শিরোনাম

প্রার্থীকে বিনাভোটে নির্বাচিত করতে কৌশলী আ.লীগ

প্রিন্ট সংস্করণ॥রফিকুল ইসলাম  |  ০১:৪৫, মার্চ ১৬, ২০১৯

গত ১০ মার্চ প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ মধ্যদিয়ে সারাদেশে শুরু হয়েছে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনের মোট পাঁচটি ধাপের চারটিতেই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছুটা বেকায়দায় রয়েছে ক্ষমতাসীন আ.লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, বিদ্রোহীদের প্রতি নমনীয়তা দেখালেও নৌকা প্রতীকের জয় নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে কেন্দ্রীয় নেতারা। যার কারণে দলটির নৌকা প্রতীকের ১১০ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনাভোটে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এক্যফ্রন্ট নেতারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। শুধু তারাই নয়, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন আ.লীগ সরকারের অধীনে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। বিশেষ করে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও প্রথম ধাপে বেশ কয়েকটি স্থানে দলটির তৃণমূলের নেতারা অংশগ্রহণ করেন। এরপর থেকেই দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নড়েচড়ে বসেন বিএনপি নেতারা। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের জন্য ১২১ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করেন তারা। বহিষ্কারের পরবর্তিতে তারা আর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন না। ইতোমধ্যে অনেক স্থানে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানো হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কারণে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রথম থেকেই দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রতি অনেকটাই নমনীয় ভূমিকা পালন করে ক্ষমতাসীন আ.লীগ। শুধু তাই নয়, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কোনো পক্ষ না নেয়ার জন্য কেন্দ্র থেকে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের চতুর্থ ধাপের ১২২টি উপজেলায় মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল গত বুধবার। চতুর্থ ধাপের এ নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছে ৪০ জন নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী। এর আগে প্রথম ধাপের বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছেন ১৫ জন। শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে একই অবস্থা দেখায় ক্ষমতাসীন আ.লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের মাঝে। ওই দুই ধাপে ৫৫ জন প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। আ.লীগ তথ্য মতে, ক্ষমতাসীন আ.লীগ বিএনপিবিহীন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে চাইলেও ভিন্ন রূপ দেখা দিয়েছে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। তারা বলছেন, নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে কেন্দ্র থেকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপে না নিলেও স্থানীয় সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অনেক নেতারা বিদ্রোহী না করার জন্য বিভিন্ন ধরনের চেষ্টা করছেন। এমনকি স্থানীয় এমপি ও ওই সকল নেতারা প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব করে বিদ্রোহী না করার নির্দেশ দিয়েছেন। যার কারণে সাধারণ নেতারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে দূরে রয়েছেন। আর বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে এককভাবে জয়লাভ করানোর জন্য একটু ভিন্ন কৌশলেই কাজ করছে ক্ষমতাসীন আ.লীগ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা। তারা ভোটের মাঠে বিদ্রোহী প্রার্থী না রাখার ও নৌকার জয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। যার ফলে প্রথম ধাপের চেয়ে পরবর্তী ধাপগুলোতে বিনাভোটে জয়লাভ করছে অনেক প্রার্থী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আ.লীগের উপজেলা পর্যায়ের এক নেতা আমার সংবাদকে বলেন, ‘এবার উপজেলা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে প্রার্থী হওয়ার জন্য দলীয় মনোনয় ক্রয় করেছিলাম। দল আমাকে দেয়নি। , আমার এলাকার এমপি চান না আমি নৌকা প্রতীক পাই। শুধু তাই নয়, তার নিকটবর্তী আত্মীয়কে সে মনোনয়ন নিয়ে দিয়েছে। এখন সেই প্রার্থীকে জয়লাভ করার জন্য বিভিন্ন হুঁমকি-ধামকি দিয়ে আমাদের বসিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা খুব দঃখজনক।’ বিনাভোটে নির্বাচিত হচ্ছেন যারা- বাগেরহাটের ৯টি উপজেলার মধ্যে ছয়টিতে চেয়ারম্যান হতে ভোট লাগবে না নৌকার প্রার্থীর। বাকি তিনটি উপজেলায় দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে লড়বেন নৌকার প্রার্থীরা। এর মধ্যে সদরে সরদার নাসির উদ্দীন, কচুয়ায় বর্তমান চেয়ারম্যান এস এম মাহফুজুর রহমান, শরণখোলায় বর্তমান চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীন, মংলায় বর্তমান চেয়ারম্যান আবু তাহের হাওলাদার ও রামপালে মোয়াজ্জেম হোসেন শুরু থেকেই ছিলেন একক প্রার্থী। ফেনী জেলার ছয়টি উপজেলার মধ্যে চেয়ারম্যান পদে এককভাবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন পরশুরামে কামাল উদ্দিন মজুমদার, দাগনভূঞায় দিদারুল কবীর, সোনাগাজীতে জহির উদ্দিন মাহমুদ ও ছাগলনাইয়ায় মেজবাউল হায়দার চৌধুরী। প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রত্যাহারের পর ফুলগাজীর আবদুল আলিমও একক প্রার্থী। ফলে শুধু সদর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে ভোট হবে এবার। কুমিল্লার ১৩টি উপজেলার মধ্যে পাঁচটিতে নির্বাচন করার প্রয়োজন হচ্ছে না। এর মধ্যে চেয়ারম্যান প্রার্থীরা হচ্ছেন- লাকসামে মো. ইউনুস ভূঁইয়া, মনোহরগঞ্জে জাকির হোসেন, নাঙ্গলকোটে সামছুদ্দিন, দেবীদ্বারে মো. জয়নুল আবেদীন ও চৌদ্দগ্রামে মো. আবদুস ছোবহান ভূঁইয়া। ময়মনসিং জেলাতেও একই অবস্থা দেখা দিয়েছে। জেলাটির সদর উপজেলায় আশরাফ হোসাইন, গফরগাঁওয়ে আশরাফ উদ্দিন ও ফুলবাড়িয়ায় আবদুল মালেক সরকারের ভোট লাগবে না চেয়ারম্যান হতে। যশোর জেলার শার্শা উপজেলা থেকে বিনাভোটে নির্বাচিত হতে যাচ্ছে সিরাজুল হক। একই অবস্থা জেলার সদর উপজেলার। প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর একক প্রার্থী শাহীন চাকলাদার। ভোলা সদরে মোশারেফ হোসেন, মনপুরায় শেলিনা আকতার চৌধুরী, দৌলতখানে মনজুরুল আলম খান একক প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। পিরোজপুর জেলায় ভাণ্ডারিয়ায় মিরাজুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মো. রাশেদুল কাওছার ভূঁইয়া ও আখাউড়ায় আবুল কাশেম ভূঁইয়া, ঢাকার সাভারে মঞ্জুরুল আলম, দোহারে মো. আলমগীর হোসেন ও কেরানীগঞ্জে বর্তমান চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ, খুলনার বটিয়াঘাটায় বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল আলম খান ও ফুলতলীতে শেখ আকরাম হোসেন, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে হারুন-অর রশীদ, মধুপুরে সরোয়ার আলম খান ও গোপালপুরে ইউনুস ইসলাম তালুকদার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন। শুধু এই ধাপগুলোই নয়, প্রথম ধাপেও বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছে অনেকে। তবে প্রথম ধাপের চেয়ে বাকি ধাপগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক আমার সংবাদকে বলেন, ‘বিএনপি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার কারণে তৃণমূলের অনেক নেতা নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। যে কোনো নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী করার কোনো সুযোগ নেই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা কেন্দ্রের শক্তি দেখিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আ.লীগ কঠোর অবস্থান নেবে। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, এবার ৪৮১টি উপজেলায় মোট পাঁচ ধাপে নির্বাচন হচ্ছে। প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১০ মার্চ। দ্বিতীয় ধাপে ভোট ১৮ মার্চ, তৃতীয় ধাপে ২৪ মার্চ এবং চতুর্থ ধাপে ৩১ মার্চ। এ ছাড়া পঞ্চম ধাপের ভোট গ্রহণ করা হতে পারে পবিত্র রমজানের পর।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত