শিরোনাম

সহজে মিলছে না ক্ষতিপূরণ

প্রিন্ট সংস্করণ॥নাজমুল আহসান রাজু  |  ০০:২০, এপ্রিল ২১, ২০১৯

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরও সহজে মিলছে না ক্ষতিপূরণের অর্থ। সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছেন কিন্তু ক্ষতিপূরণের অর্থ দ্রুত লাভের ঘটনা বিরল। আদালতের আদেশ রয়েছে তবুও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় হতাশ ভিকটিমের পরিবার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুবছরে ১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় উচ্চ আদালত ক্ষতিপূরণের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশসহ রুল জারি করেছেন। এরমধ্যে চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুসহ ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ১৫ জনের পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়নি।এরমধ্যে পৃথক সাতটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে আদালত দুর্ঘটনায় নিহত ১৫ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকার ও বাস মালিকদের নির্দেশ দিয়েছেন।ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির বড় নজির রেলওয়ের পরিত্যক্ত পাইপে পড়ে রাজধানীর শাহজাহানপুরে নিহত শিশু জিহাদের পরিবার। মানবাধিকার সংগঠন চিলড্রেনস চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের (সিসিবি ফাউন্ডেশন) করা রিটের প্রেক্ষিতে রেলওয়ে ও ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স শেষ পর্যন্ত ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। তবে এ টাকাও সহজে আদায় করা যায়নি। ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রায় দেন হাইকোর্ট। এ সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণ না দেয়ায় বিবাদিদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়েরের পর ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট তারা অর্থ পরিশোধ করেছে জিহাদের পরিবারকে। দুই বছর আইনি লড়াই চালাতে হয়েছে রিট আবেদনকারী ব্যারিস্টার মো. আবদুল হালিমকে।২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম ও আবদুল করিম রাজিব দ্রুতগামী জাবালে নূর পরিবাহনের চাপায় নিহত হলে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। পরে নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে জনস্বার্থে রিট আবেদন করা হলে আদালত ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেন। ক্ষতিপূরণের সেই অর্থ পেয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত দুই শিক্ষার্থীর পরিবার।একই বছরের ২৮ এপ্রিল রাজধানীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে গ্রিন লাইন পরিবহনের চাপায় পা হারান গাড়িচালক রাসেল সরকার। আদালত ক্ষতিগ্রস্ত রাসেলের পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নিদেশ দেন। আপিল বিভাগেও ওই রায় বহাল থাকে। কিন্তু গ্রিন লাইন পরিবহন টাকা দিতে গড়িমসি করতে থাকে। পরে আদালত হার্ডলাইনে গেলে গত ১০ এপ্রিল হাইকোর্টের এজলাস কক্ষে গ্রিন লাইনের মালিক মো. আলাউদ্দিন ৫ লাখ টাকার চেক তুলে দেন। বাকি ৪৫ টাকা পরিশোধে এক মাস সময় দেয়া হয়েছে গ্রিন লাইনকে।স্বজন পরিবহনের বাসচাপায় ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল ডান হাত হারান তিতুমীর কলেজের স্নাতকের ছাত্র রাজিব হোসেন। তার হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ১৭ এপ্রিল চিকিৎসাধীন রাজিব মারা যান। এ ঘটনায় জনস্বার্থে আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল রিট করলে নিহতের পরিবারকে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে স্বজন পরিবহন ও বিআরটিসিকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পরে বিআরটিসি আপিল করলে সেখানেও হাইকোর্টেন রায় বহাল থাকে। কিন্তু গত ছয় মাসেও ক্ষতিপূরণের অর্থ বুঝে পায়নি রাজিবের পরিবার।তিন বছর আগে ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দৈনিক সংবাদের সাবেক বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর স্ত্রী রওশন আখারকে ১ কোটি ৭১ লাখ ৪৭ হাজার ৮ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ। রায়ের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ক্ষতিপূরণের অর্থ পাননি রওশন আখার। ১৯৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর রাজধানীর শান্তিনগরের আনন্দ ভবনের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পানীয় বোঝাই একটি মিনিট্রাক মোজাম্মেল হোসেনকে ধাক্কা দিলে ১৩ দিন চিকিৎসীন থেকে মারা যান। ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি মামলা দায়ের করেন তার স্ত্রী রওশন আখতার। এরমধ্যে বিচারিক আদালত, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ হয়ে মামলা নিষ্পত্তিতে লেগে যায় ২৬ বছর।গত ১১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ শিশুসহ ৫ জনের প্রত্যেকের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দেন। ১৫ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের এ অর্থ পরিশোধ করতে স্বরাষ্ট্র সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু সচিব এবং বিআরটিএ চেয়ারম্যানের প্রতি এ নির্দেশ দেন আদালত। জনস্বার্থে চিলড্রেনস চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) পক্ষে রিট আবেদনটি করা হয়েছিল।গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার উত্তরায় ফাইজা তাহসিনা (১০), গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩ ফেব্রুয়ারি মিরাজ খান (৫), ২ ফেব্রুয়ারি বরিশালে লিজা আক্তার (৯), সিলেটের বালাগঞ্জে আহমেদ রিফাত (৬) ও চট্টগ্রাামের সীতাকুন্ডে নুসরাত চৌধুরী (২৩) সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। তাদের পরিবারকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ক্ষতিপূরণের এ অর্থ দিতে বলেন আদালত। একইসঙ্গে রুলও জারি করা হয়। যার এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।২০১৬ সালের ৩ ডিসেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তিন মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণের টাকা তারেক মাসুদের পরিবারকে দিতে রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স কোম্পানিকে ৮০ হাজার টাকা, বাসচালককে ৩০ লাখ এবং বাকি চার কোটি ৩০ লাখ ৯৫ হাজার ৪৫২ টাকা চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের তিন বাস মালিককে পরিশোধ করতে বলেন আদালত। রায়ে বলা হয়, আর এই টাকার ১০ লাখ পাবেন তারেক মাসুদের মা নুরুন্নাহার বেগম। আর বাকি টাকা পাবেন তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ ও তার সন্তান নিষাদ মাসুদ। বিচারপতি জিনাত আরা ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় দেন। আপিল বিভাগে চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের করা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখনো ক্ষতিপূরণ পাননি নিহত তারেক মাসুদের পরিবার। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জাকা এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মারা যান তারেক মাসুদ এবং এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীর। মিশুক মুনীরের মামলা এখনো বিচারাধীন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত