শিরোনাম

এবারের বাজেট হবে ৫ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম  |  ০০:৫২, মে ১৫, ২০১৯

যতই দিন যাচ্ছে বাজেটের আলোচনা ততই গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে থাকছে কিছু নতুনত্ব। আগামী ১৩ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করবেন এই সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল।

ওইদিন তিনি সব মানুষের, দেশের উন্নয়ন এবং দেশকে সব দিকে বিকশিত করতে নতুন বার্তা দিবেন। শহর গ্রাম ভেদাভেদ দূর করারও বার্তা দিবেন। রাজস্ব আদায় করতে তিন স্তরের ভ্যাটহার জুলাই থেকে কার্যকর করারও ঘোষণা করা হবে। করের হার না বাড়িয়ে নেট বাড়ানো হবে।

দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে নজর দিতেও গুচ্ছ প্রকল্প ঘোষণা করা হবে। দীর্ঘদিনের রেওয়াজ পাল্টে ২০০ পৃষ্ঠার পরিবর্তে আগামী বাজেট বক্তৃতা স্মার্ট আকারে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরা হবে।

কৃষকদের বাঁচাতে শস্য বীমা চালু করারও ঘোষণা থাকবে বাজেটে। পদ্মা, মেট্রোরেলসহ যোগাযোগকেও অগ্রাধিকার দেয়া হবে বাজেটে। এসব দিক বিবেচনা করে সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৫ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করবে। যা এ যাবৎকালের রেকর্ড। সব প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে বলে সূত্র জানায়।

একাধিক সূত্র জানায়, একাদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশন বসছে আগামী ১১ জুন। এ অধিবেশনেই আগামী অর্থবছরের বাজেট পাস হবে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ওইদিন বিকাল ৫টায় সংসদ অধিবেশন ডেকেছেন। গত সোমবার সংসদ সচিবালয় থেকে তা জানানো হয়।

আগামী ১৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তার বাজেট প্রস্তাবের পর এর ওপর আলোচনা করবেন সংসদ সদস্যরা। মাসের শেষ দিকে বাজেট পাস হবে। আ.লীগের তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর এটাই হতে যাচ্ছে বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট। সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল এবারে অর্থহিসেবে প্রথম বাজেট পেশ করবেন।

অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বাজেটে এবার কর বাড়বে না। তবে করের আওতা বাড়ানো হবে। সব মিলে আগামীর বাজেট ৫ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার হবে। যা এ যাবৎকালের রেকর্ড। বিশাল এ বাজেট চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

বিশাল বাজেট মোকাবিলা করতে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের রাজস্ব ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত রাজস্ব ধরা হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এবং কর ছাড়া রাজস্ব ধরা হয়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। যা ৫ শতাংশের কম।

জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। যেখানে চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হলেও অনেক বেশি অর্জন ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ হবে বলে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। বিশাল বাজেটের ব্যয় মেটাতে এবারে করের হার না বাড়িয়ে নেটের আওতা বাড়ানো হবে। এ জন্য জুলাই থেকে ভ্যাট কার্যকর করা হবে তিন স্তরের ৫, ৭ ও ১০ শতাংশ।

যা আগে ছিলো ১৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বর্তমানে কম থাকলেও তা ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআইর সঙ্গে এবারে আগেই পরামর্শক সভা হয়ে গেছে। তারা ব্যবসাবান্ধব বাজেট দেয়ার জন্য বিভিন্ন মতামত তুলে ধরেছে। তা সরকার আমলে নিয়ে বাজেট পেশ করা হবে বলে সূত্র জানায়।

অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথম বাজেট কেমন হবে, তা জানার জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করলেও আহম মুস্তফা কামাল শুধু অপেক্ষা করতে বলছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, বাজেটের ‘মজা পাওয়ার জন্য’ অপেক্ষা করতে হবে। বলেন, এই বাজেট হবে পুরো বাংলাদেশের মানুষের জন্য, যা দেশের প্রতিটি মানুষের কাজে লাগবে দেশের উন্নয়ন হবে। দেশ সব দিকে বিকশিত হতে পারবে।

কোন খাত এই বাজেটে গুরুত্ব পাবে- এমন প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটাতো বলা যাবে না। তাতে বাজেটের মজা থাকবে না। তিনি আরও বলেন, আগামীর বাজেট সহজ করে একটি বাজেট দেবেন, যা দেশের সাধারণ মানুষও বুঝতে পারেন। আর সেই বাজেটে দেশের মানুষ নতুন কিছু পাবেন। তবে বাজেটে এবার কর বাড়বে না। কিন্তু করের আওতা বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, ব্যাংক ও শেয়ার মার্কেটের জন্য উপজীব্য যা আছে তাই থাকবে। বাজেট অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা। খোলাখুলি আলোচনা করার বিষয় নয়।

বাজেটে সবারই চাহিদা থাকে। তবে বাজেট প্রণয়নে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। চ্যালেঞ্জ যা আছে তা বাস্তবায়ন সম্ভব বলে জানান তিনি। দেশে সবাই ট্যাক্স দিচ্ছে না। এদেশে ৪ কোটি মানুষ আছে মিডল ইনকাম গ্রুপে, ট্যাক্স দেয় ২২ লাখ। তা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, আমরা মানুষের সমস্যার কথা জেনে আগামী বাজেটের দর্শন হবে জনগণকে সম্পৃক্ত করে ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান ছাড়াও গ্রাম উন্নয়নে প্রাধান্য থাকবে। যাতে গ্রাম হবে শহর। আর বাজেট বক্তৃতা যাতে সবাই বুছতে পারে তার ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য সংক্ষিপ্ত ও সাবলীল ভাষায় করা হবে ।

সূত্র আরও জানায়, বাজেটে অন্যান্য খাতের মতো হাওরের কৃষকদের রক্ষা করতেও সরকার এই প্রথমবারের মতো উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রথমে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন ও পরে বেসরকারি বীমা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এই শস্য বীমা চালু করা হবে।

এছাড়া বাজেটে কৃষি ঋণের প্রবাহ, গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্পে ঋণের জোগান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে। অটোমেশনের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র সেবা চালু, খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, কর্পোরেট কর হার হ্রাসের বিষয়ও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বাজেটে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে বের করে আনতে সংশ্লিষ্ট পরিবারে একটি করে চাকরি দেয়ার কর্মসূচিও ঘোষণাতে থাকবে বলে জানা গেছে। বাজেট বই বিশাল আকারের ১৫০ থেকে ২০০ পৃষ্ঠার পরিবর্তে ১০০ এর নিচে রাখার চেষ্টা করা হবে।

কারণ অর্থমন্ত্রী প্রথম থেকে বলে আসছেন, স্বচ্ছ ভাষায়, সহজ করে সবার বুঝার জন্য বাজেট বক্তৃতা প্রকাশ করা হবে। এদিকে, সরকারের উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নিতে এবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি চাহিদা করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। বাস্তবতা বিবেচনা করে যোগাযোগে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা প্রাক্কলন করেছে।

এরমধ্যে প্রকল্প সাহায্য ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নও রয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। সবমিলে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। যা চলতি অর্থবছরে প্রথমে ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও পরে সংশোধন করে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে।

এদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে এবার গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বড় ধরনের হুমকির মধ্যে আছে। প্রতি বছর আগাম ও স্বাভাবিক বন্যায় আক্রান্ত হচ্ছে দেশ। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বা অনাবৃষ্টি হচ্ছে। আবার কখনো খরাসহ অসহনীয় গরমও দেখা দিচ্ছে। এতে একদিকে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

অন্যদিকে নানাবিধ সমস্যার কারণে অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তাই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আগামী বাজেটে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে। এ বরাদ্দের পর নতুন করে আরও ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত