শিরোনাম

কারসাজিকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলছে শেয়ারবাজার!

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী  |  ০০:৪২, এপ্রিল ১৬, ২০১৯

দেশের শেয়ারবাজার স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও কিছুতেই স্বস্তি ফিরছে না সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। টানা দরপতনে আবারো অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে পুঁজিবাজার। একটি শক্তিশালী চক্র কারসাজির সাথে জড়িত থাকায় শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। ফলে বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আবারো নেমে এসেছেন রাজপথে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দেখভাল করার দায়িত্বে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সেই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকরা বর্তমান কমিশনের চেয়ারম্যানসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছেন। পুঁজিবাজারে আইপিওর মাধ্যমে ভালো মানের নতুন কোম্পানি আনা থেকে শুরু করে সেকেন্ডারি মার্কেটের নিয়ন্ত্রণে সংস্থাটি ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ অনেকের। তারা বলছেন, বাজারে একটি কারসাজিকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। বাজারের উত্থান-পতন অনেক ক্ষেত্রে তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে ধসের পর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে যাদের নাম উঠে এসেছিল, তাদেরকে এখনো পর্যন্ত আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়েছে বিএসইসি। বিনিয়োগকারী আজাদ আহসান বাচ্চু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী কারসাজি চক্র শেয়ারবাজারে সক্রিয় রয়েছে। তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। সার্বিকভাবে বাজারের অবস্থা খারাপ হলেও প্রতি মাসেই নির্দিষ্ট কোনো একটি বা একাধিক কোম্পানির শেয়ার নিয়ে তারা খেলছে। আর সেক্ষেত্রে তারা ‘জেড’ ক্যাটাগরির দুর্বল কোনো কোম্পানিকেই বেছে নিচ্ছে। তার কথার রেশ দেখা যায় গত সপ্তাহের লেনদেনের দিকে তাকালেও। গত সপ্তাহে দাম বাড়ার শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকার ছয়টি স্থানই দখল করেছে ‘জেড’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে শীর্ষ তিনটি স্থানই রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে না পারা কোম্পানির দখলে। শেয়ারের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে আধিপত্য দেখানো জেড গ্রুপের কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, সমতা লেদার, ইমারেল্ড অয়েল, ইনফরমেশন সার্ভিসেস এবং অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ। পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ইস্যু ম্যানেজারদের সহযোগিতায় দুর্বল কোম্পানি কৃত্রিমভাবে মুনাফা বেশি করে দেখিয়ে টাকা তুলে নিচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন নীরব ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া সেকেন্ডারি মার্কেটের দিকে তাকালেও বোঝা যায়, সেখানে স্বাভাবিক অবস্থা নেই। এক্ষেত্রে যদি কোনো চক্র কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে বিএসইসিরই দায়িত্ব তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা। বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী বলেন, শেয়ারবাজারে পতন হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। পাতানো খেলার মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম প্রভাব খাটিয়ে পতন ঘটানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে ২০১০ সালের রাঘব বোয়ালরা জড়িত। যাদের নাম খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্তে উঠে এসেছিল, তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে পারলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে প্রায় ৮০টি কোম্পানির শেয়ারের দাম ইস্যু মূল্যের নিচে অবস্থান করছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। সরকার বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে খায়রুল হোসেনকে দায়িত্ব দিয়েছে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বিএসইসির সব পদক্ষেপ ইস্যুয়ার কোম্পানিগুলোর পক্ষে যাচ্ছে।ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ৭৬টি কোম্পানির শেয়ারের দাম ইস্যু মূল্যের নিচে অবস্থান করছে। এর মধ্যে উচ্চ প্রিমিয়ামে তালিকাভুক্ত বসুন্ধরা পেপার, আমান কটন ফাইবার্স, ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডায়িং, অ্যাপোলো ইস্পাত, ওরিয়ন ফার্মা, আরগন ডেনিমস ও হামিদ ফেব্রিক্স লিমিটেডের শেয়ারও বর্তমানে ইস্যু মূল্যের নিচে লেনদেন হচ্ছে। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করার পর কাঙ্ক্ষিত হারে মুনাফা করতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অর্থ সংগ্রহ করার সময়ে ব্যবসা সমপ্রসারণ ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে মুনাফা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ কোম্পানির মুনাফা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে তো বাড়েইনি, বরং কোনো কোনো কোম্পানির মুনাফায় ধস নেমেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইপিওর আগে কৃত্রিমভাবে মুনাফা ও সম্পদ বেশি দেখিয়ে কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজার থেকে উচ্চ প্রিমিয়ামে অর্থ উত্তোলন করেছিল। অর্থ সংগ্রহের পর কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা এখন ফুটে উঠছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিএসইসির গাফিলতির কারণেই এসব দুর্বল কোম্পানি উচ্চ প্রিমিয়াম নিতে পেরেছে। ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাবের কারণেই ধারাবাহিক পতন ঘটছে। গত কয়েক বছরে আইপিওর মাধ্যমে দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মানসম্মত আইপিও এলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। বাজারও স্বাভাবিক অবস্থায় আসবে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য কোম্পানির বেশি মুনাফা দেখানোর এক ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। তবে বিএসইসি চাইলে খুব সহজেই তাদের প্রতিরোধ করতে পারে। ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে ধসের পর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা- তৎকালীন এসইসিকে পুনর্গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ১৫ মে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান এম খায়রুল হোসেন। তাকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো ও বাজারকে স্থিতিশীল করার দায়িত্ব দেয়া হলেও গত ৯ বছরে তিনি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। বরং গত ৯ বছরে যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে এসেছে, তাদের অধিকাংশের দামই এখন ইস্যু মূল্যের অনেক নিচে। নানা আশ্বাস দিয়ে দুই দফায় এম খায়রুল হোসেন নিজের মেয়াদ বাড়িয়ে নিলেও বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারেননি। বরং দিনের পর দিন বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত