শিরোনাম

অসুস্থ এরশাদ নেই রওশন

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম  |  ০১:০৭, মে ১৫, ২০১৯

অনেকটা নিঃসঙ্গ সময় কাটাচ্ছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। শারীরিক নানা ব্যাধি নিয়ে ৯০ বছর বয়সি এ রাজনীতিবিদের হাসপাতাল আর বাসায় কাটছে দিন।

তবে জীবন সায়াহ্নে থাকা সাবেক এ রাষ্ট্রপতির পাশে নেই কেউ। স্ত্রীসহ নিকট আত্মীয় কেউ থাকেন না পাশে। দলের সিনিয়র নেতারাও খোঁজ নেন না। ব্যক্তিগত কর্মচারীদের সঙ্গে কাটছে সময়। তাদের সহযোগিতাই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

দেশের রাজনীতিতে স্বৈরশাসক খ্যাত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অদ্বিতীয়। স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত সমালোচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি। টানা নয় বছর দেশ পরিচালনা করেছেন শক্ত হাতে। তার সময়ে দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ভিত রচিত হয়।

নয় বছরের প্রায় পুরোটা সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, সিপিবিসহ দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল তাকে স্বৈরাচার আখ্যায়িত করে রাজপথে তার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন করেছে। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার পর সবাই ভেবেছিলো হয়তো এখানেই শেষ এরশাদ অধ্যায়ের। কিন্তু না, ৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারাগারে থেকে তিনি একাই জয়লাভ করেন পাঁচটি আসনে।

এরপর ৩ দশকের রাজনীতিতে ক্ষমতার নিয়ামক এরশাদের দল জাতীয় পার্টি। ১৯৯৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনেই জাতীয় পার্টি ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সামনে বরাবরই বড় ফ্যাক্টর এরশাদ।

এককভাবে কেউ ক্ষমতায় যেতে পারেনি। এরশাদের জাতীয় পার্টি যেদিকে হেলেছে, ক্ষমতার মুকুট তাদেরই হয়েছে। দীর্ঘ ২১ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে। ওই নির্বাচনে কারাগারে থেকেই এরশাদ একাই ৫টি আসনে জয়লাভ করেন।

২০০১ সালে নবম জাতীয় নির্বাচনের কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগের জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি। নির্বাচনের শেষ দিকে বিএনপি-জামায়াত জোটের দিকে অনেকটা হেলে পড়েন এরশাদ। যার কারণে ওই নির্বাচনে ফলাফল ঘরে তুলতে পারেনি আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আবারো জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মহাজোট হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। এরপর ২০১৪ ও ২০১৯ সালের ক্ষমতার আসার প্রধান নিয়ামক ছিল এরশাদই।


তথ্য মতে, এক সময়ের প্রতাবশালী সাবেক সেনাশাসক এইচএম এরশাদ আজ জীবন সায়াহ্নে একা। এখন অনেকটা নিঃসঙ্গ। পরিজন বলতে পাশে থাকার মতো কেউই নেই। পরিচর্চা করেন স্টাফরা। অধিকাংশ সময় কাটে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। দলের নেতাকর্মীরা এখন আর ভিড় করেন না বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে।

দলের কোনো কর্মসূচিতে তিনি আর অংশ নেন না। নব্বই বছরের শরীর আর সায় দেয় না। আধা কিলোমিটারের মধ্যে শুলশানে স্ত্রী ও পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদ বসবাস করলেও তিনি বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে এইচএম এরশাদের খোঁজ নিতে স্বশরীরে বাসায় আসেন না।

গত পাঁচ বছরে ১৭ বার এইচএম এরশাদ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে গিলেও স্ত্রী রওশন এরশাদ একবারও সঙ্গে যাননি। আমেরিকায় অবস্থানরত এরশাদের আরেক ভাই মঞ্জুর মুর্শেদ ও তার সহধর্মিণী রোকসানা মুর্শেদ এরশাদ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় সর্বক্ষণ তার সাথে ছিলেন।

গত জাতীয় নির্বাচনের আগে এইচএম এরশাদের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হলে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেশে সুস্থতা কামনায় জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে একাধিক মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হলেও কোনো দোয়া মাহফিলে অংশ নেননি খোদ রওশন এরশাদ। তবে ছোট ভাই জিএম কাদের প্রায়ই আসেন বারিধারার বাসায়। স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন।

জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক বিষয় নিয়েও আলাপ করেন। সবমিলিয়ে জীবন সাহাহ্নে এসে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন সাবেক এই সেনাপ্রধান। এরশাদের দীর্ঘদিনের কর্মচারী আব্দুল ওহাব, আব্দুস সাত্তার, বাদশা, নিপা ও রুবির তত্ত্বাবধায়নে কাটছে এরশাদের দিনকাল।

রওশন এরশাদ জাপা চেয়ারম্যান এরশাদকে দেখতে প্রেসিডেন্ট পার্কে আসেন কিনা জানতে চাইলে এরশাদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিগত সহকারী আব্দুল ওহাব প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাদের পিতার মতো। অসুস্থ পিতাকে সন্তান যেমন সেবা যত্ন করে, আমরা আমাদের পিতার সেবা করে যাচ্ছি।

গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই অসুস্থ হয়ে পড়েন সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ। মনোনয়নপত্র জমাদানের পরপরই তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তবে তখনো তিনি পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না। সিঙ্গাপুর থেকে এসেই পুনরায় তিনি ঢাকার সিএমএইচএ ভর্তি হন। নির্বাচনের পর তিনি আবারো সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা নেন।

জাপা সূত্র মতে, এরশাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে উত্থান-পতনে সব সময় পাশে ছিলেন তার স্ত্রী বর্তমান সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ। ১৯৫৬ সালে তারা দুজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ দাম্পত্ত জীবনে সুখে-দুঃখে থাকেন এক সঙ্গে।

এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে ছিলেন ফার্স্ট লেডির মর্যাদায়। এরশাদের রাষ্ট্রপতিকালীন সময়ে রওশন এরশাদ সমাজকল্যাণ ও নারী-শিশুর অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি ‘বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থা’র প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৯৭৫ সালে তিনি ‘সেনা পরিবার কল্যাণ সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালে হঠাৎ বিদিশাকে বিয়ের খবরে ফাটল ধরে এরশাদ-রওশনের জীবনে। এরশাদ-বিদিশার সংসারে এরিক নামে একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। ২০০৬ সালে এরশাদ বিদিশার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। মূলত ২০০১ সাল থেকেই এরশাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের নানা নাটকীয়তা শুরু হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এরশাদের জাপা।

ওই নির্বাচন ইস্যুতে জাপায় এরশাদ ও রওশনকে কেন্দ্র করে দলে দুটি বলয় তৈরি হয়। এরপর থেকে জাতীয় পার্টি চলছে বলয় দুটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি।

জানতে চাইলে এইচএম এরশাদের ছোট ভাই পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের প্রায় সারাদিনই বাসায় কাটে। শরীরটা খারাপ বোধ করলে ডাক্তারের কাছে যান। শারীরিক পরিচর্চা কারা করেন জানতে চাইলে বলেন, কাজের লোক আছে। তারাই পরিচর্চা করেন। আমরা প্রায় দেখা করি, খোঁজখবর নেই।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত