শিরোনাম
মেম্বারের নেতৃত্বে কুমিল্লায় ফিল্মি স্টাইলে গণধর্ষণ

রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয় এতোটাই শক্তিশালী!

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ১৯:২২, মে ১১, ২০১৯

 

*রাস্তায় দাড়িয়ে স্বামী-স্ত্রীকে আটকিয়ে কাবিন ও বিশ হাজার টাকা নেয় মেম্বার নবী
*ধর্ষণ শেষে তরুণীর হাতে কনডম ধরিয়ে দিয়ে ভিডিও ধারণ
*মামলা করতে কালক্ষেপনে ইউপি চেয়ারম্যান বলছেন, চক্রান্ত লুকিয়ে আছে
*তনুর পর ফের ধর্ষণকাণ্ডে আলোচিত কুমিল্লা

রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয় এতোটাই শক্তিশালী যে- রাস্তা দিয়ে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফেরাটাও আজ অনিরাপদ! এমপি নন, উপজেলা চেয়ারম্যান-ইউপি চেয়ারম্যানও নন, তিনি সামান্য ইউপি সদস্য নামক- জনপ্রতিনিধি! যার ক্ষমতার বলয় এতোটাই প্রশস্ত যিনি রাস্তা আটকিয়ে সস্ত্রীক স্বামীকে প্রশ্ন করেন- এ নারীর সঙ্গে কিসের সম্পর্ক। সে প্রমাণও দিতে হবে তাকে, সঙ্গে বিশ হাজার টাকাও।

দেশের কোন আইনে জনপ্রতিনিধি নামক রাস্তার এ সন্ত্রাস স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি গণধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটাতে পারেন এমন প্রশ্নে তনু হত্যার পর নতুন করে আবার আলোচিত হচ্ছে কুমিল্লা।

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ভানী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের সূর্যপুর গ্রামের মৃত মো. সামসুল হকের ছেলে নবীরুল ইসলাম নবী জনপ্রতিনিধিত্বের পরিচয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সস্ত্রীক স্বামীর কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে স্ত্রীকে আটকে রেখে স্বামীকে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য করেন। স্বামীকে হুমকি-ধমকি দিয়ে বাড়ির পথে পাঠিয়ে লম্পট মেম্বার ২০ বছর বয়সী ওই তরুণী ৭-৮ জনের সমন্বয়ে গড়ে তোলা ধর্ষক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গৃহবধূকে ভয়ঙ্কর সিনেমা স্টাইলে গণধর্ষণ করেন।

তবে সবার আগে মেম্বার নবী ওই তরুনীকে দুইবার ধর্ষণ করে সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিয়ে স্থান ত্যাগ করলেও সিন্ডিকেটের কেউই বিরত থাকেনি ধর্ষণ থেকে। বরং পালাক্রমে ধর্ষণ করে তরুনীর হাতে কনডম ধরিয়ে দিয়ে ভিডিও ফুটেজও ধারণ করে। যাতে প্রতিবাদ করতে গেলেই ভিডিওটির মাধ্যমে তরুণীকে হুমকি দিয়ে প্রতিবাদ থেকে বিরত রাখতে পারে। সে সময় ধর্ষকদের একজন এমনই কথা বলতে শুনেছেন ওই তরুণী।

তবে এতোসব ঘটনার মধ্যেও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান রয়েছেন লম্পট মেম্বারকে নির্দোষ প্রমাণ করার তালে। কেন ওই তরুণী ঘটনার ৪ মাস পর অভিযোগ করেছেন তাতে রয়েছে তার সন্দেহ। কালক্ষেপণ করায় তিনি বলছেন, এতে চক্রান্ত লুকিয়ে রয়েছে। এটাই কি বর্তমান রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব! ঘটনার বৃত্তান্ত জানার আগেই ধর্ষিতাকে উত্তীর্ণ হতে হয় প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকায়।

এদিকে, চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর স্থানীয়রা বলছেন, ওই তরুণীর বিচার প্রাপ্তিতে নিশ্চিতভাবে বাগড়া বসবে। ক্ষমতার প্রভাবে শেষ পর্যন্ত কিছুই হবে না।

দেবিদ্ধার থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার দুপুরে ওই তরুণীরর করা মামলার সূত্র ধরে লম্পট ইউপি সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। মামলার পরপরই অভিযুক্ত ইউপি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে দেবিদ্বার থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জহিরুল আনোয়ার জানান, ইউপি সদস্য নবীরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ভুক্তভোগী তরুণীর মেডিকেল রিপোর্টের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সত্যতা পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।

মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ জানুয়ারি দুপুরে স্বামীকে নিয়ে ভানী ইউনিয়নের সূর্যপুরের রাস্তা দিয়ে স্বামীর বাড়ি মুরাদনগর উপজেলার প্রান্তি গ্রামে যাচ্ছিলেন ওই তরুণী। পথে ইউপি সদস্য নবীরুল ইসলামের নেতৃত্বে শামিম, আকাশ, পাখিসহ অজ্ঞাত আরও ৮-৯ জন তাদের গতিরোধ করে। সেই সঙ্গে তরুণীর স্বামীর পরিচয় জানতে চায় তারা। তারা দুইজন নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলে ইউপি সদস্য নবীরুল তাদের বিয়ের কাবিননামা দেখতে চায়। পরে তরুণীর স্বামী বিয়ের কাগজপত্র দেখালে ইউপি সদস্য কাগজপত্র ভুয়া আখ্যায়িত করে বলে এসব কাগজপত্রে হবে না।

পরে ক্ষিপ্ত হয়ে নবীরুলের সঙ্গে থাকা আকাশ নামে এক যুবক ওই তরুণী ও তার স্বামীকে বেধড়ক মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে ইউপি সদস্য নবীরুল ইসলাম ২০ হাজার টাকা দিলে তা সমাধান করে দেবে বলে প্রস্তাব করে। পরে ওই তরুণীর স্বামী টাকার ব্যবস্থা করার জন্য স্ত্রীকে ইউপি সদস্য নবীরুলের হেফাজতে রেখে চলে যান।

ওইদিন সন্ধ্যায় টাকা নিয়ে আসেন তরুণীর স্বামী। ২০ হাজার টাকা নেয়ার পর স্ত্রীকে রেখে স্বামীকে নিজের বাড়ি প্রান্তি গ্রামে চলে যেতে বলেন ওই ইউপি সদস্য। তার হেফাজতে রেখে ওই তরুণীর বাড়ি কুমিল্লার ছোটরায় এলাকায় পৌঁছে দেবে বলেও জানায় ইউপি সদস্য। পরে স্বামী প্রাণভয়ে তার নিজের বাড়ি চলে গেলে ইউপি সদস্য নবীরুল ইসলাম শামিম, পাখি, আকাশসহ আরও কিছু অজ্ঞাত যুবকের হাতে ওই তরুণীকে তুলে দেয়। তারা তরুণীকে ওই রাতেই বাড়ি পৌঁছে দেয়ার কথা বলে ভানী ইউনিয়নের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অজ্ঞাত একটি জঙ্গলে নিয়ে যায়।

পরে ইউপি সদস্য নবীরুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে কথা বলে আকাশ। ফোনে তরুণীসহ তাদের অবস্থানের জায়গার নাম জানানো হয় ইউপি সদস্য নবীরুলকে। পরে ইউপি সদস্য নবীরুল জঙ্গলে এসে ওই তরুণীকে দুইবার ধর্ষণ করে। ধর্ষণ শেষে ইউপি সদস্য নবীরুল ভুক্তভোগী তরুণীকে পাখি, আকাশ ও শামীমদের হাতে তুলে দিয়ে বাড়ি চলে যায়। পরে ৭/৮ জন যুবক ওই তরুণীকে পুনরায় পালাক্রমে গণধর্ষণ করে। পালাক্রমে ধর্ষণ শেষে ওই তরুণীকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এক পাশে ফেলে পালিয়ে যায়।

ভুক্তভোগী ওই তরুণী বলেন, মেম্বারসহ মোট ৯ জন ধর্ষণে জড়িত। আমি তাদের মুখে একে অপরকে ডাকার নাম শুনে ২/৩ জনের নাম জানতে পেরেছি। বাকিদের নাম বলতে পারবো না। আমি চিৎকার করার চেষ্টা করলেও করতে পারেনি। তারা আমার হাত-মুখ চেপে ধরে রেখেছে। এর আগে আমার স্বামীর অনুপস্থিতেতে আমার হাতে কনডম দিয়ে আমাকে খারাপ মেয়ে বলে চালিয়ে দেয়ার জন্য মোবাইলে ভিডিও করা হয়।

এ ব্যাপারে ভানী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. নুরুজ্জামান মুকুল বলেন, এ ঘটনার প্রায় ৪ মাস পর জানতে পারলাম। নিশ্চয়ই এখানে কোনো চক্রান্ত লুকিয়ে আছে। ওই তরুণী এতদিন কেন কালক্ষেপণ করলেন? সত্যিকারে যদি এ কাজে জড়িতের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত