শিরোনাম

গ্রাহকদের মতামত পাত্তাই দিচ্ছে না সেবা সংস্থাগুলো

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম  |  ০১:০৯, এপ্রিল ১৪, ২০১৯

গ্যাসের দাম বাড়ানো, কমানো কিংবা সমন্বয় ঘুরে ফিরে আলোচনা। গত মাসে এ নিয়ে গণশুনানি হয়েছে। সেখানে গ্যাস কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধি ছাড়া প্রত্যেকে দাম বৃদ্ধির বিপক্ষে। এরপরও গ্যাস কোম্পানিগুলো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় বরাবরের মতো সমন্বয়ের কথা বলছে। গণশুনানিতে গ্রাহকদের কাছে যা মূল্য বাড়ানো হচ্ছে সেটি মন্ত্রণালয় সমন্বয় বলছে। শুধু গ্যাসের ক্ষেত্রে নয়, বিদ্যুৎ ও পানির দাম দ্বিগুণ বাড়ানো হলেও সেটি সমন্বয়ের কথা বলে সংস্থাগুলো। অবশেষে, গ্রাহকদের দাবি বাস্তবায়ন না হলেও সেবাসংস্থাগুলো বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির দাম ঠিকই বাড়ায়। জানা যায়, নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী গৃহস্থালিপর্যায়ে দুই চুলার জন্য গ্যাসের দাম ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ১২০০ টাকা করার কথা বলা হচ্ছে। আর এক চুলার জন্য ৭৫০ থেকে বেড়ে ১০০০ টাকা। হঠাৎ করে গ্যাসের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব সংশ্লিষ্টরা সমন্বয় বলেন। একবার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব উঠলে আর থেমে থাকে না। জনগণ যে দাবি করুক, সেবা সংস্থাগুলো সমন্বয়ের নাম করে প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ সালে সরকার বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের নামে বাড়াতে চাইলে গ্রাহকরা গণশুনানি করে। কিন্তু সেই বছরের ১ সেপ্টম্বর বিদ্যুতের দাম গড়ে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ বাড়িয়েছিল সরকার। তাতে মাসে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের খরচ বাড়ে ২০ টাকা, ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে খরচ বাড়ে কমপক্ষে ৩০ টাকা। পরে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগেও গণশুনানি হয়। শুনানিতে গ্রাহকরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিপক্ষে মতামত দেন। কিন্তু শুনানি শেষমেষ কয়েকদিন পরেই বিইআরসির পক্ষ থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়। ঢাকা ওয়াসা পানির ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে ৪ মাসের মাথায় দুবার পানির দাম বাড়ায়। সেখানে আবাসিক ক্ষেত্রে দাম প্রতি ইউনিটে (এক হাজার লিটার) ১ টাকা ৫১ পয়সা এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ৩ টাকা ৭২ পয়সা বাড়ায়। অথচ ওয়াসার পানির দাম বছরে ৫ শতাংশ হারে বাড়ানোর নিয়ম। কিন্তু আবাসিক ও শিল্প-বাণিজ্যিক খাতে যথাক্রমে ১৭ ও ১৩ শতাংশ বাড়ায়। একই অবস্থা ২০১৮ সালে। আবাসিকে প্রতি ১ হাজার লিটার পানি ব্যবহারে ১১ টাকা দুই পয়সা। আর বাণিজ্যিক গ্রাহকদের বিল ৩৫ টাকা ২৮ পয়সা করে। প্রতিবছর সেবাসংস্থাগুলো দামের সমন্বয়ের নামে নিয়মের চেয়েও দ্বিগুণ হারে দাম বাড়াচ্ছে। অথচ সংস্থাগুলো বলছে দাম সমন্বয়।এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব বিইআরসি কর্তৃৃক গৃহীত হওয়া এখতিয়ার বহির্ভূত ও বেআইনি। গ্যাস সঞ্চালন মূল্যহার, গ্যাস বিতরণ মূল্যহার এবং পাইকারি গ্যাসের মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাবগুলো কয়েকটি কারণে অযৌক্তিক এবং বেআইনি। বিইআরসি আইনের ২(ঝ) উপধারা মতে এনার্জি সরবরাহ বা তৎসম্পর্কিত বিশেষ সেবার মূল্যহার এবং ৩৪(৫) উপধারা মতে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ট্যারিফ কোনো অর্থবছরে একবারের বেশি পরিবর্তন করা যাবে না। যদি না জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তনসহ অন্য কোনরূপ পরিবর্তন ঘটে। অথচ গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো নয়, সমন্বয় করতে হচ্ছে। এতে করে ব্যবসায়ীদের কোনো ক্ষতি হবে না। আর যদি সমস্যা হয় তাহলে সরকার তা দেখবে। তিনি আরও বলেন, দেড় বছর আগে আমরা এফবিসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে বসেছিলাম। তখনই গ্যাসের দাম সমন্বয়ের কথা জানিয়েছিলাম। এখন আমরা দাম সমন্বয় করতে যাচ্ছি। আগামী পাঁচ বছর পর্যায়ক্রমে দাম সমন্বয় করা হবে। ৯ টাকার গ্যাস ৬ টাকায় দিচ্ছি।জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন খাতে চুরি হয়, অনিয়ম হয়। কিন্তু জ্বালানি খাতে যে চুরি হয়, তা সব খাতের চুরির চেয়ে বড়।বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিইআরসিতে এসে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ করা আর না করায় কোনো পার্থক্য নেই। কারণ আমরা জনগণের পক্ষে যা-ই বলি না কেন, উপরমহল থেকে যা নির্ধারণ করা আছে, বিইআরসি তা-ই ঘোষণা করবে। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির এ গণশুনানি বন্ধ না করলে বিক্ষোভের ঘোষণা দেন তিনি।গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী বলেন, অর্থনীতির মৌল ভিত্তিগুলো শক্তিশালী না করে অপরিকল্পিতভাবে জ্বালানির জোগান বাড়ানো হচ্ছে। এর আগে রেন্টাল-কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎ খাতের ক্ষত বাড়ানো হয়েছে। এখন এলএনজির নামে জ্বালানি খাতের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। এই ব্যয়ের দায় জনগণের ওপর চাপাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে পেট্রোবাংলা। এটা কখনো মেনে নেয়া হবে না। মহিউদ্দিন আহমেদ নামে এক ভোক্তা প্রতিনিধি বলেন, উচ্চমূল্যের কথা বলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। অথচ বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতায় বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার অবৈধ সংযোগে গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব যতদিন বন্ধ না হয়, ততদিন পর্যন্ত আমরা গ্যাসের দাম বাড়াতে দেব না।পানির মূল্য বাড়ানোর বাংলামটর বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ওয়াসার অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি কমানো গেলে পানির দাম এভাবে বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না। তাই ওয়াসা কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দূর করার দিকে মনোযোগ দেয়া বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে লক্ষ করতে হবে যে, দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে গ্রাহকের ঘরে যে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে তার গুণমান কী? কী মানের পানির বিনিময়ে ওয়াসা গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি হারে টাকা নিচ্ছে?উল্লেখ, গত ৮ বছরে ওয়াসার পানির দাম বেড়েছে দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। ২০০৯ সালে প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) আবাসিক সংযোগ পানির দাম ৫ টাকা ৭৫ পয়সা, ২০১০ সালে প্রতি ইউনিট পানির দাম ৬ টাকা ৪ পয়সা, ২০১১ সালে প্রতি ইউনিট পানির দাম ৬ টাকা ৩৪ পয়সা ও ২০১২ সালে প্রতি ইউনিট পানির দাম ৬ টাকা ৬৬ পয়সা ছিল। এভাবে প্রতিবছর বাড়িয়েও ২০১৭ সালে দুই দফায় পানির দাম বাড়ানো হয়। সর্বশেষ গত বছরের নভেম্বর মাসে বাড়ানো দাম অনুযায়ী বর্তমানে আবাসিক প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির মূল্য ১০ দশমিক ৫০ টাকা আর বাণিজ্যিক সংযোগে প্রতি ইউনিট পানির দাম ৩৩ দশমিক ৬০ টাকা।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত