শিরোনাম

বেতন ভাতায় মেয়াদ পার

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম  |  ০০:৩৭, এপ্রিল ২১, ২০১৯

২০১৬ সালে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। প্রকল্প পরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের নিয়োগও দিয়েছে বিপিডিবি। আড়াই বছর থেকে তারা বেতন-ভাতা নিয়ে আসছেন। গাড়িও কেনা হয়েছে। এসব করতেই প্রকল্পের পুরো মেয়াদ প্রায় শেষ। তারপরও মূল কাজ শুরুই হয়নি। বাস্তবে এক শতাংশও বাস্তবায়ন হয়নি। এটি যেনতেন কোনো প্রকল্প নয়- ‘খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল ডুয়েল ফুয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের বাস্তব চিত্র। তাই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এবার তিন বছর সময় চেয়েছে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। সঙ্গে ব্যয়ও বাড়িয়েছে ২০ শতাংশের বেশি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কনজুম্যার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, জনগণের করের টাকা অপচয় করার কোনো দরকার নেই। কারণ কোনো কাজ না করেই কেটে গেছে আড়াই বছর। এ মুহূর্তে গ্যাস সংযোগের কোনো সুযোগ নেই। তারপরও এ প্রকল্প সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এটা বাস্তব সম্মত হবে না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভোলা থেকে গ্যাস পাওয়ার পরে করলে ভালো। কিন্তু বর্তমানে সেই সুযোগ নেই। অনেক দেরি আছে। অপেক্ষার পালাও দীর্ঘ। তাই বেতন-ভাতা যা ব্যয় হয়েছে আর কোনো অর্থ এ ধরনের দুর্বল প্রজেক্টে ব্যয় করা ঠিক হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।সার্বিক ব্যাপারে জানতে বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব ডা. আহমদ কায়কাউসের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে বিদেশে থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে বিপিডিবির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সদস্য মো. আজহারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, একনেক সভায় অনুমোদনের আগেই দরপত্র আহবান করা হলেও ঋণদাতা সংস্থাসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটির কাজ দেরি হয়েছে। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। তাই যেভাবে হোক বাস্তবায়ন করা হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আড়াই বছরে এক শতাংশ কাজ না হলেও তিন বছরে শতভাগ কাজ করা সম্ভব হবে। তাই পরিকল্পনা কমিশনে সংশোধনের জন্য পাঠানো হয়েছে। একনেক সভায় অনুমোদন পেলেই পুরো দমে কাজ শুরু হবে জানান তিনি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, খুলনার আঞ্চলিক চাহিদা পূরণসহ জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যেই খুলনা খালিশপুরের ভৈরব নদীর তীরে বেশি করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয় বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। কারণ প্রায় ৬২ একর জমির উপরে ১৯৫৪ সাল থেকেই এখানে দুটি ইউনিট রয়েছে। কিন্তু তাতে খুলনাসহ আশপাশের এলাকায় দুটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এখানে ৬০ মেগাওয়াট এবং ১১০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। অপরদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালে সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার জন্য বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনেও বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। তাই সার্বিক দিক বিবেচনা করে আরও বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ২২ অক্টোবর ‘খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার। প্রকল্পের ওপর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পূর্ণ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়- এলাকায় পর্যাপ্ত তরল জ্বালানি, পানি ও গ্যাসের সরবরাহ পাওয়া যাবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নতুন এ প্ল্যান্ট থেকে তরল জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে ৩৩৫ দশমিক ৮০ মেগাওয়াট এবং গ্যাস ব্যবহার করে ৩৫৭ দশমিক ৪৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। প্রকল্পটিতে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয় তিন হাজার ২৫৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। প্রকল্প সাহায্য হিসেবে চীন সরকার অর্থাৎ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়নার ঋণ ধরা হয় ২ হাজার ১৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। বাকি প্রায় এক হাজার ২৪০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় ধরা হয়। প্রকল্পটি ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জুনে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দেন সরকার প্রধান ও একনেক চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সূত্র আরও জানায়, সরকার ২০২১ সালে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এরই অংশ বিশেষ এ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। প্রকল্পটি অনুমোদনের পর প্রকল্প পরিচালক-পিডি নিয়োগ দেয় বিপিডিবি। জ্যোতিময় হালদার এর পিডি। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে অর্থও ব্যয় করেছেন। অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীও আছেন। তাতে ডিসেম্বর পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আর্থিক ব্যয় শূন্য দশমিক শূন্য চার শতাংশ। তা এক শতাংশও না। এই অর্থ ব্যয় করা হলেও কিন্তু বাস্তবে এখনো মূল কাজ শুরু হয়নি। তাই এবার তিন বছর সময় চেয়ে অর্থাৎ ২০২২ সালের জুনে বাস্তবায়ন করার জন্য বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। তাতে ব্যয় ৬৫২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বেশি অর্থাৎ ৩ হাজার ৯০৬ কোটি ২২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চীনের ঋণ হচ্ছে ২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা ৭৬ লাখ টাকা। বাকি অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় করা হবে। প্রকল্পের প্রধান প্রধান অঙ্গ হচ্ছে- ২ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মেশিনারি ও ইকুইপমেন্ট কেনা হবে। ডিজাইন ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। প্রশিক্ষণের জন্য ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। আর পিডিসহ অন্য কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতাসহ ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি টাকারও বেশি। তাদের যাতায়াতের জন্য ১৪টি গাড়িও কেনা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এভাবে বিভিন্ন অঙ্গে ব্যয় ধরা হয়েছে। তা যাচাই-বাছাই করতে পরিকল্পনা কমিশনে ১৫ এপ্রিল প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি-পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কিছু ব্যাপারে আপত্তি করা হলে পিডিবি থেকে জানানো হয় ঋণ দাতা সংস্থা এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়নার সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুসারে ম্যানেজমেন্ট এবং কমিটমেন্ট ফি নিয়ে মতানৈক্য হওয়ায় তা নিরসন করতে অনেক সময় চলে গেছে। কিন্তু প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঠিকাদারকে গত ২৮ মার্চে অগ্রিম অর্থ দেয়া হয়েছে। তাই বর্তমানে কাজ করতে আর সমস্যা হবে না। এভাবে সভায় বিভিন্ন ব্যাপারে আপত্তি করা হলে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে তা সংশোধন করা হবে বলে জানানো হয়। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব-ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে খুব শিগগিরই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত