শিরোনাম

রমজানকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট ঠেকাতে মাঠে প্রশাসন

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ  |  ০০:৪০, এপ্রিল ২১, ২০১৯

রমজান এলেই নিত্যপণের দাম বাড়ে। এটা আমাদের দেশের একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে। সে রীতি ভেঙে দিতে এবার প্রস্তুত প্রশাসন। রমজান সামনে রেখে ইতোমধ্যেই মাঠে সিন্ডিকেট পক্ষ সক্রিয়। তাদের ঠেকাতে উল্টো দিকে প্রশাসনও প্রস্তুত। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মৌলভীবাজারে রমজান সামনে রেখে ছোলা, চিনি, ডালসহ রমজানে যে সমস্ত পণ্য বেশি চলে সেগুলো তারা আগে থেকেই গোডাউনে সংরক্ষণ করেছে। প্রতি বছরের মতো বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অধিক মুনাফা লাভের আশায় মাঠে তারা সক্রিয়। তাদের কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় ইতোধ্যেই চিনির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, বাজারে চিনির কোনো ক্রাইসিস নেই। যারা চিনি কিনে গোডাউনে সংরক্ষণ করেছে তারাই এখন দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। বাজারে যে পরিমাণ চিনি প্রয়োজন এর চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে। সুতরাং দাম বৃদ্ধি এটা সিন্ডিকেটের কাজ। অন্যদিকে পর্যাপ্ত মজুদ ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বাজার তদারকি করায় ভোজ্যতেল, ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুরের দাম এখনো স্বাভাবিক আছে। প্রধানমন্ত্রী নিত্যপণ্যের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানানোর পরও ওই সিন্ডিকেট শবে বরাতের আগেই চিনির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। খবর নিয়ে জানা যায়, বাজারে যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে তার তিনগুণ মজুদ রয়েছে। গতকাল পাইকারি পর্যায়ে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনি ৭০-৮০ টাকা বেড়ে বিক্রি হয় ২৪৮০-২৪৯০ টাকা। আর খুচরা পর্যায়ে বস্তা ১০০ টাকা বেশিতে বিক্রি হয়। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আসন্ন রমজান নিয়ে প্রস্তুতির বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেন, বাজার দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিসিবির মাধ্যমে শিগগির ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুর বিক্রি করা শুরু হবে। আমাদের ধারণা রমজানে পণ্যের দাম তেমন বাড়বে না। কারণ মজুদসহ সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের আছে। আমাদের কাছে যা রিপোর্ট আছে তাতে প্রয়োজনের তুলনায় নিত্যপণ্যের মজুদ অনেক বেশি। তবে চিনিতে হয়তো এক-দুই টাকা বাড়তে পারে। কারণ চিনির উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশের চিনির মোকাম থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে তদারকি করবে তারা। দাম বাড়ানোর পেছনে কোনো ধরনের অনৈতিক কারণ থাকলে দোষীদের চিহ্নিত করে ভোক্তা আইনে শাস্তির আওতায় আনা হবে। এবার রমজানে পণ্যের দাম বাড়াতে দেয়া হবে না বলেও জানান তারা। ‘অসাধুরাও যাতে কোনো পন্থা অবলম্বন করে দাম বাড়াতে না পারে সেদিকে তারা সর্বদা নজর রাখছে।’ রাজধানীর সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা ও কারওয়ান বাজারের চিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বস্তা চিনি বিক্রি হয়েছে ২৪৮০-২৪৯০ টাকা। যা গত সপ্তাহেও বিক্রি হয় ২৪১০-২৪২০ টাকা। অন্যদিকে রাজধানীর বেশ কয়েকটি খুচরা বাজার ও এলাকার মুদি দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুচরা প্রতি বস্তা চিনি বিক্রি হয় ২৬০০ টাকায়। যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ২৫০০ টাকা। আর কেজিপ্রতি চিনি বিক্রি হয়েছে ৫২-৫৪ টাকা। যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা কেজি। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন সূত্রে জানা যায়, দেশে বছরে ১৮ লাখ টন চিনির চাহিদা আছে। শুধু রমজান মাসেই চাহিদা ৩ লাখ টন। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন সূত্র বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে চিনির মোট উৎপাদন ছিল ৬৮ হাজার ৫৬২ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ৬২ হাজার ৮৮৯ টন চিনি উৎপাদন করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চিনি মোট আমদানি করা হয় ২২ লাখ ২১ হাজার টন। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৯ মার্চ পর্যন্ত দেশে চিনি আমদানি করা হয় ১০ লাখ ৭৩ হাজার টন। একই সময় এলসি খোলা হয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার টন। ফলে এ মুহূর্তে চাহিদার তিনগুণ বেশি চিনি মজুদ রয়েছে। মৌলভীবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা শফিকুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ীরা রমজানের আগেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন, যাতে রমজানে দাম না বাড়ালেও চলে। কারণ তারা জানেন, রমজানে দাম না বাড়ানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চাপ থাকবে। অন্যদিকে ক্রেতারা এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দিকেও আঙ্গুল তুলেছেন, তারা বলছেন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগেই সব বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখন আর মনিটরিং করে কি লাভ। যা বাড়ার বেড়ে গেছে। প্রতি বছরই তারা লোক দেখানো একটি বৈঠক করে। যা আসলে কাজের কাজ কিছুই হয় না। রমজানে মূলত কয়েকটা কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। এর একটি হলো চাহিদার তুলনায় পণ্য সরবরাহ কম। তবে কৃত্রিমভাবে ঘাটতি দেখিয়ে অনেক সময় দাম বাড়ানো হয়। তাই সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সংকট তৈরি করতে না পারেন। এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিজুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, রমজান উপলক্ষে পণ্যের দাম ঠিক রাখতে আমাদের যা করণীয় তাই করা হবে। কেউ যদি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়ায় তা মানা হবে না। আমাদের মনিটরিং টিম তদন্ত করে দেখবে। যদি তারা দাম বাড়িয়ে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পণ্যের দাম বৃদ্ধি আমাদের কাম্য না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পণ্য আনা-নেয়ার পথে যেন চাঁদাবাজি না হয় সে বিষয়টি শক্ত হাতে দমন করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগে আজ থেকে চিঠি দেয়া শুরু হবে। যাতে পথে চাঁদাবাজি না হয়। চাঁদাবাজি হয়তো শতভাগ বন্ধ করা যাবে না। তবে এ বিষয়টি শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত