শিরোনাম
খালেদার সামনে আরেকটি ঈদ!

বিএনপির অবস্থা লেজেগোবরে

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০০:২৫, মে ১৫, ২০১৯

*এক জেল থেকে আরেক জেলে নেয়া অমানবিক -ড. এমাজউদ্দিন
*কেন্দ্রীয় কারাগারে নিলে তা হবে নিষ্ঠুর আচরণ-খন্দকার মাহবুব
*চিকিৎসা না করে কারাগারে নেয় ঠিক হবে না -আমান উল্লাহ
*খালেদা জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করা হচ্ছে-মাহবুব উদ্দিন

কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার মুক্তির স্বপ্নে সংসদে গেল বিএনপি। দলীয় সূত্রগুলোর ইঙ্গিত ছিলো বিএনপি নেতারা সংসদে গেলে খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি মিলবে। কিন্তু সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর লন্ডন সফরের পর সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেল। এ প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এদিকে খালেদার মুক্তি নিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে বের করা এবং আন্দোলন, আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করে সরকারকে চাপের মধ্যে রেখে মুক্তিতে বাধ্য করাও ভেস্তে গেছে। এখন বিএনপির অবস্থা লেজেগোবরে।

খালেদার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন, কালো পতাকা কর্মসূচিগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। তবে মাঝে মধ্যে দলীয় কর্মসূচি ব্যতীত হঠাৎ ১৫-২০ জন নিয়ে খালেদার মুক্তি মিছিল করতে দেখা যায় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে। এ পরিস্থিতিতে দলের একমাত্র সিদ্ধান্ত চলে গেছে লন্ডন নেতা তারেক জিয়ার কাছে। সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ বিএনপিতে আর গ্রহণ হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এবারো ঈদের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি হচ্ছে না। এই ঈদের আগে সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় বিএনপি নেতারা খালেদা জিয়ার কারামুক্তি আশা করেছিলেন; কিন্তু সেটির সব পথ আপাতত বন্ধই দেখছেন দলের হাইকমান্ড। তিন যুগের রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়ার মোট চারটি ঈদ কারাগারে কেটেছে। আর জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় সাজা হওয়ার পর এটি কারাগারে খালেদা জিয়ার তৃতীয় ঈদ হতে পারে বলেও ধারণা করছেন।

বর্তমানে দুর্নীতির দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসার পর তাকে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানিয়েছে সরকার।

জানা যায়, দুর্নীতি, নাশকতাসহ ১৭টি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচার হবে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের ২ নম্বর ভবনে। এরই মধ্যে বাড়িটিকে বিশেষ আদালত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। গত সোমবার আইন, বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়ের জারি করা নোটিস সংশ্লিষ্ট আদালত ও ঢাকার বিচার বিভাগে পৌঁছেছে।

এদিকে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হলেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে নেয়া হবে। জেল কোড অনুযায়ী তার সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।

খালেদা জিয়ার জীবন বিপন্ন করতেই কেরানীগঞ্জ কারাগারে নেয়া হচ্ছে, বিএনপির এ দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার জীবন বিপন্ন করতে তাকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে নেয়া হচ্ছে, এ অভিযোগ ঠিক নয়। তাকে জেল কোডের বাইরেও মানবিক কারণে অনেক ফ্যাসিলিটিজ দেয়া হচ্ছে।

আসাদুজ্জামান খান কামাল আরও বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) কারাগারে একা থাকতে পারবেন না বলেই তার চাওয়া অনুযায়ী একজনকে তার সাথে দেয়া হয়েছে। নিরপরাধ মেয়েটি খালেদা জিয়ার সঙ্গে জেল খাটছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা শেষে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তকে সরকারের ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে ব্যারিস্টার মাহবুব এ দাবি জানান। লিখিত বক্তব্যে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসুস্থ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে কারাবন্দি হিসেবে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আমরা গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি, সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসনকে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সেখানে কারাগারের ভেতরে স্থাপিত বিশেষ আদালতে খালেদা জিয়ার মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম চলবে।

ঢাকা শহরের ভেতরে বর্তমানে কোনো কেন্দ্রীয় কারাগার নেই। যেহেতু কেন্দ্রীয় কারাগারটি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হয়েছে, তাই খালেদা জিয়াকে সেখানে স্থানান্তর করা হবে। বিচারের সুবিধার্থে ও নিরাপত্তা বিবেচনায় কেরানীগঞ্জে এরই মধ্যে একটি ভার্চুয়াল আদালত তৈরি করা হয়েছে।

আইনমন্ত্রীর এ বক্তব্য উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ব্যারিস্টার মাহবুব। তিনি বলেন, কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে নারীদের কোনো জেল নেই। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া একজন অসুস্থ বয়ঃজ্যেষ্ঠ মহিলা। নারীদের চিকিৎসার জন্য কোনো বিশেষ হাসাপাতালও কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে নেই।

তারপরও বেগম খালেদা জিয়াকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো সরকারের একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। এই প্রক্রিয়াকে বিনা চিকিৎসায় খালেদা জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনার ষড়যন্ত্রের অংশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, কারাগারে তড়িঘড়ি করে বিশেষ আদালত স্থাপন করে বিচারের ব্যবস্থা করা আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং সরকারের এ কর্মকাণ্ড দেশ ও জাতির জন্য লজ্জার। আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়া স্বাধীনতা সার্বভৌমত্যের প্রতীক। বিচারের জন্য তাকে এক জেল থেকে আরেক জেলে নেয়া হচ্ছে। একজন বয়স্ক নারী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ আচরণ উচিত নয়, এটা অন্যায়। দুনিয়ার কোথাও এমন অমানবিক আচরণ দেখা যায়নি। যারা এ আচরণ করছে আল্লাহ তাদের ছাড়বে না।

তিনি আরও বলেন, সরকার গণতন্ত্রের নামে প্রতিহিংসাপরায়ণতা চালাচ্ছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশ থেকে গণতন্ত্র চলে গেছে। একদলীয় ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর মুখে বাকশালের কথা উচ্চারিত হয়।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, ম্যাডাম খালেদা জিয়া কি পরিমাণ অসুস্থ তা দেশের সকল গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। বিচারিক আদালতেও তার অসুস্থতার প্রকাশ পাওয়া গেছে। হাসপাতালের চিকিৎসকরাও বলেছেন ম্যাডাম অসুস্থ। তিনি অসহ্য যন্ত্রণায় দিন পার করছেন।

খালেদা জিয়ার এই আইনজীবী আরও বলেন, খালেদা জিয়াকে যদি চিকিৎসা না দিয়ে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় তা হবে নিষ্ঠুর আচরণ। একটি দেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিষ্ঠুর আচরণ দেশের মানুষ মেনে নেবে না। সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি আরও বলেন, এ নিষ্ঠুর আচরণ যদি করা হয় তাহলে জনগণই গণআদালতে এই সরকারের বিচার করবে। পার পেয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান আমার সংবাদকে বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসা না করে তাকে কোনোভাবেই হাসপাতাল থেকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ! এ নিয়ে অবশ্যই বিএনপি সরকারের কাছে দাবি জানাবে যাতে হাসপাতালে রেখে সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

খায়রুল কবির খোকন আমার সংবাদকে বলেন, এতদিনেও খালেদা জিয়ার মুক্তি হয়নি। এতে তৃণমূল হতাশ। ম্যাডামের মুক্তির বিষয় নিয়ে তৃণমূলে চরম হতাশা। এ মুহূর্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিএনপি পুনর্গঠন, সেটাও আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। কারণ দেশে কোনো নির্বাচন হয়নি তা দেশের মানুষ সবাই জানে। এই সরকারকে হটাতে ঐক্যবদ্ধ বিএনপির এখন প্রয়োজন সাংগঠনিক শক্তি।

এর আগে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে অবস্থান করছেন।

সফরকালীন প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে আসা নিজ দলের নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে এক বক্তব্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন শেখ হাসিনা। যা বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত ও সামাজিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, দেশনেত্রীর মুক্তি নিয়ে তিনি (শেখ হাসিনা) যা বলেছেন তাতে আমি উদ্বেগ প্রকাশ করছি। খালেদা জিয়ার মুক্তি যদি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে তাহলে সেটি শুধু উদ্বেগজনকই নয় বরং তা সামগ্রিকভাবে দেশ ও জনগণের জন্য এক অশুভ আগামীর ইঙ্গিতবাহী।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে অসহায় মানুষের প্রতিকার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থলের ওপর আস্থার ঘাটতি সৃষ্টি হবে। চরম নৈরাজ্য নেমে আসবে রাষ্ট্র ও সমাজে। সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় ও শঙ্কার পরিধি বৃদ্ধি পাবে। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে জাতি উৎকণ্ঠিত।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত