শিরোনাম

জামায়াত-জাপায় দল বাঁচানোর কৌশল!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০০:২৬, এপ্রিল ১৬, ২০১৯

রাজনীতিতে টিকে থাকার কৌশল গ্রহণ করেছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের শাসন দীর্ঘায়িত হওয়ায় ভাঙন-গৃহবাদের নাটকে দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নয়া কৌশল নেয়া হয়েছে দল দুটিতে। ঢাকায় নেতৃত্ব থেকে শিবিরের সাবেক সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু আর দেশের বাইরে থেকে জামায়াতের সাবেক সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে দল গঠন হচ্ছে, এ নিয়ে জামায়াতে ভাঙন-বিভক্তির আভাস পাওয়া গেছে। অন্যদিকে এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ অপরদিকে এরশাদের ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরের নেতৃত্বে সমপ্রতি বিভক্ত হওয়ার যে গুঞ্জন গণমাধ্যমে এসেছে তা সম্পূর্ণ দলীয় ছকের আলোকে নাটক হয়েছে বলে দাবি দল দুটির হাইকমান্ডের। তাদের দাবি জামায়াতেও বিভক্তি নেই, জাতীয় পার্টিতেও নেই গৃহবিবাদ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের দেশ পরিচালনার সময় দীর্ঘায়িত হওয়ায় দেশের অনেক রাজনৈতিক দল এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। অবশ্য ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটছে না এক সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী দল এরশাদের জাতীয় পার্টি ও বিতর্কিত দল জামায়াতে ইসলামীতেও। বহুদিন ধরে রাজনৈতিক হামলা থেকে এরশাদের সম্পদ টিকিয়ে রাখতে এরশাদের পুরনো চরিত্র বারবার নতুনরূপে গণমাধ্যমে আসছে। রাজনীতিতে এরশাদ তার মতো করেই খেলছেন। কখনো আলোচিত হয়ে কখনো সমালোচিত হয়ে। সমপ্রতি তার ভাই গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরের দলীয় পদ রদবদলের মাধ্যমে গণমাধ্যমে এরশাদ চরিত্রে আবার বিস্ফোরণ ঘটে। তবে সবকিছুই রাজনৈতিক খেলা থেকে খেলেছেন বলে দাবি এরশাদের বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর। অন্যদিকে একই চরিত্র জামায়াতে ইসলামীতেও। শেখ হাসিনা পুনরায় ক্ষমতায় আসায় জামায়াতের ঘরে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ঘোষণা দিয়ে দলটি বিলীন হয়ে যাবে। যতদিন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকবে ততদিন দলটি আর প্রকাশ্যে রাজনীতি করবে না। কিন্তু দলের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ সুরক্ষা রাখতে ফের দল টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। দলীয় কৌশলেই দলের শীর্ষ দুই নেতাকে দল থেকে বের করে দেয়া হয়। এখন ওই দুই ব্যক্তি দল গঠনের নামে জামায়াতের মধ্যে ভাঙন-গৃহবিবাদের আলোচনা নিয়ে আসছেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দলীয় চরিত্র মাথায় রেখেই দুই দলের কার্যক্রম চলছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনীতিতে টিকে থাকতে দল বাঁচানোর কৌশল চলছে দল দুটিতে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীর সংস্কারপন্থিরা একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টা করছেন। আগামী ২৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা আসতে পারে- এমন একটি গুঞ্জনও ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সমপ্রতি সংস্কারপন্থিদের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সংস্কারপন্থিদের একটি সূত্র আমার সংবাদকে জানিয়েছে, আবদুর রাজ্জাক ও মঞ্জু নতুন দল গঠনে ৬ মাসের চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এরই মধ্যে তারা সব কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন। তবে মূল জামায়াতের সাথে দলটি আর সম্পৃক্ত হবে না এমন ইঙ্গিত দিয়েছে সূত্রটি। জানা যায়, ঢাকায় সংস্কারপন্থিদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শিবিরের সাবেক সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু। আর দেশের বাইরে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জামায়াতের সাবেক সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। এই দুজনের মধ্যে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের আগে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার জন্য জামায়াতকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি জামায়াতের রাজনীতিতে আমূল সংস্কারের প্রয়োজন বলে দীর্ঘ অভিমতও তুলে ধরেন লিখিত বিবৃতিতে। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের এই ‘মত’ প্রকাশ্যে সমর্থন করায় দল থেকে বহিষ্কার হন শিবিরের সাবেক সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের শীর্ষ নেতা মুজিবুর রহমান মঞ্জু। এ দুজন সংস্কারমনা জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের সাবেক এবং বর্তমান নেতাদের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন, কাউন্সিলিং করছেন বলেও জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য শিবিরের সাবেক সভাপতি ইহসানুল মাহবুব জুবায়েরের সঙ্গে কথা বললে তিনি প্রচার সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলতে পরামর্শ দেন। এই বলে ফোন কেটে দেন। এদিকে এরশাদের অনুপস্থিতিতে জাপা ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো। এরশাদ না থাকলে এ দলের ভবিষ্যৎ কি হবে তা নিয়েও বড় সংকট দেখা দিয়েছিলো। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, এরশাদ অসুস্থ হওয়ার পর এবিএম রুহুল আমিনকে মহাসচিব পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার পর দলে অনেক দূরত্ব তৈরি হয়। এই অবস্থায় তখন দলের হাল ধরতে চেয়েছিলেন জিএম কাদের। তাই তার অনুপস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করার জন্য ছোট ভাই জিএম কাদেরকে আগাম মনোনয়ন দিয়ে রেখেছিলেন। যদিও দল চালানোর ব্যর্থতার অভিযোগে গত ২২ মার্চ গভীর রাতে জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি দেন পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ। পর দিন বিরোধী দলীয় উপনেতার পদ থেকেও বাদ দেয়া হয় জিএম কাদেরকে। কিন্তু দুই সপ্তাহ পার হতেই গভীর রাতে সিদ্ধান্ত পাল্টান এরশাদ। পুনরায় কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয় জিএম কাদেরকে। এরশাদের বারবার সিদ্ধান্ত বদলের ঘটনায় গত দুই সপ্তাহে জাপায় গৃহবিবাদ তুঙ্গে উঠেছিলো। এ নিয়ে দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, এরশাদ সবকিছু জেনে বুঝেই তৈরি করেছেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে দল টিকিয়ে রাখতে কৌশলমাত্র। রুহুল আমিন হাওলাদার এরশাদের সব গোপনীয় বিষয় জানেন বলে আপাতত তাকে দূরে রাখা হয়েছে। এই দুই দলের হালচাল নানা বিশ্লেষণে দেখছেন বুদ্ধিজীবী মহল। তাদের মত, জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত আছে আর এরশাদের আছে রাজনৈতিক ঐতিহ্য। দুই দলই চাচ্ছে রাজনীতিতে টিকে থাকতে, দলীয় সম্পদগুলো বাঁচিয়ে রাখতে। দলের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক আক্রমণ থেকে বাঁচাতে কৌশলের খেলা চলছে। তাই এই দুই দলে সামপ্রতিক ঘটে যাওয়া পরিস্থিতিকে নাটক হিসেবেই দেখছে বুদ্ধিজীবী মহল।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত