শিরোনাম
সড়কে বেপরোয়া বাস

আশ্বাসেও বিশ্বাস নেই কিশোর-কিশোরীদের!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০০:১০, মার্চ ২১, ২০১৯

*প্রত্যাশার স্থান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে : মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক
*দোষীদের শাস্তি কার্যকর হয় না : কাজী সাইফুন নেওয়াজ, সহকারী অধ্যাপক (বুয়েট)
*ওরা কথা রাখেনি, শিশুরা ভুলে যায়নি : সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মানবাধিকারকর্মী
*প্রশ্নবিদ্ধ সড়ক আইনও বাস্তবায়িত হয়নি : ইলিয়াস কাঞ্চন, চেয়ারম্যান (নিসচা)
*তদন্ত প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখে না : মোজাম্মেল হক চৌধুরী, মহাসচিব, বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি

প্রধানমন্ত্রীর ১৭ নির্দেশনাও বাস্তবায়ন হয়নি : কেফায়েত শাকিল, আহ্বায়ক, যাত্রী অধিকার আন্দোলনসড়কে রক্তের দাগ! বাসের চাকায় চাপা পড়ছে স্বপ্ন! চোখের সামনেই প্রিয় সহপাঠীদের মৃত্যু দেখতে হচ্ছে সহপাঠীদের। প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে কিশোর-কিশোরীরা রাস্তায় নামলে নাড়া পড়ে দেশজুড়ে। টনক নড়ে প্রশাসনেও। তখন ক্ষণিক সময়ে আসে আশ্বাস! কিন্তু এবার আশ্বাসেও নরম হয়নি শিশু-কিশোররা। সমপ্রতি দুই বাসের রেষারেষিতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীর মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদে সতীর্থরা নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভে নামেন। তাদের থামাতে ছুটে আসেন বিশেষ ব্যক্তিরা। গতকাল দুপুরে রাজধানীর বসুন্ধরায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বোঝাতে এসে একপর্যায়ে তোপের মুখে পড়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে হয়েছে উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। এ সময় বিশেষ ব্যক্তিরা শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া মেনে নেয়ার আশ্বাস দিলে সমস্বরে স্লোগান দেন ‘ভুয়া ভুয়া।’ শিশু-কিশোররা কেন আশ্বাসেও বিশ্বাস রাখতে পারছে না। এ নিয়ে ছয়জন বিশ্লেষকের সঙ্গে কথা বলেছে দৈনিক আমার সংবাদ। তারা বলেছেন, দিন দিন বিশেষ ব্যক্তিদের ওপর প্রত্যাশার স্থান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কেউ প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ করছে না। চিহ্নিত দোষীদের শাস্তি কার্যকর হয় না। এখন পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ সড়ক আইনটিও বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ ব্যক্তিরাও কথা রাখেননি, তাই শিশুরা ভুলে যায়নি। কোনো ঘটনা ঘটলেই একটি তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু সেই প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখে না। এছাড়া সড়কে মানুষের নিরাপত্তায় প্রধানমন্ত্রীর ১৭টি নির্দেশনা এখনো বাস্তবায়ন না হওয়া কারণ আছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আব্দুর রশীদ আমার সংবাদকে বলেছেন, পূর্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে সাধ্যানুযায়ী আর কাজ করা হয় না। যার ফলে সড়কও নিরাপদ হয় না। আমাদের সবারই জানা দরকার, সড়ক নিরাপদ একদিনের কাজ নয়। একদিনে সব সমাধান করে ফেলার সাধ্য কারো নেই। একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেলে বিশেষ ব্যক্তিরা আর অনুধাবন করেন না। এটি যেন আমাদের সংস্কৃতি হয়ে গেছে। ঠিক হয়ে যাবে এ নিয়ে বিশেষ ব্যক্তিরা বসে থাকেন। তাই শিশু-কিশোরদের প্রত্যাশার স্থান ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ আমার সংবাদকে বলেছেন, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আইন হয়েছে। কিন্তু এরপরও প্রকৃত তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তি বাস্তবায়ন হয়নি। তাই আমার মনে হচ্ছে, শিশু-কিশোররা ঘটনার বিচার হবে এ বিষয়টির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। আমরা এর আগে সুপারিশে সরকারকে বলেছিলাম, জেব্রা ক্রসিং সঠিকভাবে থাকে না, ফুটওভারব্রিজ ও আন্ডারপাসের অবস্থান ও পরিবেশ ঠিক নেই। অনেক ক্ষেত্রে ময়লা ও নিরাপত্তাজনিত কারণেও মানুষ এগুলো ব্যবহার করতে চায় না। এছাড়া ফুটওভারব্রিজ ও আন্ডারপাসগুলো প্রতিবন্ধী পথচারীদের জন্য একেবারেই অনুপযোগী।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন আমার সংবাদকে বলেছেন, ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা অতীতেও আমরা দেখেছি রাস্তায় এসে শিশু-কিশোরদের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারা যে আশ্বাস দিয়ে এসেছিলেন তার বাস্তবায়ন করেন না। তাই সাহসী শিশু-কিশোররা এখন আর আশ্বস্ত হতে পারে না। কারণ সমাধানের জায়গা চিহ্নিত হওয়ার পরও তারা সেই জায়গায় আসেনি। প্রশাসন দোষীদের বিচার না করে উল্টো বলে থাকে মানুষ আইন মানে না। দোষ মানুষের ওপরও চাপায়। অন্যদিকে প্রশ্নবিদ্ধ নিরাপদ সড়ক নিয়ে যে আইনটি পাস করা হয়েছে, তা এখনো কার্যতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী ও মানবাধিকার কর্মী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আমার সংবাদকে বলেছেন, আসলে যারা শিশু-কিশোরদের সান্ত্বনা দিতে যান তারা কেউ প্রকৃত জনপ্রতিনিধি হয়ে আসেননি। তারা কিভাবে ক্ষমতায় এসেছে প্রযুক্তির কল্যাণে মেধাবী শিশু-কিশোররা সবই জানে। যারা নিরাপত্তা দিতে যান তারাও যে অতীতে কথা রাখেননি, নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন ওরা (শিশুরা) ভুলে যায়নি। অতীতে দেখেছি পুলিশের সামনেই কোমলমতি শিশুদের কে কোন উদ্দেশ্যে এসেছে এটা বিশ্বাস করাও এখন শিশুদের মুশকিল।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেছেন, আমি মনে করছি যাত্রীরা অবহেলায় পর্যবসিত। গাড়ি চাপায় মানুষ মরে, এরপর একটা তদন্ত কমিটি হয় কিন্তু সেই তদন্ত কমিটি তদন্ত আর আলোর মুখ দেখে না। কোনো তদন্তই ষোলো আনা বাস্তবায়ন হয় না। সবসময় আশ্বাস-বিশ্বাসের কথা শোনালেও তার কার্যত রূপ দেন না। অতীতেও অনেক আন্দোলনে অনেকে এসে আশ্বাস দিয়ে চলে গেছেন, তাই এখন আর কারো কথাকে বিশ্বাস করে না শিশু-কিশোররা।
যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক কেফায়েত শাকিল আমার সংবাদকে বলেছেন, আশ্বাসেও এবার শিশু-কিশোররা আস্থা হারানোর মূল কারণ হচ্ছে, গত সাত মাস আগে আমরা দেখেছি যে, নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন হয়েছিল। যেটি পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রশাসন তখন নানা আশ্বাস ও পদক্ষেপের কথা জানিয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেসব আশ্বাসের কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। মাথায় হেলমেট ব্যবহার, ব্যক্তিগত কিছু পরিবহনে পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়লেও প্রধানমন্ত্রী যে ১৭টি নির্দেশনা দিয়েছেন তা বাস্তবায়িত হয়নি। এটা শিক্ষার্থীদের হতাশা করারই বিষয়। শাস্তি বাস্তবায়ন হলে পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। বিচার না হলে একের পর সমস্যা আরও বাড়বে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত