শিরোনাম

রাজনৈতিক প্রভাবে সরছে শেখ হাসিনা তাঁতপল্লি

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম  |  ০০:৩১, এপ্রিল ১৬, ২০১৯

পদ্মাপাড়ের পূর্বনির্ধারিত স্থানে হচ্ছে না ‘শেখ হাসিনা তাঁতপল্লি’। সরিয়ে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় তাঁতপল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ কারণে ঘুমের ঘোরেই লালিত স্বপ্ন পুড়ছে শরীয়তপুরবাসীর। জমি অধিগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগে শরীয়তপুর অংশ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। যা নিয়ে ক্ষোভে সঞ্চার হচ্ছে জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটির পাশের জেলার বিশেষ ব্যক্তির রাজনৈতিক প্রভাবে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে তাঁতপল্লি। অনিয়মের অভিযোগ তোলা হলেও ব্যবস্থা না নিয়ে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক সমাধান নয়। মূলত প্রভাবশালী ওই রাজনীতিবিদ যেভাবে যাচ্ছেন, সেভাবেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।তথ্য মতে, সম্ভাবনাময় তাঁতশিল্পকে ঘিরে সরকারের নানা পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। গত ২০১৪ সালের অক্টোবরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় ঢাকার বাইরে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ তাঁতপল্লি স্থাপনের নির্দেশনা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, কাঁচামাল সুবিধাসম্বলিত জায়গা খোঁজা শুরু করে মন্ত্রণালয়। প্রথমে ভাসানটেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা জটিলতায় আটকে যায়। এরপর পদ্মা সেতু প্রকল্পের দক্ষিণপাড়ে নতুন করে জায়গা নির্ধারণ করে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে গত বছর একনেকে ১৯১১ কোটি টাকার ‘শেখ হাসিনা তাঁতপল্লি’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। পুরো অর্থই সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন কাজ করবে বাংলাদেশ তাঁতবোর্ড। মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, শেখ হাসিনা তাঁতপল্লিটি হবে দেশের সবচে বড় তাঁতপ্রকল্প। ফলে সবদিক বিবেচনায় রেখে পদ্মা সেতুর রেলপথ সংযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত রেখে ১২০ একর জমিতে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। এজন্য মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কুতুবপুর মৌজার ৬০ একর ও শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা মৌজার ৪৮ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রকল্প অনুযায়ী, তাঁতি সম্প্রদায়ের বসবাস সুবিধাসহ সব ব্যবস্থা রেখেই এ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আট হাজার ৬৪টি তাঁত স্থাপন করা হবে। নির্মাণ করা হবে ৪২টি আবাসিক ভবন, সেখানে প্রায় আড়াই হাজার তাঁতিকে ৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট দেওয়া হবে। ৫০০ জন কারিগরের বসবাস উপযোগী ডরমেটরি, একটি রেস্টহাউস, সাইবার ক্যাফে ও পল্লি বিদ্যুতের উপকেন্দ্র থাকবে। তাঁতশিল্পের গবেষণাকেন্দ্রসহ মসজিদ, মন্দির, খেলার মাঠ, শিশুদের লেখা-পড়ার জন্য স্কুল-কলেজ নির্মাণ করা হবে। থাকবে তাঁতপণ্যের হাট বসানোর ব্যবস্থা। হাটে কাঁচামালসহ তাঁতপণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বস্ত্র চাহিদার ৪০ ভাগ জোগান দেন স্থানীয় তাঁতিরা। এ খাতের বার্ষিক উৎপাদন ৬৯ কোটি মিটার। এ শিল্পটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১৫ লাখ লোক জড়িত। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাল্টে যাবে আশপাশের জীবনব্যবস্থা। আর নতুন মাইলফলক আসবে জাতীয় অর্থনীতিতে। ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মতো অর্থ জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ হবে বলে তাঁতবোর্ড সূত্রে জানা গেছে। এদিকে, শেখ হাসিনা তাঁতপল্লিকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের মানুষ। স্থানীয় কিছু অসাধুচক্রের কারণে জাতীয় এ প্রকল্প সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে শরীয়তপুর। তবে অসাধুচক্রকে দমন না করে বরং শরীয়তপুর অংশ সরিয়ে মাদারীপুর জেলার শিবচরে নেওয়ার চেষ্টা চলছে পুরো প্রকল্প।প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য মতে, ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নির্ধারিত ওই স্থানে ‘শেখ হাসিনা তাঁতপল্লি’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপরই শরীয়তপুরের নাওডোবা এবং মাদারীপুরের শিবচরের অংশের জমিতে নতুন ঘরবাড়ি, গাছপালা, স’মিলসহ নানা স্থাপনা গড়ে তোলে স্থানীয়রা। মূলত জমি অধিগ্রহণকালে সরকারের কাছ থেকে বেশি অর্থ আদায়ের লোভে কিছু অসাধুচক্র এ কাজে নেমে পড়ে। অথচ কয়েক মাস পূর্বে সেখানে কোনো স্থাপনা ছিল না। যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হয়। গত ২৬ মার্চ তাঁতপল্লির পূর্ব নির্ধারিত স্থান পরিদর্শনকালে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী জানান, শেখ হাসিনা তাঁতপল্লির নির্ধারিত স্থানে অবৈধ স্থাপনা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে দেখা গেছে এখানে ভালো কিছু হচ্ছে না। আমাদের নির্দেশনায় মাদারীপুরের প্রশাসন অবৈধ সব স্থাপনা ভেঙে ফেলেছে। কিন্তু শরীয়তপুরের প্রশাসন কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। তাই সংসদীয় কমিটি, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সবাই একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শেখ হাসিনা তাঁতপল্লি একই উপজেলায় করা হবে। এ জন্য মাদারীপুরের শিবচরের কুতুবপুর এলাকায় জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, দুই জেলায় এমন একটি প্রকল্প করতে গেলে শুধু এই অনিয়মই নয়, ভবিষ্যতে আরও কিছু সমস্যা হবে। যেমন— আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে নিয়ন্ত্রণে জটিলতা সৃষ্টি হবে। প্রকল্পটি সরিয়ে নেওয়ার একই কারণ জানান বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দুজন অতিরিক্ত সচিব। তবে অসাধুচক্র বা ব্যবস্থা না নেওয়া কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাননি কেন, এর জবাব দেননি তারা। জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান বলেন, স্থানীয় কিছু দুষ্টুচক্রের অসৎ কিছু কার্যক্রমের জন্য শেখ হাসিনা তাঁতপল্লির পূর্ব নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন জায়গা নির্ধারণের কাজ চলছে। অসাধুচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সরানোর সিদ্ধান্ত কেন ? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার কোনো দুষ্টুচক্রকে লাভবান হতে দেবে না এবং তাদের সঙ্গে কম্প্রোমাইজও করবে না। তাই সরনোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। শরীয়তপুর প্রশাসন সূত্র মতে, জায়গা নির্ধারণ করা হলেও অধিগ্রহণ কাজ শুরু হয়নি। যে কারণে কেউ নিজস্ব জমিতে স্থাপনা করলে বাধা দেওয়া যায় না। এরপরও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের তথ্য আসার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষে মাইকিং করা হয়। নির্মিত স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয় এবং কোনোভাবেই ওইসব স্থাপনা ক্ষতিপূরণের তালিকায় আসবে না বলে সতর্ক করা হয়। কয়েক দফা নোটিস দেয়ার পরই নতুন করে গড়ে ওঠা স্থাপনা অপসারণের কাজ শুরু হবে। কিন্তু এর আগেই সরানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মাদারীপুরের প্রশাসন স্থাপনা অপসারণে ব্যবস্থা নিয়েছে— এমন তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করে সূত্রটি। শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক আবু তাহের আমার সংবাদকে বলেন, অভিযোগের সত্যতা জানতে হলে প্রকল্প এলাকাটি সরেজমিন দেখতে হবে, আসলেই একটি অংশের স্থাপনা ভাঙা হয়েছে কিনা। এসময় শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। প্রকল্প পার্শ্ববর্তী একটি ইউনিয়নের এক জনপ্রতিনিধি গত মঙ্গলবার দাবি করেন— মাদারীপুরের শিবচর এবং শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা উভয় অংশেই এখনো অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। শিবচরের অংশের কয়েকটি ঘর সরানো হলেও এখনো অধিকাংশ রয়েছে। অথচ অনিয়মের অভিযোগে শরীয়তপুর অংশ বাদ রাখা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে। ব্যক্তি রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে শরীয়তপুরের কেউ এ বিষয়ে কথা বলছেন না। এ কারণে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে শরীয়তপুর। জাজিরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীণ আওয়ামী লীগনেতা মোবারক আলী সিকদার বলেন, অবৈধভাবে ঘর শুধু জাজিরায় তোলা হয়নি, শিবচরেও তুলছে, এখনো আছে। সবগুলোই ভাঙা উচিত এবং ভাঙা হবে। তাঁতপল্লিটি হবে জাতীয় সম্পদ। এটাকে কেন্দ্র করে কেউ অবৈধ অর্থ নেবে, সেটা হবে না। আমরা আগেই জানিয়েছি— নতুন কোনো স্থাপনা অধিগ্রহণের আওতায় আসবে না। এ অজুহাতে সরিয়ে নেওয়া হলে আমরা প্রতিবাদ জানাবো। নেত্রীর নির্দেশ আছে— পদ্মার দুপাড়ে শিল্প হবে। নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী) তাঁতপল্লির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। আমরাও নেত্রীকে পূর্বের জায়গায় স্থাপনাটি করার জন্য আবেদন জানাবো। তিনি বলেন, একটা ইন্ডাস্ট্রি হলে আরেকটা হয়, মানুষের কর্মসংস্থান হয়। আর এভাবেই গোটা অঞ্চলের অগ্রগতি হয়। এটা সরিয়ে নিলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো, আমাদের স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন জাজিরা-শিবচর একই সুতোয় গাঁথা। রাস্তার এপার-ওপার। একটি পাশ উন্নত হবে, আরেক পাশ হবে না, সেটা হতে পারে না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত