শিরোনাম
জাবির ছাত্রী হলে সন্তান প্রসব

তালাবদ্ধ ট্রাঙ্কে মানবতার মৃত্যু

প্রিন্ট সংস্করণ॥হাসান-উজ-জামান  |  ০০:১৯, মার্চ ১৯, ২০১৯

উন্নয়নে এগিয়ে চলছে দেশ। বাড়ছে উচ্চ শিক্ষার হার। নারী শিক্ষা ও সমঅধিকারের প্রসার ঘটেছে ব্যাপক। শুধু বাড়েনি মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা। বরং সুশিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবে চরম অবক্ষয়ের দিকে চলে যাচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্র। মানবিক মূল্যবোধের কতটা অধঃপতন ঘটলে একজন মা তার সদ্যোজাত সন্তানকে হত্যা করতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসে তালাবদ্ধ ট্রাঙ্ক থেকে নবজাতক উদ্ধার ও তার মৃত্যুর ঘটনা প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ মহল একথা বলেন। তারা বলেন, এ ঘটনার পর আমাদের নীতি-নৈতিকতা সভ্যতার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। আরও বেশি আলোচিত ও সমালোচিত হচ্ছে যখন ওই নবজাতকের জন্মদাতা হুঙ্কার দিয়ে বলে এ ব্যাপারে কাউকে বাড়াবাড়ি না করার জন্য। তার এ হুমকির পর আইন-শৃঙ্খলার বিষয়টিও ভাবিয়ে তুলছে। তাদের দাবি— সামাজিক অবক্ষয়, ইন্টারনেটের ভয়াবহতা, মাদকের আগ্রাসন, পর্নোগ্রাফি, অবাধ মেলামেশা মূলত অনাকাক্ষিত ঘটনার জন্য দায়ী। শিশুর জন্য পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল মায়ের কোল। অথচ মা নিজেই যখন কলিজা ছেঁড়া ধনকে নিজ হাতে মেরে ফেলে তখন সমাজব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। উল্লেখ্য, শনিবার দুপুরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে গোপনে সন্তান প্রসব করেন উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের এক ছাত্রী। তিনি সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানকে ট্রাঙ্কে তালাবদ্ধ করে নিজের চিকিৎসায় চলে যান হাসপাতালে। কিছুক্ষণ পর শিশুর কান্না শুনতে পান ওই ছাত্রীর রুমমেট। তিনি বিষয়টি হল প্রশাসনকে জানান। কর্তৃপক্ষ তালা ভেঙ্গে উদ্ধার করেন নবজাতক। নিয়ে যাওয়া হয় এনাম হাসপাতালে। কিন্তু রাত পৌনে ১০টার দিকে নবজাতকটি মারা যায়। এ ঘটনায় হল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করলেও গতকাল সোমবার পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি। এ ঘটনা নিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বত্র তোলপাড় ঠিক তখনই ওই সন্তানের জন্মদাতা দাবি করেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রনি মোল্লা। তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে এ নিয়ে বাজে মন্তব্য না করার হুমকি দেন। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী, গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী মিজানুর রহমান মোল্লা আমার সংবাদকে বলেন— সর্বোচ্চ ডিগ্রি পর্যায়ের একজন ছাত্রীর এহেন গর্হিত কাজের আইনগত কোনো ব্যাখ্যায় না যাই, এটি মানবতার চূড়ান্ত বিপর্যয়। ছাত্রীটির তালাবদ্ধ ট্রাঙ্কেই মৃত্যু হলো মানবতার। আলেম সমাজ বলছেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা. শিশুদের আল্লাহ তায়ালার বাগানের সুগন্ধ ফুলের সাথে তুলনা করেছেন। অথচ যে সমাজ ও রাষ্ট্রে অবাধ প্রেমাচার, পরকীয়া, যৌনাচারের সমস্ত রুট খোলা থাকে, সেখানে তালাবদ্ধ বাক্সে নবজাতকের কান্নার বিষয়টি স্বাভাবিক! অবৈধ মেলামেশার ফলাফল নিষ্ঠুর ও বেদনাদায়কই হয়। সচেতনমহল বলেন, একটি শিশু জন্ম নেয়ার পর তার বাঁচার অধিকারটুকু রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি। সমাজ ও রাষ্ট্রে যখন আইনের শাসনের ব্যত্যয় ঘটে তখন অন্যায়, জুলুম, পাপাচারের ছড়াছড়ি দমকা হাওয়ার মতো সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে। বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও সংসদ সদস্য প্রফেসর এম মাসুদা রশীদ চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, সন্তান জন্ম দেয় মা। এ জন্য ইসলাম বলে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। সে মা যখন সন্তানকে এমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে তখন আর তাকে মা বলা চলে না। এমন এক ভয়ঙ্কর ঘটনার পর কি আর সমাজে বলা চলে— ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃকোড়ে’। কোন সমাজে আমরা বাস করছি পাপ আর অন্যায় করবে নিজেরা অথচ শাস্তি পাবে শিশু! যে সন্তান মায়ের আদর, স্নেহ আর যত্নে বেড়ে উঠবে, লেখাপড়া করবে বড় হয়ে মা-বাবার সেবা করবে আজ কোথায় সেই সমাজ, সেই মা? উল্টো সন্তানের জন্মদাতা যখন ধমক দিয়ে বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য বলে তাহলে কোথায় সে বাবার পরিচয়? শুধু শারীরিক মিলনের আনন্দে যারা দিন কাটায় তাদের সন্তান হওয়াই উচিৎ নয়। আজ এ সমাজে প্রাপ্তবয়স্করা ভুলে যাচ্ছে তাদের দায়িত্ব। তবে কতদিন করবে এসব অন্যায়? নিশ্চয় তাদের বাবা-মা সন্তানদের সুশিক্ষা দেয়নি। যে কারণে হারাতে হলো নিস্পাপ শিশুর প্রাণ। সমাজ এবং রাষ্ট্র এইসব ব্যক্তিদের এমন শাস্তি দেয়া উচিৎ যাতে আাার কোনো নারী-পুরুষ এমন দুর্ঘটনা না ঘটায়। আমরা চাই সুন্দর এক পৃথিবী যেখানে শিশুরা আনন্দে দিন কাটাবে মা-বাবার আদরে। তাহলেই গড়ে উঠবে এক সুন্দর সমাজ। এদিকে গতকাল পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছে স্থানীয় থানা। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, নবজাতক হত্যার ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হওয়ার কথা রয়েছে। শিশুর জন্মদাতা রনির সঙ্গে রয়েছে প্রভাবশালী ছাত্রনেতারা। তারা বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। তবে ওই ঘটনায় কি ধরনের মামলা হতে পারে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী এম রেজাউল ফিরোজ রিন্টু আমার সংবাদকে বলেন, এটি দণ্ডবিধি ২৯৯ ধারায় অপরাধজনিত নরহত্যা। আইনমতে, কোনো ব্যক্তি কোনো কার্য্যের সাহায্যে মৃত্যু ঘটাইতে পারে এমন সম্ভাবনা জানিয়া অনুরূপ কার্য্যের সাহায্যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটায় তখন সে ব্যক্তি অপরাধজনিত নরহত্যা করে বলে গণ্য হবে। এ ঘটনায় যিনি এবং যার প্ররোচনায় ঘটানো হয়েছে তারা সকলেই এ সংক্রান্ত অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। এ ঘটনায় দণ্ডবিধি ৩০২ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রেজাউল ফিরোজ রিন্টু আইনের বাইরে গিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বলেন, স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড জাতি প্রত্যাশা করে না। তাদের অবশ্যই নীতি-নৈতিকতা ও প্রকৃত শিক্ষার প্রতি যত্নশীল হতে হবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত