শিরোনাম

এরশাদ-রওশন সাপে-নেউলে

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম  |  ০০:৩১, এপ্রিল ২১, ২০১৯

সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও তার স্ত্রী সাবেক বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদের সাপে-নেউলে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অমীমাংসিত এ সম্পর্ক দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সময়ে সময়ে আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসে ওঠে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোড়ন তোলে।সর্বশেষ গত সপ্তাহের শুরু থেকেই আবার এরশাদ-রওশন সাপে-নেউলে সম্পর্ক জনসমক্ষে প্রকাশ পেতে শুরু করে। এরশাদের অবর্তমানে দলের নেতৃত্বের বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলছিল অনেক দিন ধরে। কিন্তু সম্প্রতি এ সময়ে জিএম কাদেরকে জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান ঘোষণা করায় বেশ চটেছেন রওশন অনুসারীরা। জাপাপ্রধানের এ বিরোধিতায় নিজ বলয় ভারী করে এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন তারা। মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন এরশাদের প্রতি। তারা চাচ্ছেন পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বেগম রওশন এরশাদকে পার্টির ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান করতে। ফলে জাপার অভ্যন্তরে চলছে এক প্রকার অস্থিরতা।তথ্য মতে, নানা নাটকীয়তার পর চলতি মাসের ৪ এপ্রিল সহোদর জিএম কাদেরকে পুনরায় পার্টির ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন এরশাদ। এতে রওশন এরশাদ, গত সরকারের দুই মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সাবেক মহাসচিবসহ অনুসায়ীরা ক্ষুব্ধ হন। জাপার দুই প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরের বিষয়টি পরিবর্তনের জন্য এরশাদের বাসভবনে গেলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর গুলশানে একাধিক বাসায় দফায় দফায় বৈঠক করে তারা প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করেন জিএম কাদেরের যোগ্যতা নিয়ে। রওশন এরশাদ অনুসারী এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, জিএম কাদের জাতীয় পার্টির জন্য কখনোই নিবেদিত নন। তার সঙ্গে নেতাকর্মীদের সম্পর্ক নেই। প্রেসিডিয়ামের অধিকাংশ সদস্যই তাকে নেতা মানেন না। তার নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি কখনোই গতিশীল হবে না। এদিকে হাল ছাড়ছেন না জিএম কাদের অনুসারী নেতাকর্মীরাও। এরশাদের বাসবভন প্রেসিডেন্ট পার্কে পাহারা অব্যাহত রেখেছেন, যাতে কাদেরবিরোধীরা এরশাদকে দিয়ে এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাতে না পারে।জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি বলেন, আমি বারবার বলেছি, এ পার্টিতে পল্লিবন্ধু এরশাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি ইতোমধ্যে জানিয়েছেন কে হবেন পার্টির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। যদিও এটা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনা আছে। কিন্তু পার্টির বৃহত্তর স্বার্থে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া হয়। পার্টির অপর এক প্রেসিডিয়াম সদস্য এটিইউ তাজ রহমান বলেন, প্রেসিডিয়াম থেকে শুরু করে পার্টির সকল পদ-পদবি আমরা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বাক্ষরে পেয়ে থাকি। পার্টিতে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। জিএম কাদেরের বিষয়েও তিনি যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা যদি আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে বাস্তবায়ন করি তাহলেই পার্টির জন্য মঙ্গল।
জাপা সূত্র মতে, এরশাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে উত্থান-পতনে সব সময় পাশে ছিলেন তার স্ত্রী বেগম রওশন। ১৯৫৬ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সেই থেকে দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনে তারা সুখে-দুঃখে একসঙ্গে। এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে রওশন ছিলেন ফার্স্ট লেডির মর্যাদায়। ওই সময় তিনি সমাজকল্যাণ ও নারী-শিশুর অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। ‘বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা সংস্থা’র প্রধান পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন। ২০০১ সালে হঠাৎ বিদিশাকে বিয়ের খবরে ফাটল ধরে এরশাদ-রওশনের দাম্পত্যজীবনে। ২০০৬ সালে এরশাদ বিদিশার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। মূলত ২০০১ সাল থেকেই এরশাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনে নানা নাটকীয়তা শুরু হয়। রাজনৈতিক মাঠে এরশাদ হাসির পাত্রে পরিণত হন। সকালে এক কথা তো বিকালে আরেক কথা বলে হাসির খোরাক হয়েছেন। বিদিশার সঙ্গে বিবাহের পর এরশাদের বারিধারার বাসা (প্রেসিডেন্ট পার্ক) মুখো হতেন না রওশন। দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে এরশাদ বাসায় অবরুদ্ধ থাকার সময় সেখানে যান তিনি। রওশন রাজনৈতিক প্রয়োজনেই সেসময় ওখানে গিয়েছিলেন বলে জানান একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এরশাদের জাপা। ওই নির্বাচন ইস্যুতে জাপায় এরশাদ ও রওশনকে কেন্দ্র করে দলে দুটি বলয় তৈরি হয়। এরপর থেকে জাতীয় পার্টি চলছে বলয় দুটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ওই নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে অবস্থান নেন রওশন ও তার অনুসারীরা। বিপক্ষে এরশাদ ও তার অনুসারীরা। এসময় দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রওশনের সঙ্গ না পেরে এরশাদ কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ওই নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন নিয়েও এরশাদ-রওশন দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। নির্বাচনের পর একসঙ্গে বিরোধী দল ও সরকারে থাকা-না থাকা নিয়ে উভয় গ্রুপের মধ্যে কোন্দল দেখা দেয়। একপর্যায়ে ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি রংপুরের এক কর্মী সম্মেলনে গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন এরশাদ। এসময় এরশাদের অবর্তমানে জিএম কাদের জাপার হাল ধরবেন নেতাকর্মীদের জানান তিনি। একইসঙ্গে জাপাকে নতুন করে সাজাতে আগামী জাতীয় সম্মেলনের জন্য জিএম কাদেরকে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক এবং রুহুল আমিন হাওলাদারকে সদস্য সচিব হিসেবে ঘোষণা দেন। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন রওশন ও তৎকালীন মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুপন্থিরা। এর পরদিন ১৯ জানুয়ারি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশনের বাসায় প্রেসিডিয়াম সদস্যের একাংশ বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে জিয়াউদ্দিন বাবলু রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, গঠনতন্ত্রে কো-চেয়ারম্যান বলে কোনো পদ নেই। এটা গঠনতন্ত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। পার্টির গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারা বলে কো-চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি (এরশাদ) কাউকে ঘোষণা দিতে পারেন না। তার এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আজকের (সোমবার) বৈঠকে উপস্থিত সব সদস্যের সম্মতিক্রমে রওশন এরশাদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এখন থেকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ চেয়ারম্যান ও জিএম কাদের কো-চেয়ারম্যান হিসেবে অবৈধ— জিয়াউদ্দিন বাবলুর এ ঘোষণার কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে ঐদিনই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, যারা অবৈধভাবে প্রেসিডিয়াম সদস্যের সভা ডেকেছে তারা দলে থাকবে না। আমি দলের চেয়ারম্যান, আমি ছাড়া প্রেসিডিয়াম সভা আহ্বান করার কারো অধিকার নেই। এটা গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে। আমি জীবিত থাকা অবস্থায় কেউ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হতে পারবে না। রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এরপর জিয়াউদ্দিন বাবলুর পরিবর্তে প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে ফের মহাসচিব ঘোষণা দেন এরশাদ। ঐ সময়ে সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু সম্পর্কে এরশাদ বলেন, ‘বাবলু সেলফিস। সে আমার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে আমার স্ত্রীর অসম্মতিতে তাকে পার্টির কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছে। এ জন্যই তাকে মহাসচিব থেকে বাদ দিয়েছি।’জাপা নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব ফের প্রকাশ্যে আসে গত বছরের শেষদিকে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্য মশিউর রহমান রাঙ্গাকে নতুন মহাসচিব নিয়োগ দেন এরশাদ। এরপর ১৭ জানুয়ারি রংপুরে জিএম কাদেরকে পার্টির কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন এরশাদ। এ ঘটনায় আবারো ক্ষুব্ধ হন রওশনপন্থিরা। একইসঙ্গে জিএম কাদেরকে সরিয়ে রওশনকে পার্টির কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করতে এরশাদকে চাপ প্রয়োগ করেন তারা। সে যাত্রায় সফলতাও আসে। পরবর্তী দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ২২ মার্চ কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে জিএম কাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে নিজ স্বাক্ষরিত এক সাংগঠনিক নির্দেশনা জারি করেন এরশাদ। এরপর রওশন শিবিরে স্বস্তি ফিরলেও তা বেশি দিন টেকেনি। অব্যাহতি দেওয়ার মাত্র ১২ দিনের মাথায় জিএম কাদেরকে আবার জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান পুনর্বহাল করেন জাপার চেয়ারম্যান এরশাদ। তার অবর্তমানে জিএম কাদের পার্টির সার্বিক দায়িত্ব পালন করবেন বলেও ঘোষণা দেন। এরপর আবারো সক্রিয় হয়ে ওঠেন জিএম কাদেরবিরোধীরা। সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য তারা এরশাদকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। গত ১৬ ডিসেম্বর পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলেন জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছে। জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে কোনো বিভেদ নেই। জাতীয় পার্টির আগামী নেতৃত্ব কাউন্সিলের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হবে। শিগগিরই আলোচনার মাধ্যমে কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পার্টির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের পার্টিতে রাজনৈতিক কোনো দ্বন্দ্ব নেই, আছে পারিবারিক কোন্দল। আর এ কোন্দলে পার্টির কয়েকজন সিনিয়র নেতা জড়িত থাকলেও তৃণমূল অথবা মধ্যম সারির কোনো নেতাকর্মী এ দ্বন্দ্বের মাঝে নেই। সিনিয়র নেতারাই সিদ্ধান্ত নিয়ে এইচএম এরশাদকে বিভ্রান্তিতে ফেলেন। জাতীয় পার্টির আরেক প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহিদুর রহমান টেপা বলেন, জাতীয় পার্টি মানেই পল্লিবন্ধু এরশাদ। তিনি দলের স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। সিঙ্গাপুর সফররত কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের মুঠোফোনে বলেন, জাতীয় পার্টি এক বড় দল ও সংসদের প্রধান বিরোধীদল। এখানে পদ-পদবির জন্য প্রতিযোগিতা থাকবে— এটাই স্বাভাবিক। পল্লিবন্ধু এরশাদ আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন আমি পার্টির সকল সিনিয়র নেতার পরামর্শে সবার সমন্বয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে চাই। সকলে একটেবিলে বসলে অনেক বিভেদ ও সমস্যার সমাধান হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত