শিরোনাম

যত্রতত্র হচ্ছে নরমাল ডেলিভারি হাসপাতালে গেলেই সিজার!

প্রিন্ট সংস্করণ॥নুর মোহাম্মদ মিঠু  |  ০১:০৪, মার্চ ২০, ২০১৯

সিজার। দিনে দিনে সর্বসাধারণের কাছে অতি পরিচিত ও স্বাভাবিক শব্দে পরিণত করেছে দেশের প্রায় সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অর্থলোভী চিকিৎসকরা। গাইনি চিকিৎসকরা যেন ভুলেই গেছেন নরমাল ডেলিভারির কথা। প্রসূতি নারীরা হাসপাতালের আঙিনায় এলেই দালাল-নার্স-গাইনি চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেন টাকার খনি পেয়ে যান। অথচ প্রসূতি মায়েদের জন্য সিজার যতটা না সুবিধাজনক বলে গাইনি চিকিৎসকরা বলে থাকেন ঠিক ততটাই ভয়ঙ্করও বটে। সিজারের সময় মায়ের গর্ভে রেখেই শিশুর মাথা কাটা, সিজার শেষ হলেও মায়ের গর্ভে গজ রেখে পেট সেলাই করাসহ সিজারের অসংখ্য ঘটনার ভয়ঙ্কর রূপ ইতোপূর্বে দেখেছে দেশের মানুষ। তবুও দিনের পর দিন নরমাল ডেলিভারি পদ্ধতিকে এড়িয়ে সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের মাত্রা বাড়িয়েই চলছেন দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রাইভেট ক্লিনিকের চিকৎসকরা। বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবনের পেছনে ময়লার স্তূপে ৩২টি নবজকাতসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়, রাস্তা-ঘাটে, বন-জঙ্গলে, ডাস্টবিনে এবং সম্প্রতি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে এক ছাত্রীর সন্তান প্রসবের ঘটনায় সিজার ও নরমাল ডেলিভারি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আলোচনায় নানা প্রশ্নের মধ্যে একটি প্রশ্নের জবাব জানতে চেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক ডাক্তার শিখা গাঙ্গুলীর শরণাপন্ন হয় আমার সংবাদ। বনে-জঙ্গলে, রাস্তা-ঘাটে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে অবৈধ জন্ম দেয়া নবজাতকরা সাধারণত নরমাল ডেলিভারিতেই হচ্ছে তাহলে হাসপাতাল-ক্লিনিকে গেলেই কেন সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করতে হয়- এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর না দিয়েই তিনি বলেন, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েটি ঘটনা জানাজানির ভয়ে চাইলেই হাসপাতালে যেতে পারবে না। তাই হলেই নিজে নিজে সন্তান প্রসব করে ট্রাঙ্কে বন্দি করে, যাতে করে বাচ্চাটি মারা যায়। তাছাড়া আমাদের কাছে যেসব রোগীরা আসেন তাদের বেশিরভাগই ক্রিটিক্যাল অবস্থায় আসেন। যে কারণে আমরা তাদের সিজার করাতে বাধ্য হই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা আপনাকে উদ্দেশ করে প্রশ্নটি করা হয়নি বরং দেশের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে সিজারের ভয়াবহ রূপকে কেন্দ্র করেই করা হয়েছে বললে তিনি বলেন, প্রাইভেট হাসপাতাল নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। তবে হাসপাতালগুলোতে লোকবলের সংকটসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সিস্টেমে গলদ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি মূল প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান। সর্বশেষ পরিসংখ্যান তথ্যের বরাত দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিভাগ জানায়, দেশে বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে শতকরা ২৩.৫ শতাংশ এবং বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে ৭১ শতাংশ প্রসূতির সিজার হয়ে থাকে। যা দিনে দিনে আরও বাড়বে বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র। অধিদপ্তরের ওই সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে চিকিৎসকরা নরমাল ডেলিভারির কথা প্রায় ভুলেই গেছে।দেশজুড়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকগুলোর সিজারিয়ান সেকশনে প্রসূতি মায়েদের সন্তান প্রসবকে কেন্দ্র করে নোংরা বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার দৌড়ে লিপ্ত মালিকদের দৌরাত্ম্য কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না বরং দিনে দিনে প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো হয়ে উঠছে বেপরোয়া। কোনো প্রসূতি পেলেই বিশেষ করে প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে জড়িত দালাল থেকে শুরু করে নার্স ও চিকিৎসকরা বিভিন্ন অজুহাতে রোগীকে নরমাল ডেলিভারির বিষয়ে কৌশলে মানসিকভাবে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। দূরে থেকে এর ফায়দা লুটে নিচ্ছেন মালিকপক্ষও। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিজারে অনিচ্ছুক প্রসূতিদের ক্ষতি হওয়ার ভয়ও দেখানো হয় অনেক ক্ষেত্রে। নিরূপায় হয়ে প্রসূতি ও তার স্বজনরা নিরাপদ মাতৃত্ব ও সুস্থ সন্তানের স্বার্থে হাসপাতালের প্রত্যাশায় সায় দেয়। আর সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবে রাজি হলেই শুরু হয় টাকা হাতানোর হিসাব কষাকষি।নরমাল ডেলিভারির চেয়ে সিজারে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বেশি টাকা পায়। হাসপাতাল বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষেরও ব্যবসা হয় বেশি। কারণ বেশি সময় হাসপাতালে থাকতে হয়, ওষুধ বেশি লাগে, অপারেশন থেকে শুরু করে অন্যান্য খরচও বেশি আদায় করা হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারেশনের পর প্রসূতির অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের জীবাণু আক্রমণ দেখা দেয়। এতে হাসপাতালের ব্যবসা বেড়ে যায়। আর নরমাল ডেলিভারি হলে রোগী এক-দুদিনের মধ্যে বাসায় চলে যেতে পারে। কিন্তু সিজারিয়ান হলে আগে-পরে মিলিয়ে রোগীকে প্রায় এক সপ্তাহ থাকতে হয়। এতে হাসপাতালের কেবিন বা বেড ভাড়া ও বিভিন্ন সার্ভিস চার্জের নামে বেশি টাকা আদায় করা সম্ভব। প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিকের দেখাদেখি বর্তমানে সরকারি ও বিভিন্ন এনজিওর হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতেও সিজারের প্রবণতা বেড়েই চলছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিজারিয়ান সেকশন একটি বিশেষ ব্যবস্থা এবং তার অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। যেহেতু এটি একটি গুরুতর অপারেশন, তাই অপারেশন চলাকালে ও পরবর্তী সময়ে জটিলতা হতে পারে। পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক অজ্ঞান করে এই অপারেশন করতে হয় বলে এনেসথেসিয়া সম্পর্কিত জটিলতাগুলো হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সিজারিয়ান সেকশনের পরে প্রসূতি মানসিক চাপ, অতৃপ্তি, বাচ্চার সঙ্গে দুর্বল সম্পর্ক ইত্যাদি সমস্যায় ভোগেন। অপারেশনের ক্ষত থেকে বন্ধ্যাত্ব এবং পরবর্তী গর্ভাবস্থায় গর্ভপাত, গর্ভফুলের অবস্থান সংক্রান্ত নানা জটিলতা এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের আশঙ্কা বেড়ে যায়। একইভাবে বেশি অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশনের সঙ্গে বেশি নবজাতক ও শিশুমৃত্যু এবং বেশি প্রি-টার্ম (সময়ের আগে জন্মানো) ডেলিভারি সম্পর্কযুক্ত। এছাড়া প্রসূতি ও পরিবারের সদস্যদের পারিবারিক, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। নরমাল ডেলিভারির চেয়ে সিজারিয়ান সেকশন অনেক বেশি ব্যয়বহুল বলেই একশ্রেণির প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডেলিভারির রোগী পেলেই তাদের নানা কৌশলে প্রভাবিত করা হয় সিজারিয়ানের জন্য। গাইনি চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. নুসরাত জাহান বলেন, পজেটিভ রোগী- যারা সত্যিকার অর্থেই নরমাল ডেলিভারি চান এবং তারাই প্রকৃতপক্ষে ভুক্তভোগী। দুঃখজনক হলেও সত্য, শহরের শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে এমন রোগীর সংখ্যা অনেক কম। এই রোগীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দালালদের খপ্পরে পড়েন এবং দালালদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে খুশি রাখতে গিয়ে এরা সিজারের মাধ্যমে বলি হন। এক্ষেত্রে ক্লিনিক এবং হাসপাতালের মালিকরা নেপথ্যের নায়ক হলেও সামনে থাকে যন্ত্রমানব ডাক্তার। খুবই আজব হলেও সত্য এ সিজার করে তারা তথাকথিত দালাল বা কোয়াকদের চেয়েও কম সম্মানী পেয়ে থাকেন। এটা অস্বীকার করা যাবে না, নরমাল ডেলিভারি আমাদের দেশে শুধু রোগীদের জন্যই ভীতিকর নয়, অনেক ডাক্তারও অ্যাভয়েড করতে চান। এর কারণ হিসেবে গাইনি চিকিৎসকরা বলছেন, বেশিরভাগ হসপিটাল বা ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারিতে অভিজ্ঞ মিড ওয়াইফ, সিস্টার নাই, ডিউটি ডাক্তার থাকে না, যার ফলে কনসালটেন্টরা তাদের রোগীদের ফলোআপ করানোর জন্য কারো ওপর ভরসা রাখতে পারেন না, যার ফলে রিস্ক না নিয়ে সিজার করেন। লেবারের সময় বাচ্চার অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য সিটিজি, ডপলার, বেডসাইড আল্ট্রাসনোগ্রামের সুবিধা না থাকা। ডেলিভারির ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রটোকল বা নীতিমালা নেই। উন্নত দেশে ডাক্তাররা নীতিমালা মেনে চিকিৎসা করার পরও যদি রোগীর কোনো সমস্যা হয়, তবে সে আইনগত জটিলতা এড়াতে পারেন, যার কারণে সেফটি নিয়ে কাজ করা সম্ভব। অন্যদিকে আমাদের দেশে রোগীর কোনো সমস্যা হলে চিকিৎসা পদ্ধতি বিশ্লেষণ না করেই যে কোনো সমস্যার দায়ভার চিকিৎসকের ওপর দেয়া হয় এবং অনেক সময় শারীরিক এবং মানসিকভাবে লাঞ্ছনার সম্মুখীন হতে হয়, ফলে অনেকেই রিস্ক নিয়ে সঠিক প্রটোকলে (নরমাল ডেলিভারি) না গিয়ে, সেফটি জোন হিসেবে সিজার করাই যুক্তিযুক্ত মনে করে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত