শিরোনাম

জনপ্রিয় হয়ে উঠছে রোলার স্কেটিং

তরুণদের মাঝে দারুণ সম্ভাবনা
প্রিন্ট সংস্করণ॥আনোয়ার হোসেন  |  ০০:৫৫, এপ্রিল ২১, ২০১৯

তরুণদের কাছে রোলার স্কেটিং খেলা এখন বেশ জনপ্রিয়ই হয়ে উঠছে। এ খেলাটি ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকলেও কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে খুব একটা পরিচিত ছিল না। দেশের প্রায় সবকটি জেলায়ই এখন দিনে দিনে এ খেলাটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। শুধু ছেলেরাই নয়, মেয়েরাও ঝুঁকে পড়ছে এ খেলাটির দিকে। খেলাটি ব্যয়বহুল আর ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ঘরের বারান্দায়, উঠোন কিন্বা রাস্তায় এখন প্রায় প্রতিদিনই চোখে পড়ে ‘চাকাওয়ালা জুতো’ পরে শিশু-কিশোররা অনুশীলন করছে স্কেটিং খেলায়। ভাবতেও ভয়ে গা শিরশির করে- ইদানীং রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে কার-বাস-ট্রাকের সাথে পাল্লা দিয়ে স্কেটিং করছে নির্ভয়ে যুব-কিশোররা। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম-সংলগ্ন পল্টন ময়দানের পশ্চিম পাশে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেন ‘শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স’। আর সে বছরই নবনির্মিত এ কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয় দেশে প্রথমবারের মতো ৪০টিরও বেশি দেশের অংশগ্রহণে রোলার স্কেটিং বিশ্বকাপ। আর সেই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থান জয় করে দেশবাসীর বাহবা কুড়ায়। আর সেই বিশ্ব প্রতিযোগিতায় সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়ে চমক দেখায় বাংলাদেশের কিশোর স্ক্যাকার হূদয় হোসেন। দেশের মাটিতে এতো বড় একটি বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজন করে দেশবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে রোলার স্কেটিং ফেডারেশন। রোলার স্কেটিং স্টেডিয়াম গড়ে উঠায় তরুণ প্রজন্মের মাঝে দারুণ উৎসাহ ও এ খেলাটির প্রতি আগ্রহ বাড়ে। প্রতিদিন এ ইনডোর স্টেডিয়ামে গড়ে ৫০-৬০ জন খেলোয়াড় অনুশীলন করেছে। তরুণ প্রজন্মের এ ধরনের আগ্রহ দেখে রোলার স্কেটিং ফেডারেশন দেশে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভালো ফলাফলে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। রোলার স্কেটিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আসিফুল হাসান দৈনিক আমার সংবাদকে জানান, আমরা ইতোমধ্যেই রোট লেবেলে মানসম্পন্ন খেলোয়াড় তৈরি করতে সাবরা দেশব্যাপী নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। আগামী ২০২০ টোকিও অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশ যেন সম্মানজনক ফলাফল করতে পারে এর জন্য আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। তিনি বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকী সামনে রেখে দেশে একটা বড় ধরনের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের চিন্তাভাবনা করছি। হেড কোচ আশরাফুল আলম মাসুম ও প্রধান সমন্বয়কারী মো. সহিদুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতি বিভাগের জেলায় জেলায় চলছে খেলোয়াড় বাছাই ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। আমাদের লক্ষ্য সারা দেশ থেকে ১২শ খেলোয়াড় বাছাই করে তাদের জাতীয় পর্যায়ে আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। আমাদের টার্গেট চলতি বছরের নভেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে যেন আমরা এখান থেকেই ভালোমানের খেলোয়াড় সংগ্রহ করতে পারি। এদিকে, বাংলাদেশ রোলার স্কেটিং ফেডারেশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন গ্রুপের আর্থিক সহযোগিতায় ময়মনসিংহের ভালুকায় ১০ একর জমির ওপর নির্মাণ হবে আন্তর্জাতিক মানের ওরিয়ন ইন্টান্যাশনাল রোলার স্পোর্টস স্টেডিয়াম। গত ২০ জানুয়ারি ২০১৮ ভালুকায় এক জাঁকজমক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে নবর্নিমিত স্টেডিয়ামটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক এসডিজিএস ও বাংলাদেশ রোলার স্কেটিং ফেডারেশনের সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, ক্রীড়া পরিষদ সচিব মো. মাসুদ করিম, ওরিয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবায়দুল করিম ও বাংলাদেশ রোলার স্কেটিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আসিফুল হাসান প্রমুখ। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বলেছিলেন, এটি আমাদের জন্য একটি খুশির খবর যে, ফেডারেশন পেল একটি মাল্টিপারপাস রোলার স্কেটিং স্টেডিয়াম। পাশাপাশি তিনি রোলার স্কেটিংয়ের উন্নয়ন ও স্টেডিয়াম নির্মাণ করে দেয়ার জন্য ওরিয়ন গ্রুপকে ধন্যবাদ জানান। সেদিন ওই অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে ওরিয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবায়েদ করিম বলেন, আমরা রোলার স্কেটিং ফেডারেশনের খেলাধুলার উন্নয়নের জন্য অনেক পরিকল্পনা হতে নিয়েছি। আগামী ২০২০ সালে টোকিওতে অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের লক্ষ্য ওই আসরে পদক জয় করা। আর সে টার্গেট নিয়েই আমরা ভালুকায় আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণ করে এখানে খেলোয়াড়দের অনুশীলন ও আবাসনের ব্যবস্থা করা। নবনির্মিত স্টেডিয়ামে থাকবে ১০০ জন খেলোয়াড়ের আবাসনের ব্যবস্থা, ২০০ মিটার ব্যাংকড ট্র্যাক, রোল বল গ্রাউন্ড, রোলার হকি এবং ৩৫০ মিটার রোড ট্র্যাক মিটার রোড। এ খবরটি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য একটি সুখবর। গত সেপ্টেম্বর মাসে স্টেডিয়ামটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জাতীয় নির্বাচনসহ অন্যান্য কি সমস্যার জন্য দেরিতে কাজ শুরু হয়েছে। এ খেলাটির মধ্য দিয়েই অনেকে নিজেকে স্বাবলম্বী আর পরিচিত করে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সফলতাও পেয়েছেন অনেকে। অনেক খেলোয়াড় দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে গিয়েও জয়ের মুকুট পরেছেন। দেশের বিভিন্ন জেলায় এ খেলাটির জন্য কোনো মাঠ না থাকায় খেলোয়াড়রা সড়কে বা কোনো ভবনের বারান্দায় এর অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন। অবিলম্বে একটি মাঠের দাবি রোলার স্কেটিং খেলোয়াড়দের। খেলাটির অনুশীলনের জন্য খেলোয়াড়দের জন্য নেই কোনো মাঠ বা ক্রীড়া সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতা। খেলোয়াড়রা নিজ উদ্যোগে আর নিজস্ব অর্থ ব্যয়ে এ খেলার সরঞ্জাম কিনে চর্চা চালিয়ে আসছে। তাছাড়া বেশির ভাগ খেলোয়াড় শিক্ষার্থী হওয়ায় আহত হওয়ার ভয়ে আগ্রহ থাকলেও অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের পাঠাতে চান না। স্কেটিংয়ের বিভিন্ন খেলার মধ্যে ফিগার স্কেটিং, হকি স্কেটিং, রোলবল স্কেটিং ও স্পিড স্কেটিং আমাদের দেশে অনেক জনপ্রিয়। এ প্রসঙ্গে লেজার স্কেটিং। যানজটের রাস্তায় আটকেপড়া গাড়িকে পাশ কাটিয়ে সাঁই করে ছুটে যাওয়া তরুণ স্কেটম্যানকে সুপারম্যান না ভাবলেও অনেকেই চোখ বড় বড় করে তাকায়। চাকাযুক্ত বিশেষ জুতা পরে গতিময় ছুটে চলাই হলো স্কেটিং। এখন অনেক তরুণই মজেছে এই স্কেটিংয়ে। সবমিলিয়ে তারুণ্যের ছুটে চলায় অন্যরকম গতি দেয়া স্কেটিং নিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মের পাশাপাশি অভিভাবকরাও বেশ আগ্রহী হয়ে উঠছে এ আকর্ষণীয় খেলাটির প্রতি। এদিকে, শুরুর দিকে প্রয়োজনের চেয়ে রোলার স্কেটিংকে শৌখিনতার অংশ হিসেবে ভাবা হতো। কিন্তু বর্তমানে সর্বস্তরের তরুণ-তরুণীরা এখন প্রবলভাবেই ঝুঁকছে রোলার স্কেটিংয়ে। শুধু খেলা বা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া নয়, স্কেটিং ফিটনেসের জন্যও বেশ উপকারী। এতে শরীরের জড়তা কাটিয়ে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার চর্চা হয়। আমি মনে করি, এখন আর তারুণ্য শুধু ঘরে বা বাসার পাশের রাস্তায় শখের বসে স্কেটিং করে না। এখন অনেকেই এটাকে দৈনন্দিন জীবনের বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রতিবছর স্কুলভিত্তিক স্কেটিং প্রতিযোগিতা, জাতীয় প্রতিযোগিতা, আন্তঃক্লাব স্কেটিংসহ নানা ধরনের প্রতিযোগিতা হচ্ছে। গত চলতি মাসের শুরুতে পল্টনস্থ শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো জাতীয় রোলার স্কেটিং প্রতিযোগিতা।সম্প্রতি নিয়মিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ স্কেটিং দল। স্কেটিংয়ের বিভিন্ন খেলার মধ্যে ফিগার স্কেটিং, হকি স্কেটিং, রোলবল স্কেটিং ও স্পিড স্কেটিং আমাদের দেশে অনেক জনপ্রিয়। গত দুই বছরে এর উন্নতি বহুলাংশেই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এত বছরেও হয়নি। ক্রিকেট-ফুটবল-হকির মতো রোলার স্কেটিংয়েও চমক জাগানো বা রোমাঞ্চ সৃষ্টি করাটা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। অবহেলায় পরিণত হওয়া এই ফেডারেশনটি ক্রমেই উজ্জীবিত হয়ে উঠছে। ঢাকাসহ প্রত্যেক বিভাগীয় শহরগুলোতে এর ইতিবাচক প্রভাবটাও লক্ষণীয়। স্কেটিং শিখতে প্রয়োজন স্কেটিং জুতা, সেভ গার্ড, হাতের কনুই ও পায়ের হাঁটুর জন্য বিশেষ সেফটি গার্ড, হেলমেট, হাতের গ্লাভস, জার্সি ও শর্টস। স্কেটিং শিখতে বিভিন্ন ক্লাবে ৬০০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন ক্লাবে শেখা যাবে স্কেটিং। পাঁচ বছর বয়স থেকে স্কেটিং শুরু করা উত্তম। রাজধানীতে স্কেটিং শেখার প্রতিষ্ঠান- উত্তরা ফ্রেন্ডস ক্লাব, লেজার স্কেটিং ক্লাব আবাহনী মাঠ ধানমন্ডি, ধানমন্ডি লেকের পাশে, কানাডিয়ান স্কুল মাঠে, গুলশান ইয়ুথ ক্লাব, উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের রয়েল ক্লাব।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত