল থানার কাজলকেশর গ্রামের রিয়াজ আলীও খেদোক্তি প্রকাশ করেন ধানের ব্যাপারে। বলেন, ধানের আবাদ না করলেও হয় না।

কিন্তু ঋণ করে চলাও যায় না। কারণ, আশা করেছিলাম আমনের ক্ষতি বোরোতে উঠবে। কিন্তু সেই আশায় গুঁড়েবালি। ধান কাটার জন্য লেবারই পাওয়া যায় না। আবার যে ধান কাটা হয়েছে তা ৬৫০ টাকার বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে না।

তাহলে চলব কি করে। সরকার ঘোষণা দিলেও আমরা সেই দামে ধান বিক্রি করতে পারছি না। শুধু ওই দুজন কৃষক নয়, দেশের সব অঞ্চলের কৃষকের একই কথা- সরকারি রেট পাচ্ছি না। তাহলে কারা এর সুফল পাচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই এ দুরবস্থা।

তাই মনের ক্ষোভে কোনো কোনো জায়গায় কৃষকরা ধান ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেন। তাদের সমবেদনা জানাতে কৃষকের ধানের আন্দোলন রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে ধানের ন্যায্য দামের দাবি জানান সরকারের কাছে। কৃষকদের কথা বুঝে কৃষিমন্ত্রী ড. রাজ্জাক দেরিতে হলেও গতকাল বলেছেন, রাজনৈতিক প্রভাবে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা যাচ্ছে না।

ধানের ন্যায্য মূল্য পেতে আগুন রাজপথে : ধানের ন্যায্য মূল্য দাবি শুধু কৃষকের মাঠে ও হাটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা রাজপথে ছড়িয়ে গেছে। এ সময় তারা বলেন, আমরা কৃষকের ছেলে। তাই কৃষক ধানের দাম না পেলে আমরা কিভাবে পড়ালেখা করব বলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ধানের কম দাম নিয়ে হাহাকারের সুর ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্লাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ দেশের ১৬টি স্থানে ধানের ন্যায্য মূল্যের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যেও মানববন্ধন করেছে তারা।

প্রতিবাদ হয়েছে ভোলা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরাও প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। তারা সড়কে ধান ছিটিয়ে ও ধানে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ জানায়। গত বুধবার এক মানববন্ধনে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, সরকার কৃষকদের পরিবর্তে বড় বড় চোরদের রক্ষায় ব্যস্ত রয়েছে।

যাদের উৎপাদিত পণ্য খেয়ে বেঁচে আছি তাদের সঠিক মূল্য আমরা দিতে পারছি না। সিন্ডিকেটের কারণে দাম কমে যাচ্ছে। চালকল মালিকরা পরিকল্পিতভাবে দাম কমিয়ে দিয়েছেন। কৃষকরা ন্যায্য মূল্য না পেলে ছাত্রসমাজ দাবি আদায়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে এই বক্তব্য আজ মিথ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকের উৎপাদিত ধানের দাম ১০ টাকা কেজি অথচ আমরা চাল কিনি ৬০ টাকা কেজি। তাহলে এই কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের লাভ কারা করছে? সরকারকে সেটা বের করতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবারও ধানের ন্যায্য মূল্যের দাবিতে রংপুরে মহাসড়কে ধান ছিটিয়ে প্রতিবাদ করেছেন কৃষকরা। বেলা ১১টার দিকে রংপুর নগরের মাহীগঞ্জ সাতমাথা এলাকায় রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কে এ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়।

এসময় তারা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বলেন, ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে হাটে হাটে ক্রয়কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে। কৃষক সংগ্রাম পরিষদ নামে একটি সংগঠনের আহ্বায়ক আবদুস সাত্তার সভাপতিত্ব করেন।

এ সময় কৃষকরা দুঃখ করে বলেন, এক বিঘা ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। আর ধানের দাম করে যাওয়া বিঘাপ্রতি উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬-৭ হাজার টাকা। এতে করে প্রতি বিঘায় ধান উৎপাদনে লোকসান প্রায় তিন হাজার টাকা। এতে করে কৃষকদের দুর্ষিসহ অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।

তারা অভিযোগ করে আরও বলেন, এক মণ ধানের দামে ধান কাটার একজন শ্রমিককে কাজে নিতে হয়। শ্রমিকের চড়া মজুরির কারণে জমি থেকে ধান ঘরে তোলা যাচ্ছে না। ধার-দেনা করে ধান কেটে ঘরে তুলতে হচ্ছে। কিন্তু দাম পাওয়া যাচ্ছে না।

জয়পুরহাটের কৃষকরাও সড়কে অবস্থান করে ধানের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার জন্য। দাম কম হওয়ায় গত বুধবার জয়পুরহাটে ধানে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ করেছে ক্ষেতমজুর সমিতি। ক্ষেতলাল উপজেলার মিনিগাড়ী গ্রামের কৃষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বর্তমান দামে ধান বিক্রি করে তার বিঘাপ্রতি লোকসান হচ্ছে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা মারা পড়বো বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আমনের পর বোরো মৌসুমেও বাংলাদেশে বাম্পার ফলন হয়েছে ধানের। ফলন দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে। কিন্তু সেই খুশি ধানের দাম কমার কারণে মলিন হয়ে গেছে। স্থানভেদে ৫০০-৭০০ টাকায় ঘুরছে প্রতিমণ ধানের দাম।

অথচ প্রতিমণ ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ৭০০-৮০০ টাকা। গড়ে মণপ্রতি ৩০০ টাকা লোকসান হচ্ছে কৃষকের। জনবল সংকটে কোথাও কোথাও ফসল কাটার খরচই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকের জন্য। দুই মণ ধানের দামেও একজন দিনমজুর মিলছে না কোথাও কোথাও। ফলে অনেক এলাকায় কৃষকরা জমিতেই ফেলে রাখছে ধান। বিভিন্ন জায়গার কৃষকরা এমনই তথ্য জানান।

ধানের দাম কমার পেছনে বিভিন্ন জায়গায় মজুদদার ও মিল মালিকদের কারসাজি বলে কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা জানান। তারা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ২৭ মার্চে ধান-চাল সংগ্রহের ঘোষণা দেয়া হলেও সব জায়গায় হাটবাজারে কেনা হচ্ছে না। তাই চাল সংগ্রহের নামে মিলার-ডিলারদের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ করে দেয়ার পদ্ধতি বাদ দিয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল কেনার তাগিদ দেন তারা।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ মার্চ এফপিএমসির সভায় চলতি বোরো মৌসুমে ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর মধ্যে এক লাখ ৫০ হাজার টন বোরো ধান (চালের আকারে এক লাখ টন), ১০ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল। আর এক লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল কেনার কথা বলা হয়।

এসময় প্রতি কেজি বোরো ধানের মূল্য ২৬ টাকা, সিদ্ধ চালের কেজি ৩৬ টাকা এবং আতপ চালের কেজি ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সরকারের এ বার্তায় কৃষকরা খুবই খুশি হয়ে উঠে। কারণ প্রতি মণ ধান এক হাজার ৪০ টাকা বিক্রি করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে এই দাম কৃষকের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সরকার মিলারদের মাধ্যমে বেশি দামে চাল কিনলেও মিলাররা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনছে ৫০০-৭০০ টাকার মধ্যে। এককথায় সরকারি দামের অর্ধেকও পাচ্ছেন না কৃষকরা।

রাজনৈতিক প্রভাবে কৃষকদের ধান কেনা যাচ্ছে না : ধানের দাম না পেয়ে টাঙ্গাইলের কৃষক নজরুল ধান ক্ষেতে আগুন দিলে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার গত মঙ্গলবার বলেন এটা নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তার একদিন পরই কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক কৃষকের কথা বুঝতে পেরে স্পষ্টভাবে আসল কথা জানান তিনি।

বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা যাচ্ছে না। গতকাল সচিবালয়ে নিজ অফিসে চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জুয়ার সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ধানের কম দাম নিয়ে সরকার গভীরভাবে চিন্তিত।

সমস্যা সমাধানে রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে এখনই কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। কৃষিমন্ত্রী বলেন, সরকার বর্তমান সময়ে কৃষকদের সমস্যা সমাধানকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। ৫০০ টাকা ধানের মণ, আর প্রতি মণ ধান ফলাতে সাড়ে ৭শ টাকা খরচ। এটা নিয়েই আমরা কাজ করেছি। এখন সরকার ১০ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন চাল রপ্তানির চিন্তা করছে। এতে করে ধানের দাম একটু বেশি হবে। এতে কৃষকরা লাভের মুখ দেখবেন।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আরিফুর রহমান অপু বলেন, এখনো ধান সংগ্রহে গতি আসেনি। এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ের খাদ্য কর্মকর্তাদের তাগিদ দিয়েছি তারা যেন দ্রুত মাঠে নেমে পড়েন। কারণ আমরাও চাই কৃষক যেন বঞ্চিত না হয়। তাদের কাছ থেকেই আমরা সরাসরি ধান কিনতে চাই। মিলাররা নানা অজুহাতে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে চাল করে বিক্রির কারসাজি করার চেষ্টা করতে পারে। তবে আমরা এসব বিষয় কঠোরভাবে মনিটর করব।

কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মীর নুরুল আলম বলেন, গেল আমন মৌসুমে আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন ধান অতিরিক্ত উৎপাদন হয়েছে। তার ওপর এবার বোরো মৌসুমেও গত বছরের তুলনায় ধান চাষাবাদ হয়েছে এক লাখ হেক্টর বেশি জমিতে। ফলনও বেশ ভালোই হয়েছে। বাম্পার হলেও ঠিক কী পরিমাণ বেশি হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এখনো মাস খানেক বাকি রয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, খরচের তুলনায় বিক্রিমূল্য তুলনামূলকভাবে কম হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমিক ব্যয় বড় একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকের জন্য। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা জানতে পারছি, দুই মণ ধানের দামেও একজন মজুর মিলছে না।

সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টে ধানে আগুন : খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার গত বুধবার সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা খাদ্যগুদামে প্রান্তিক কৃষক ও মিলারদের কাছ থেকে ধান ও চাল ক্রয় উদ্বোধন শেষে খাদ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না এটা স্বীকার করলেও মন্ত্রী বলেন, ধানের দাম ২০০ টাকা মণ হলেও একজন কৃষক কখনো ধান পোড়ানোর মতো কাজ করবে না। এটি একটি মহলের পরিকল্পিত ঘটনা, যাতে সরকারকে বিপর্যস্ত অবস্থায় ফেলা যায়। দাম নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের উৎপাদিত চাল বিদেশে রপ্তানি করার পরিকল্পনা করছে সরকার বলে জানান তিনি।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত