শিরোনাম

করতোয়া দখল করে টিএমএসএস’র পার্ক

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম  |  ০০:৪৭, মে ১৪, ২০১৯

বগুড়ায় প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি করতোয়া নদী দখল করে দাঁড়িয়ে আছে এনজিও টিএমএসএসের পার্ক। নদীর বালুচর দখল করে অবৈধভাবে পার্কটির একটি অংশ তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি অফিস অবৈধ স্থাপনাটি উচ্ছেদে একমত হলেও এনজিওটির অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে পেরে উঠতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন। বরং বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়ে অবৈধ স্থাপণাটি রক্ষায় শেষ চেস্টায় রয়েছে টিএমএসএস।

সবর্শেষ গত ১০ এপ্রিল জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানকে বিবাদী করে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন টিএমএসএস। তথ্য মতে, ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ টিএমএসএস একটি ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক এনজিও প্রতিষ্ঠান। ১৯৮০ সালে বগুড়ায় প্রতিষ্ঠানটি গড়ে ওঠে। এটি একটি নারীভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং দারিদ্র্যবিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মপরিধি মোটামুটি সারা দেশে বিস্তৃত হলেও মূল কর্মযজ্ঞ বগুড়াকেন্দ্রিক। টিএমএসএসের উদ্যোগে বগুড়া শহরসহ আশপাশে গড়ে উঠেছে বহু কল্যাণমূলক সংগঠন। এসব সংগঠন করতে বিভিন্ন সময়ে সরকারি খাস জমি দখলসহ স্থানীয়দের জায়গা নামমাত্র মূল্যে দখল করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সংগঠনটির বিরুদ্ধে।

সূত্র মতে, টিএমএসএসের উদ্যোগে বগুড়ার করতোয়া নদীর নওদাপাড়ায় বালুচরে টিএমএসএস মম ইন বিনোদন পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। পার্কটির একটি বড় অংশ করতোয়া নদীর অংশ। যা নিয়ে স্থানীয় সুশীলসমাজসহ প্রশাসনের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন টিএমএসএসের সঙ্গে পেরে উঠছেন না।

সূত্র আরও জানায়, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতার আসার পর সারা দেশের নদী দখলমুক্ত করে আপনরূপ ফিরিয়ে আনতে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তৎপর হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে ঢাকার পার্শ্ববর্তী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ নদীর তীর দখলমুক্ত করতে দফায় দফায় অভিযান চালানো হয়েছে এবং চলছে। এসব অভিযানে নদীগুলোর বিরাট অংশ ইতোমধ্যে দখলমুক্ত হয়েছে।

সরকার এবং মন্ত্রণালয়ের কড়াকড়ি নির্দেশনার পর করতোয়া নদী দখলমুক্ত করতে তৎপর হয়ে ওঠে স্থানীয় প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে গত মাসের ৪ এপ্রিল নওদাপাড়ার বারাকপুর মৌজায় করতোয়া নদীর ডানতীরে ঢালের ওপর নির্মিত পার্কগেটের মালিকানা নির্ধারণের জন্য টিএমএসএসের একজন প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী, সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ারকে সরেজমিন পরিমাপ করে অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত পূর্বক উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয় বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়।

ঐদিনই ৮ এপ্রিল সকাল ১০টায় জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার সময় নির্ধারণ করে প্রতিনিধি উপস্থিত থাকার জন্য টিএমএসএসকে চিঠি দেন বগুড়া পওর নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ। ৮ এপ্রিল সওজ, ভূমি সার্ভেয়ার, জেলা প্রশাসক কার্যালয় এবং টিএমএসএসের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বারাকপুর মৌজার ৬৪০৫ নং দাগে সরকারি ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত করতোয়া নদীর সীমানা সিএস নকশা অনুসারে সরেজমিন পরিমাপ করা হয়।

পরিমাপে দেখা যায়- ৬৪০৫ নং খাস খতিয়ানভুক্ত করতোয়া নদীর সিংহভাগ টিএমএসএসের পার্কের স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। অবৈধ অংশের স্থাপনাটির পরিমাণ ০.০৬০৬ একর। অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করার পর তা উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় আইন শৃঙ্খলাবাহিনী এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ জানান পওর নির্বাহী প্রকৌশলী।

উচ্ছেদ অভিযানের তৎপরতা বুঝতে পেরে ৯ এপ্রিল জমির জরিপসংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নারাজিনামা দেয় টিএমএসএস নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগম। একইসঙ্গে পওর নির্বাহী প্রকৌশলী অবস্থান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেন তিনি।

চিঠিতে ড. হোসনে আরা বেগম দাবি করেন- জরিপকালে জেলা প্রশাসনের লোকজন টিএমএসএসের প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচিত হন নাই এবং জরিপের কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনাও করেননি। পওর নির্বাহী প্রকৌশলী একতরফাভাবে জরিপ করেন এবং ঐ রাতেই অধিনস্ত জনবলের নিকট থেকে তদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করে পরের দিন ৯ এপ্রিল উচ্ছেদ প্রস্তাবনা দাখিল করেন। এর একদিন পরই ১০ এপ্রিল বগুড়া জেলা প্রশাসক, পওর নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদি করে আদালতে মামলা দায়ের করে টিএমএসএস। মামলাটি আমলে নিয়ে আগামী ২৭ জুন শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।

জানতে চাইলে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলেন, জায়গাটি দখলে রাখতে টিএমএসএস শুরু থেকেই অপচেষ্টা চালাচ্ছে। জরিপ একতরফা হওয়ার সুযোগ নেই। জরিপকাজে টিএমএসএসের প্রতিনিধি ছিলেন এবং তাদের সহযোগিতা নিয়েই জরিপ সম্পন্ন হয়েছে, যার ছবিও আছে। যেহেতু বিষয়টি এখন আদালতে গড়িয়েছে, তাই আদালত যেভাবে বলবেন আমরা সেভাবে এগোবো।

বগুড়া জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আদেশ রয়েছে। জরিপে খাস জায়গা পাওয়া গেছে। যেহেতু এটি আদালতে উঠেছে, আমরাও কাগজপত্রে জবাব দেব। আদালতের নির্দেশা মোতাবেক পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সূত্র মতে, এর আগেই করতোরা নদীটি উচ্ছেদ মুক্ত করতে গিয়ে ফিরে এসেছে স্থানীয় প্রশাসন। গত বছরের ১১ এপ্রিল বারাকপুর মৌজার ৪৪৮০ এবং ৪৪৮১ নং দাগের সওজ সম্পতি এবং করতোয়া নদীর ৬৪০৫ দাগের সরকারি খাসজমি পরিমাপ করা হয়। জরিপটি পরিচালনার পর তদন্ত প্রতিবেদনে উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সার্ভেয়ার, সওজ সার্ভেয়ার, পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিদর্শক এবং বগুড়া সদর সহকারী কমিশনার ( ভূমি) স্বাক্ষর করেন।

এতে বলা হয়— টিএমএসএস নির্মাণাধীন পাকা স্থাপনাটির অধিকাংশ করতোয়া নদীর ৬৪০৫ নং দাগের সরকারি খাস জমিতে অবস্থিত। স্থাপনাটির অবৈধ জমির পরিমাণ ০.০৬৮৫ একর। ঐ প্রতিবেদনেরও জরুরি ভিত্তিতে স্থাপনাটি উচ্ছেদের কথা বলা হয়। এরপর ২০১৮ সালের ৭ জুলাই অবৈধভাবে নির্মাণাধীন পার্কটি পরিদর্শন করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানসহ ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাগণ। নদীর সুষ্ঠু পানি প্রবাহ নিশ্চিতে নির্মাণাধীন পার্কটি দ্রুত উচ্ছেদের নির্দেশনা দেন তিনি।

এরপর গত ৩ মার্চ স্থাপনাটি উচ্ছেদের জন্য ৭ দিনের মধ্যে টিএমএসএসকে চিঠি দেন পওর। অন্যথায় পরবর্তীতের আইনানুগ ব্যবস্থাসহ টিএমএসএসকে উচ্ছেদের ব্যয় বহন করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়। উচ্ছেদের বিরুদ্বে আপত্তি জানিয়ে পুনরায় জরিপ চেয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন জানায় টিএমএসএস।

জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, বিষয়টি অবগত আছি। টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালন একটি আবেদন দিয়েছেন। এরপর সংশ্লিষ্টদের ম্যাপসহ সরেজমিন প্রতিবেদন দিতে বলেছি, তারা প্রতিবেদন দিলে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানানো যাবে। টিএমএসএসের সর্বশেষ অবস্থা জানতে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগমের মোবাইল ফোনে একাধিক বার চেষ্টা করেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত