শিরোনাম

বাজার থেকে সরছে নিম্নমানের পণ্য

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম  |  ০১:০৮, মে ১৬, ২০১৯

‘হাইকোর্ট আদেশ দেয়ার পর থেকেই ৫২টি পণ্যের মধ্যে আমাদের আউটলেটে যা যা ছিল তা তুলে নেয়া হয়েছে। তাই বর্তমানে ওইসব পণ্য আমাদের কাছে নেই বলে জানান মোহাম্মদপুর মীনাবাজার আউটলেটের ইনচার্জ জাহিদুল ইসলাম।’

শুধু ওই বড় শপিং সেন্টার নয়, মোহাম্মদপুর টাউনহল মার্কেটের ইকবাল ভ্যারাইটি স্টোরের মালিক মো. ইকবালও জানান- তীর, রুপচাঁদা, প্রাণ, এসিআই, ফ্রেশের সব পণ্য তুলে নেয়া হয়েছে গত দুই দিন থেকে। তাই কোনো পণ্য আমাদের কাছে নেই বলে জানান।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সরেজমিন গেলে এভাবেই অধিকাংশ খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী জানান, তীর সরিষার তেল, প্রাণের লাচ্ছা সেমাই, প্রাণ হলুদ গুঁড়া, প্রাণ কারি পাউডার, মোল্লা আয়োডিনযুক্ত লবণ, এসিআই আয়োডিনযুক্ত লবণসহ মোট ৫২টি পণ্য বাজার থেকে তুলা শুরু হয়েছে।

আবার কেউ কেউ বলেন, বাজারে বিক্রি করতে নিষেধ করা হয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তুলে নিয়ে দোকানে বস্তাবন্দি করে রাখা হচ্ছে।
তা ধ্বংস করা হবে কি না কোম্পানির নির্দেশনা অনুযায়ী পরে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ ব্যাপারে মূল ম্যাসেজ জানার জন্য প্রাণ, মেঘনা গ্রুপের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে তাদের অধীনস্থরা বলেন, এটি যেহেতু হাইকোর্টের আদেশ, তাই শ্রদ্ধা রেখে ওই আদেশ বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমনই তথ্য জানা গেছে।

পণ্যের মান যাচাইকারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআই ৫২ পণ্যের বিরুদ্ধে কি অ্যাকশন নিচ্ছে- তা জানতে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইসহাক আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা কি করছি বা করব তা জানতে পারবেন কাল (বৃহস্পতিবার)। এর বাইরে বলার মতো কিছু নেই বলে জানান তিনি।

এদিকে বিএসটিআইর পরিচালক প্রকৌশলী এস এম ইসহাক গত রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, কারণ দর্শানোর নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ায় সাতটি কোম্পানি লাইসেন্স বাতিল করা হয় এবং ১৮টি কোম্পানির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়।

লাইসেন্স বাতিল করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হচ্ছে- আল সাফি ড্রিংকিং ওয়াটার, শাহারী অ্যান্ড ব্রাদার্স, মর্নডিউ পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার, আরআর ডিউ পিউরিফাইড ড্রিংকিং ওয়াটার, শান্ত ফুড প্রোডাক্টস, জাহাঙ্গীর ফুড প্রোডাক্টস এবং বনলতা সুইটস অ্যান্ড বেকারি। ইসহাক আলী আরও জানান, লাইসেন্স স্থগিত করা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- সিটি অয়েল মিলের তীর ব্রান্ডের সরিষার তেল, গ্রিন ব্লিসিং ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডা. জিবি, শবনব ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রির পুষ্টি তেল, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডের রুপচাঁদা সরিষার তেল, আররা ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ড্রিংকিং ওয়াটার, ডানকান প্রোডাক্টের ন্যাচারাল মিনারেল ওয়াটার, দীঘি ড্রিংকিং ওয়াটার, প্রাণের লাচ্ছা সেমাই, কারি পাউডার ও হলুদের গুঁড়া। এ ছাড়া ড্যানিশ ফুড লিমিটেডের হলুদের গুঁড়া, কারি পাউডার, তানভির ফুড লিমিটেডের ফ্রেশ হলুদের গুঁড়া, মোল্লা সল্ট, এসিআই ফুড লিমিটেডের ধনিয়া গুঁড়া ও আয়োডিনযুক্ত লবণ, নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টের নুডুলস এবং কাসেম ফুড প্রোডাক্টের সান চিপস।

রোজার মাস শুরু হলে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফার লোভে বেপরোয়া হয়ে যান। তারা নিম্নমানে ও ভেজাল খাদ্যপণ্য দিয়ে ভোক্তাদের ঠকিয়ে থাকেন। বিশেষ করে ইফতারের উপকরণের মধ্যে সরিষার তেল, পানি, সেমাইসহ সফট ড্রিংকস। তা আমলে নিয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) রোজার আগেই খোলা বাজার থেকে ৪০৬টি পণ্যের নমুন কিনে ল্যাবে পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৩১৩টির পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া গেছে।

তার মধ্যে ৫২টি পণ্যের মান নিম্নমানের হওয়ায় বিএসটিআই সম্প্রতি তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে। ভোক্তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে কনসার্স কনজুমার সোসাইটির পক্ষে রিট করা হয়। নামিদামি বিভিন্ন কোম্পানির ৫২টি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশনা চেয়ে ৯ মে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। ওইদিন রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিএসটিআইয়ের দুই কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে হাজির হতে বলেন ১২ মে। গত রোববার রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট নামিদামি বিভিন্ন কোম্পানির ৫২টি পণ্য প্রত্যাহার ও পুনরায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এসব পণ্যের উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি উৎপাদনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন আদালত।

একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে এ আদেশ প্রতিপালন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ভেজালের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানের মতো খাদ্যে ভেজাল মেশানোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। প্রয়োজনে ভেজালের বিরুদ্ধে জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করা যেতে পারে।

জনস্বার্থে করা একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিল সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ ওই নির্দেশ দেন। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন শিহাব উদ্দিন খান। তিনি বলেন, আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

এ বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার এর আগে যেমন মাদকের বিরুদ্ধ যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, প্রয়োজনে ভেজালের বিরুদ্ধেও একই রকম ব্যবস্থা নেবে।হাইকোর্টের ওই আদেশের পর বিভিন্ন কোম্পানির নিম্নমানের পণ্য বাজার থেকে তুলে নেয়া হচ্ছে কি না তা জানতে গতকাল বিভিন্ন খুচরা, পাইকারি ব্যবসায়ী ও কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে কথা বলা হয়। জানতে চাওয়া হয় পণ্যগুলো আসলে বাজারে থাকবে না তুলে নেয়া হবে।

এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুর টাউনহল মার্কেটের স্বপ্নের সেলসম্যান মিঠুন হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, কোর্টের আদেশের পর থেকেই এসিআই, লবন, প্রাণের হলুদ, ফ্রেশের মসলাসহ অন্যান্য যে সব পণ্য আমরা বিক্রি করতাম তা তুলে নিয়ে গেছে কোম্পানির লোকজন। তীরের ডিলার আমিনা ট্রেডার্সের মালিক আল-আমিন ভূঁইয়া জুয়েল বলেন, তীরের সরিষার তেল তুলে নেয়া হয়েছে বাজার থেকে। গোডাউনে প্যাকেট করে রাখা হচ্ছে।

যেখানে প্যাকেট করে আনা হয়েছিল, সেভাবেই কোম্পানির লোক নিয়ে যাবে। তা জানতে তীর কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার আমিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, মঙ্গলবার থেকে মার্কেট থেকে সরিষার তেল তুলে নেয়া হচ্ছে। এগুলো কি ধ্বংস করা হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। বাজার থেকে তুলে হচ্ছে এটাই জানি। ধ্বংস করা হবে কি হবে না তা কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। তাই ডিলারদের প্যাকেট করে রাখতে বলা হচ্ছে। কেউবা বস্তাবন্দি করে রাখছেন বলেও জানান তিনি।

ফ্রেশ তানভির ফুড লিমিটেডের ফ্রেস ব্রান্ডের হলুদ গুড়া রয়েছে ওই ৫২ পণ্যের মধ্যে। এ মসলাও বাজার থেকে তুলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে মেঘনা গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক আসিফ ইকবালের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তার অধিনস্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার সত্ত্বেও বলেন, কোনো কথা বলা সম্ভব না। যা বলার কোম্পানির শীর্ষ বসেরা বলবেন।

প্রাণ গ্রুপের লাচ্ছা সেমাই, হলুদের গুঁড়া ও কারি পাউডার রয়েছে ওই ৫২ পণ্যের মধ্যে। তাই মতামত জানতে গতকাল ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইলয়াস মিধার সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক-এজিএম কে এম জিয়াউল হক বলেন, আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই ওই তিনটি পণ্যের উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজার থেকে ওইসব পণ্য তুলে নেয়া শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

নিম্নমানের ৫২ পণ্য হলো- সিটি অয়েলের সরিষার তেল, গ্রিন ব্লিচিংয়ের জিবি সরিষার তেল, শমনমের সরিষার তেল, বাংলাদেশ এডিবল ওয়েলের সরিষার তেল, কাশেম ফুডের চিপস, আরা ফুডের ড্রিংকিং ওয়াটার, আল সাফির ড্রিংকিং ওয়াটার, মিজানের ড্রিংকিং ওয়াটার, মর্ণ ডিউয়ের ড্রিংকিং ওয়াটার, ডানকানের ন্যাচারাল মিনারেল ওয়াটার, আরার ডিউ ড্রিংকিং ওয়াটার, দীঘির ডিংকিং ওয়াটার, প্রাণের লাচ্ছা সেমাই, ডুডলি নুডলস, শান্ত ফুডের সফট ড্রিংক পাউডার, জাহাঙ্গীর ফুড সফট ড্রিংক পাউডার, ড্যানিশের হলুদের গুঁড়া, প্রাণের হলুদ গুঁড়া, ফ্রেশের হলুদ গুঁড়া, এসিআইর ধনিয়ার গুঁড়া, প্রাণের কারি পাউডার, ড্যানিশের কারি পাউডার, বনলতার ঘি, পিওর হাটহাজারী মরিচ গুঁড়া, মিষ্টি মেলার লাচ্ছা সেমাই, মধুবনের লাচ্ছা সেমাই, মিঠাইয়ের লাচ্ছা সেমাই, ওয়েল ফুডের লাচ্ছা সেমাই, এসিআইর আয়োডিনযুক্ত লবণ, মোল্লা সল্টের আয়োডিন যুক্ত লবণ, কিংয়ের ময়দা, রূপসার দই, মক্কার চানাচুর, মেহেদীর বিস্কুট, বাঘাবাড়ীর স্পেশাল ঘি, নিশিতা ফুডসের সুজি, মঞ্জিলের হলুদ গুঁড়া, মধুমতির আয়োডিনযুক্ত লবণ, সান ফুডের হলুদ গুঁড়া, গ্রিন লেনের মধু, কিরনের লাচ্ছা সেমাই, ডলফিনের মরিচ গুঁড়া, ডলফিনের হলুদের গুঁড়া, সূর্যের মরিচের গুঁড়া, জেদ্দার লাচ্ছা সেমাই, অমৃতের লাচ্ছা সেমাই, দাদা সুপারের আয়োডিনযুক্ত লবণ, মদিনার আয়োডিনযু্ক্ত লবণ ও নুরের আয়োডিনযুক্ত লবণ।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত