শিরোনাম

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তিতে বিশাল ফারাক

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম  |  ০০:৫৮, এপ্রিল ২১, ২০১৯

একটানা ক্ষমতায় ১০ বছর পার করে ১১ বছর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। তাদের বিগত ১০ বছরের শাসনামলে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলাচ্ছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ। হিসাবের খাতায় প্রাপ্তির ঘরে খুব বেশি কিছু জমা পড়েনি বলে মনে করছেন এলাকার মানুষ। বিগত ১০ বছরে রংপুর নগরীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নতকরাকেই এখন পর্যন্ত মহাজোট সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন এখানকার মানুষ। কিন্তু পুরো উত্তরাঞ্চলে প্রশ্নে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের দেখা পাননি তারা। সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরো পিছিয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চল। জাতীয় নির্বাচনে এ অঞ্চলের ৩৩টি আসনে মহোজোটসহ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌর এবং উপজেলা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে ব্যাপক সমর্থন দেয়ার পরও বরাবরের মতোই বঞ্চনা আর অবহেলার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে তাদের। যুদ্ধবিধ্বস্ত ’৭১-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকাই দায়, ঠিক তখন থেকেই সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ প্রশ্নে ঠকতে শুরু করে রংপুর। দেশের সর্বাধিক সংখ্যক দরিদ্র মানুষের আবাসস্থল হওয়া সত্ত্বেও এখানে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কম বরাদ্দ দেয় বিভিন্ন সময়ের সরকার। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষ গ্যাসের দাবিতে আন্দোলন করলেও সরকারের পক্ষে থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি। পিছিয়ে পড়া মানুষদের ভাগ্য বদলেরও কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। বিগত বছর ও বর্তমান সময়ে এ অঞ্চলে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তারাও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি।বাংলাদেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ জাতীয় পর্যায়ে; দারিদ্র্য হার যেখানে উচ্চদারিদ্র্য রেখা অনুসারে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, সেখানে সব বিভাগের মধ্যে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি- ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ। যা ২০১০ অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলে ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ। দেশের জাতীয় দারিদ্র্য হার যেখানে কমছে, সেখানে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক বিষয় এবং পরিসংখ্যান চমকে দেয়ার মতো। জেলাভিত্তিক দারিদ্র্য পরিসংখ্যান আরো ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। দিন যায়, মাস যায়, যায় বছর। বদলায় সব কিছু। শুধু বদলায়নি রংপুরের মানুষের জীবন-বৈচিত্র্য। অভাব-অনটন আর অনিশ্চয়তা নিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটছে গাইবান্ধার চরাঞ্চলের মানুষের। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত। স্বাধীনতার পর থেকে সরকারের পালাবদল হলেও উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলায়নি। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার চরাঞ্চলের আধুনিক এ যুগের উন্নয়নের ছোঁয়া এখনো লাগেনি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এ গ্রামগুলোতে এখনো কোনো যানবাহন যেতে পারে না। নৌকা ও হেঁটেই তাদের চলাচল করতে হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষার পরিবেশ নেই। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে সুফল, তা উত্তরাঞ্চলের জনগণ খুব বেশি পায়নি। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির সমবণ্টন হয়নি। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি, নাগরিকদের ক্ষমতায়ন শীর্ষক সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১৬-২০) ‘অধিগ্রহণ অঞ্চল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার’ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে, বাংলাদেশের যে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন হয়েছে, তা বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ হয়নি। ফলে দুটো ভিন্ন ধরনের অঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে পশ্চাৎপদ অঞ্চল এবং অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধশালী অঞ্চল। এ অঞ্চলগুলোকে বঞ্চিত এলাকা এবং অবঞ্চিত এলাকা হিসেবেও দেখানো হয়েছে। ২০১১ সালের ৮ জানুয়ারি ও ২০১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রংপুরে জনসভা করেন।সেখানেও রংপুর বিভাগবাসীকে হতাশ করেন। তিনি রংপুরের উন্নয়নের সব দাবির ব্যাপারেই শুধু বলেছেন, পরিকল্পনায় আছে। উদ্যোগ নেয়া হবে। আর বলেছেন, আগে উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা নামে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে সেটি নেই। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় মো. মোরশেদ হোসেন বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা কর্মসংস্থানের অভাব। কৃষি ছাড়া দৃশ্যমান কোনো খাত সৃষ্টি হয়নি, যেখানে মানুষ কাজ করে আয় করতে পারে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিতে জড়িত বেশির ভাগ মানুষ। ফলে ছদ্মবেশি বেকারত্ব অনেক বেশি, অর্থাৎ এদের কৃষিতে প্রান্তিক উৎপাদন শূন্য। বড় বা মাঝারি শিল্প এ অঞ্চলে নেই বললে চলে। উত্তরাঞ্চলে কৃষিতে মজুরি বেড়েছে সত্য। কিন্তু সেই সঙ্গে অনেক বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। নিত্যদিন পরিশ্রম করে যে আয়, তাতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে পারে না পরিবারগুলো। বেশি পরিশ্রম, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, পুষ্টির অভাবে অল্প সময়ে হারায় কর্মক্ষমতা। শুধু কায়িক পরিশ্রম করে স্বল্প মজুরিতে দারিদ্র্যের বৃত্ত ভাঙা সম্ভব কি না, তা ভাবার বিষয়। উত্তরাঞ্চলের মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু পরিবেশ বিপর্যয়। বিশেষ করে বন্যা, নদীভাঙন প্রতি বছরই এ অঞ্চলের মানুষকে করছে দরিদ্র। ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনা মানুষকে করে বাস্তুহারা। পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হয়েও কেউ পায় না ক্লাইমেট চেঞ্জ ফান্ডের ক্ষতিপূরণ কিংবা কোনো সরকারি সহায়তা। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। অপ্রতুল আর্থিক কিংবা খাদ্য সহায়তা তাদের সপ্তাহ বা মাসের খাদ্য জোগান দিলেও দারিদ্র্য দূরীকরণ অসম্ভব। আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ড এতে সম্ভব নয়। ফলে স্থায়ীভাবে দারিদ্র্যের একটি সিলমোহর তাদের গায়ে লেগে যায়। এ থেকে উত্তরণ প্রচেষ্টা দেখা যায় না। নারায়ণগঞ্জ জেলায় দারিদ্র্যের হার মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এখানকার বৈশিষ্ট্য হলো- এটি শিল্প এলাকা। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় বিড়ি, চালকল ইত্যাদি ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো শিল্পায়ন হয়নি। রংপুর অঞ্চলে শিল্পায়নে বাধার অন্যতম কারণ হলো জ্বালানি সমস্যা। পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ না থাকা। উত্তরাঞ্চলে অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির জন্য মূল প্রয়োজন অবকাঠামোগত উন্নয়ন। এর জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানের সঙ্গে রংপুুর অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। যোগাযোগ ও যাতায়াতের সময় কমিয়ে আনতে হবে। জ্বালানি সমস্যা দূরীকরণে এখানে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। গ্যাস সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত ফার্নেস অয়েল ও বিদ্যুতে ভর্তুকি প্রদান প্রয়োজন। রংপুর অঞ্চলে প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত স্থাপন করতে হবে। রংপুর বিভাগে আইটি পার্ক স্থাপন করতে হবে। আইটি পার্ক, আইসিটি সহায়তা, ইনকিউবেশন সেন্টার হলে শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। রংপুর অঞ্চলের শিল্পের বিকাশে শিল্প স্থাপন-সংক্রান্ত ব্যাংকঋণ সহজসাধ্য করতে হবে। একাদশ সংসদে এবার নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় রংপুরের পাঁচজন মন্ত্রিত্ব পাওয়ায় এলাকার মানুষ আনন্দিত। কিন্তু তারা এলাকার উন্নয়নে দৃশমান কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে স্থানীয়রা মনে করছেন না। কারণ, দশম সংসদ নির্বাচনে উত্তরাঞ্চলের যারা মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন; তারা এলাকার উন্নয়নে এগিয়ে আসেননি। ১৯৭১ সালের পর থেকে উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে যমুনা সেতু, যা বর্তমানে বঙ্গবন্ধু সেতু নামে পরিচিত। এই সেতু ও বেড়িবাঁধ ছাড়া গত ৪৮ বছরে উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি। বর্তমানে সেই বেড়িবাঁধের অবস্থা বেহাল। প্রতিদিন মহাসড়কে দুর্ঘটনায় ঘটছে। জীবিকার টানে এ মহাসড়ক দিয়ে সাধারণ মানুষ ঢাকায় আসতে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অকালে জীবন হারাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের গত দুই টার্মে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন বঞ্চিত হওয়ার ব্যাপারে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের (রসিক) মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা বলেছেন, ক্ষমতাসীনরা রংপুরকে নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করেনি। দলীয় সঙ্কীর্ণতার কারণে রংপুরবাসী উন্নয়নবঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমান সরকার রংপুরে বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করলেও সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি। বরং কমেছে। এ অঞ্চলে রাস্তাঘাট নেই, যোগাযোগ ব্যবস্থাও খারাপ।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত