মালিকানার বিনিময়ে কারামুক্তি!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম  |  ০০:৪৪, মে ১৬, ২০১৯

শিরোনামটি পড়ে অবাক লাগলেও এমনটাই ঘটেছে লন্ডন প্রবাসী এক বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীর জীবনে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে বিনিয়োগ করলেও ভাগ্যে জুটেছে নির্মম কারাবাস। হারাতে হয়েছে বিনিয়োগের অর্থে পাওয়া শেয়ার। প্রতারণার ফাঁদে পড়া ওই প্রবাসীর কাছে বাংলাদেশ এখন এক আতঙ্কের নাম।

ঘটনার শুরু ২০০৪ সালে। ওই সময়ে ঢাকা রিজেন্সি লিমিটেড নামে একটি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করার জন্য লন্ডনজুড়ে ব্যাপক প্রচারণা চালান উদ্যোক্তা আরিফ মোতাহার, মুসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও কবির রেজা।

মুনাফাসহ সব ধরনের সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। লোভনীয় বিনিয়োগ অফারে তৎকালীন সময়ে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন লন্ডন প্রবাসী ১২০ জন বাংলাদেশি। তাদের একজন যুক্তরাজ্যের নাগরিক মজিদ খান। বাবার নাম মোহাম্মদ খান। বিনিয়োগের অর্থ হারিয়েও প্রাণভয়ে দেশে আসেন না এ প্রবাসী।

সূত্র মতে, ২০০৫ সালে উদ্যোক্তা আরিফ মোতাহার, মুসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও কবির রেজার সঙ্গে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড গঠনে চুক্তিবদ্ধ হন ওই ১২০ প্রবাসী। ১০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পে উদ্যোক্তারা ৫২ কোটি টাকা এবং প্রবাসীরা শেয়ার হোল্ডার হিসেবে ৪৮ কোটি টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। চুক্তি অনুযায়ী- প্রতিটি শেয়ার ২৫ হাজার পাউন্ড বা ২৯ লাখ টাকা করে প্রদান করেন প্রবাসীরা।

কোম্পানির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী- ওই তিন উদ্যোক্তা গ্রুপ ‘এ’ এবং প্রবাসী শেয়ারধারীদের গ্রুপ ‘বি’ ধরা হয় এবং উভয় গ্রুপের সমন্বয়ে পরিচালনা বোর্ড গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কোম্পানি গঠনের পর থেকেই কার্যত প্রতিষ্ঠানটিকে জিম্মি করেছেন তিন উদ্যোক্তা পরিচালক।

পারিবারিক বোর্ড বানিয়ে অন্তত ১২ বছর ধরে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেছেন তারা। বিনিয়োগকারীদের কোনো খবর রাখেননি উদ্যোক্তারা। পরিচালনা বোর্ডে সদস্য তো দূরে থাক, এজিএমেও আমন্ত্রণ জানানো হয় না। ১৪ বছরে মাত্র চারবার নামমাত্র লভ্যাংশ দেয়া হলেও তা কি পরিমাণ আয়ের ওপর দেয়া হয়েছে তা জানানো হয়নি।

কোম্পানি গঠনের নিয়ম ভঙ্গ করে ওই তিন পরিচালকের স্ত্রী ও একজনের মায়ের নামে শেয়ার দেখিয়ে মোট সাতজনের পারিবারিক বোর্ড বানানো হয়েছে। ওই তিনজনের মধ্যেই ঘুরে ফিরে তারা চেয়ারম্যান, এমডি ও পরিচালক থাকছেন।

আক্রোশের শিকার মজিদ খান : ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে চলমান এসব অনিয়মের ব্যাখ্যা চাইতে ২০১৩ সালের অক্টোবরে ১২০ বিনিয়োগকারী থেকে ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পাঠানো হয়। প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য মজিদ খান। প্রতিনিধি দলটি ঢাকায় এসে সব শেয়ার হোল্ডারদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে আরিফ মোতাহার, মুসলেহ উদ্দিন আহমেদ ও কবির রেজার ওপর চাপ প্রয়োগ করেন।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই তিন প্রতারক প্রতিনিধি দলকে উল্টো ভয়ভীতি দেখান। পরে ২০১৪ সালে অধিকার ফিরে পেতে ঢাকায় আসেন মজিদখানসহ কয়েকজন প্রবাসী বিনিয়োগকারী। বরাবরের মতো উঠেন ঢাকা রিজেন্সিতে। নাজমা আরিফ মজিদ খানকে বাংলাদেশ ছাড়ার জন্য হুমকি দেয়। না হলে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর কথা বলা হয়। কিন্তু তারা হুমকি পাত্তা না দিয়ে আইনি ব্যবস্থায় যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল রাতে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে হানা দেয় পুলিশ। হোটেলের রুম থেকে মজিদ খানসহ চারজনকে হাতকড়া পরিয়ে পল্টন থানায় আনা হয়। তাদের বিরুদ্ধে গুলিস্তান স্টেডিয়ামের বাইরে একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের মামলা রয়েছে বলে থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

পরের দিন আদালতে জামিন নামঞ্জুর হলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর কারাগারে থাকা ৩ মাসের মধ্যে চুরি, রাস্তার সহিংসতা, ডাকাতি, বিস্ফোরণের অভিযোগে ঢাকা, সিলেট ও যশোরে ৭টি মামলা দেয়া হয়। যার নেপথ্যে ছিলেন মুসলেহ আহমেদ, কবির রেজা, আরিফ মোতাহার।

মজিদ খান জানান, মামলা চলাকালীন শুনানিতে আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের প্রমাণাদি দিতে পারেনি। আমরা আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে অভিযোগকারীর সনাক্তকরণ নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ প্রসিকিউটরকে চ্যালেঞ্জ করেছি কিন্তু পুলিশ তা করতে ব্যর্থ হয়ছে। কারণ এটি কোনো প্রকৃত অভিযোগ ছিল না এবং আমাদের দ্বারা কোনো অপরাধও সংঘটিত হয়নি।

তিনি জানান, ঢাকা, সিলেট, যশোর কারাগারে আমাকে খুবই কষ্টভোগ করতে হয়। আমার লন্ডনে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি নাই। ঢাকাস্থ যুক্তরাজ্যের দূতাবাসের মাধ্যমে জানতে পারি, আমার জন্য মা, স্ত্রী, সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা খুবই উদ্বিগ্ন।

এমন অবস্থায় ২০১৪ সালের রমজান শুরুর দুদিন আগে ১ জুলাই ঢাকা কারাগারে আনা হয়। এখানে আসার পর তাদের পক্ষে আমার কাছে একটি বার্তা পাঠানো হয়। বলা হয়- আমি যদি আমার নামে থাকা শেয়ার নাজমা আরিফের নামে (আরিফ মোতাহারের স্ত্রী) হস্তান্তর করি, তাহলে সব মামলা প্রত্যাহার হবে এবং জেল থেকে মুক্তি পেতে পারি। না হলে আরও মামলা দিতে থাকবে, কখনো বের হতে পারব না।

মজিদ খান জানান, পরদিন ২ জুলাই আমাকে ঢাকা কারাগারের জেল সুপারের অফিসে ডাকা হয়। আমার মুক্তির বিনিময়ে স্বাক্ষর করার জন্য শেয়ার বিক্রির ডকুমেন্ট দেয়া হয়। সেখানে বলা হয়- আমার শেয়ারগুলো নাজমা আরিফের কাছে অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তর করি। অথচ স্বাক্ষর করার জন্য আমাকে একটি টাকাও দেয়া হয়নি। এ ঘটনার পরের দিন ৩ জুলাই আমাকে ঢাকা কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয় এবং প্রাণভয়ে ৪ জুলাই লন্ডনে চলে আসি।

মজিদ খান দাবি করেন, জেলে থাকাকালীন সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি, সেই সময় আমাকে জেল থেকে বের করার জন্য আমার পরিবারের সদস্যরা উদগ্রীব হয়ে উঠেন। সেই সুযোগে কবির রেজা, আরিফ মোতাহার ও মোসলেহ আহমদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রতারক মোহাম্মদ রাজ (প্রাক্তন নাম গয়াছ মিয়া) আমাকে জেল থেকে বের করে দেয়ার কথা বলে আমার ভাইয়ের কাছ থেকে ১০ হাজার পাউন্ড হাতিয়ে নেয়।

মজিদ খান বলেন, কারাগারের চরম কষ্টের জীবন হতে মুক্তির জন্য আমি তাদের দেয়া নথিতে স্বাক্ষর করেছিলাম। কারাগার থেকে নেয়া ওই স্বাক্ষর বৈধ বা আইনি নথি হতে পারে না। কারণ ওটা আমাকে বাধ্য করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলার অভিযোগগুলো, জেলখানায় আটক রাখার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই এবং প্রতারক মুসলেহ আহমেদ, কবির রেজা, আরিফ মোতাহার, নাজমা আরিফ, মোহাম্মদ রাজের শাস্তি চাই।

কয়েকজন বিনিয়োগকারী বলেন, লন্ডন প্রবাসী মজিদ খান ছোটবেলা থেকেই লন্ডনে বসবাস করছেন এবং সেই দেশটির নাগরিক, ঠিক মতো বাংলায় কথা বলতে পারেন না। কিন্তু উনার সাথে যেসব আচরণ করা হয়েছে, একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমরা লজ্জিত। ওই তিন প্রতারকের কারণে উনি এখন বাংলাদেশ নামটি শুনলে ভয় পান।

সূত্র মতে, শুধু মজিদ খানই নয়, ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের ওই তিন প্রতারকের বিরুদ্ধে কথা বলায় আরও একাধিক বিনিয়োগকারী হয়রানির শিকার হয়েছেন। আর বিনিয়োগ করা লন্ডন প্রবাসী ১২০ বাংলাদেশিই জিম্মি হয়ে পড়েছেন। কোম্পানি প্রতিষ্ঠার শুরুর আগে পরিচালক বানানোসহ বছরে মুনাফার লোভ দেখানো হলেও হোটেলটি চালুর পর ন্যায্য শেয়ার দেয়া হয়নি।

ঢাকা রিজেন্সি হোটেল সূত্র মতে, বর্তমানে হোটেলটির চেয়ারম্যান হলেন- উদ্যোক্তা পরিচালক মুসলেহ উদ্দিন আহমেদ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান দিলকুশা বেগম (তিনি আরিফ মোতাহারের মা এবং কিছুদিন আগে মারা যান), ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবির রেজা, পরিচালক নাজমা আরিফ (আরিফ মোতাহারের স্ত্রী), রোকেয়া খাতুন (কবির রেজার স্ত্রী), জেবুন নেসা (মুসলেহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী) এবং আরিফ মোতাহার। তিনি এর আগে চেয়ারম্যান ও এমডি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

একাধিক বিনিয়োগকারী জানান, ঢাকা রিজেন্সি হোটেল প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই প্রতারণার আশ্রয় নেন তিন উদ্যোক্তা পরিচালক। কোম্পানি গঠনে প্রবাসীদের কাছ থেকে নেয়া ৪৮ কোটি লেনদেনের প্রমাণপত্র থাকলেও ওই তিনজনের ৫২ কোটির কোনো প্রমাণ নেই। শেয়ারধারীরা ওই ৫২ কোটি টাকা কোম্পানিতে কিভাবে ঢুকানো হয়েছে এবং কোথায় ব্যয় হয়েছে- বারবার জানতে চাইলেও তারা তা প্রদর্শন করতে পারেনি।

২০০৫ সালে ৫২ কোটি দূরে থাক ৩ কোটি দেয়ার কোনো সামর্থ্য তাদের ছিল না বলে দাবি করেন একাধিক প্রবাসী বিনিয়োগকারী। এছাড়া লভ্যাংশ প্রদানের সময় প্রবাসী বিনিয়োগকারী হিসেবে ট্যাক্সের অর্থ কেটে রাখা হলেও কোনো রশিদ দেয়া হয়নি। আদৌ ওই ১২০ লন্ডন প্রবাসীর ট্যাক্সের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কিনা জানেন না তারা।

ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডে মালিকানার ন্যায্য অধিকার পেতে নানা অনিয়মের অভিযোগে বিনিয়োগকারীদের পক্ষে পৃথক দুটি মামলা করেন এম. মোহিদ আলী মিঠু নামে এক প্রবাসী বিনিয়োগকারী। তিনি যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি এবং কমিউনিটি নেতা হিসেবে বেশ পরিচিত। আরেকটি মামলা দায়ের করেছেন ২৭ জন বিনিয়োগকারী। মামলা তিনটি হাইকোর্টের কোম্পানি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

বিনিয়োগকারী এম. মোহিদ আলী মিঠু বলেন, ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড ১০০ কোটি টাকার কোম্পানি হলেও বর্তমানে সবকিছু মিলিয়ে এক হাজার কোটি টাকার বাজারমূল্য রয়েছে। যা পুরোটাই ওই তিনজন ভোগ-দখল করছে। প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ বা সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে না।

মোহিদ আলী মিঠু আরও বলেন, তিন প্রতারকের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে তিনটি মামলা বিচারাধীন এবং আরও মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। তিনি আশা করেন- ন্যায় বিচার পাবেন।

জানতে চাইলে কোম্পানি সচিব মিজানুর রহমান অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া মেনেই মজিদ খানের শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি অর্থ বুঝে পেয়েই স্বাক্ষর করেছেন। অর্থ না দিয়ে কারাগার হতে জোর করে স্বাক্ষর আনা সম্ভব না। শেয়ার হস্তান্তরের বৈধ সব কাগজপত্র রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অভিযোগের প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা পরিচালক আরিফ মোতাহারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।


আরো পড়ুন:- অন্ধকারে ঢাকা রিজেন্সির ১২০ প্রবাসী বিনিয়োগকারী