শিরোনাম

এক তাহমিনায় অনেক নারীর সর্বনাশ

প্রিন্ট সংস্করণ॥হাসান-উজ-জামান  |  ১৮:০৬, মার্চ ১৯, ২০১৯

তাহমিনা। পঁচিশোর্ধ্ব এক নারী। একসময় ছিলেন সৌদি প্রবাসী। কথিত আছে, তিনি চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করেছেন এক সৌদিয়ানকে। তার স্বামীর নাম আবু সাইদ। তাহমিনা কিছুদিন সৌদি আরবে অবস্থান করায় সেখান সম্পর্কে ভালোই দখল তার। দেশে ফিরে শুরু করেন প্রতারণার ব্যবসা। সৌদি আরবে লোক পাঠানোর জন্য অফিস খুলে বসেন ঢাকার বনানী থানাধীন সি-ব্লকের রাসেলপার্কের ১৩/এ হোল্ডিংস্থ চতুর্থ তলায়। তাহমিনার প্রতারণার বড় অস্ত্র তার সৌদিয়ান স্বামী। তিনি এ বিষয়টি নিজের পরিচিতদের মাঝে প্রচার করেন। নিজের নিয়োজিত দালালদেরও একই বার্তা দেন, যাতে সবাই তার উপর আস্থা রাখেন। আর এভাবেই সহজ সরল মানুষকে ফাঁদে ফেলে তাহমিনা হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় রয়েছে তার নিয়োজিত দালাল। তারাই মূলত অল্পবয়সী তরুণী ও নারীদের ঢাকায় নিয়ে আসেন। সৌদি আরবে পাঠানোর জন্য নিয়ে আসা হয় বনানী থানাধীন সি-ব্লকের রাসেলপার্কের বাড়িতে। ওই বাড়িতে চার রুমের ফ্ল্যাট রাখা আছে তাহমিনার। সেখানে দুটি রুমে রাখা হয় সৌদি গমনেচ্ছু নারীদের। তাহমিনার স্বামী সৌদিয়ান নাগরিক। যে কারণে মানুষ খুব সহজেই বিশ্বাস করেন যে, সেখানে তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। তবে মানুষের এ বিশ্বাসের সঙ্গে নারীদের জীবন নিয়ে বেঈমানি ও তামাশা করছেন তাহমিনা ও তার স্বামী। অল্প পয়সার কমিশনের দালালরাও অনেক সময় জিম্মি হয়ে পড়েন তার কাছে। তার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্তদের এক ভূক্তভোগী নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার রাবেয়া। অভাবের সংসার। এ সুযোগ কাজে লাগায় দালাল তায়েব আলী ও মোশারফ। ভালো বেতনে সৌদি আরবে চাকরির প্রলোভন দেখায় তাকে। সরল বিশ্বাসে তাতে সায় দেয় রাবেয়া। তাকে নিয়ে আসা হয় বনানীস্থ তাহমিনার অফিসে। চাহিদামতো টাকাও তুলে দেয়া হয় তাহমিনার হাতে। গত বছরের ১৬ আগস্ট বনানীর ওই অফিসের একটি কক্ষে যৌননির্যাতন করা হয় তাকে। তাহমিনার কথিত স্বামীসহ কয়েকজন এ অনৈতিক কাজে অংশ নেয়। সেখান থেকে সৌদি আরবে পাঠানো হয় ওই ভূক্তভোগীকে। সৌদিয়ান মালিক তার ওপর শুধু যৌননির্যাতনই নয়, বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার চালায়। অব্যাহত নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্বেচ্চায় পুলিশে ধরা দেন তিনি। তাকে পাঠানো হয় জেলখানায়। সেখান থেকেই বিষয়টি তার পরিবারকে জানান। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে আনার কোনো ধরনের চেষ্টা করেনি নারী পাচারকারী তাহমিনা। মাসখানেক জেল খেটে দেশে ফিরেন তিনি। তার ভাষ্য, সৌদির ওই জেলখানায় তাহমিনার মাধ্যমে পাঠানো বেশ কয়েকজন তরুণী একইভাবে জেল খাটছেন। দেশে ফিরে এ ব্যাপারে গত ১০ নভেম্বর তাহমিনা, তায়েব আলী ও মোশারফের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। (ডায়েরি নং-৪৩১)। বিষয়টির তদন্তকারী কর্মকর্তা একই থানার এসআই মিজানুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, বিষয়টি আপস মীমাংসার চেষ্টা চলছিল। এ জন্য তিনি পুরো বিষয়টি তদন্ত করেননি। সময়ও মেলেনি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান রুনা (২৫)। দালাল মোশারফ ও তৈয়ব আলীর প্ররোচণার ফাঁদে পড়েন তিনিও। নিজের ভাগ্যকে বদলাতে তাহমিনার মাধ্যমে সৌদি আরবে চলে যান। ঘটনাটি প্রায় ছয় মাস আগের। রুনার স্বজনরা জানিয়েছেন, সৌদি থেকে ফোন করে রুনা তাদের জানিয়েছেন, তার উপর চলছে নিষ্ঠুর নির্যাতন। দেশে ফিরে আসার জন্য তার আর্তনাদ সহ্য করার নয়। বিষয়টি তারা তাহমিনা ও দালালদের অবহিত করেন। কিন্তু তারা রুনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আরো টাকা দাবি করছেন। শুধু তাই নয়, এ চক্র নিয়মিত ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে। এ ব্যাপারে রুনার খালা গত ২ মার্চ বনানী থানায় একটি সাধারন ডায়েরি (নং-৯৪) করেন। বিষয়টি জানতে একাধিকবার তাহমিনাকে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এদিকে সূত্র জানিয়েছে, সরকারের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এ চক্রটি বিভিন্নভাবে সহজ সরল নারীদের প্রলোভনে ফেলে বিদেশে পাচার করছে। সেখানে ভাগ্য বদল নয়- ভাগ্য বিড়ন্বনার শিকার হচ্ছেন তারা। রাসেল পার্কের ওই বাড়িতে সৌদি গমনেচ্ছু নারীদের মেডিকেল টেস্ট ও শারীরিক ফিটনেস পরীক্ষার নামে যা করা হয়, তা প্রকাশ মতো নয় বলে জানিয়েছেন সেখানেরই সংশ্লিষ্টরা। তাহমিনা মোট কতগুলো নারী বিদেশে পাচার করেছেন তার সঠিক সংখ্যা জানা নেই কারো। তবে এ ধরনের সিন্ডিকেড রয়েছে পুরো রাজধানীজুড়ে। পল্টন ও মতিঝিল এলাকায় রয়েছে এর শক্তিশালী চক্র। যেখানে ছদ্মনামে পাসপোর্ট করে বিদেশে পাঠানোরও অভিযোগ রয়েছে। টাকার বিনিময়ে নাবালিকাদেরও ২০-২২ বছর বয়স দেখিয়ে পাসপোর্ট করানো হচ্ছে। সব কিছুই করে দেয় চক্রের সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত