শিরোনাম

নদীপাড় থেকে সরছে ৪৫ ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

প্রিন্ট সংস্করণ॥নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০১:১৭, মার্চ ১৬, ২০১৯

ঢাকার চারদিকে নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। দ্বিতীয় দফা অভিযানের ৯ দিন পর অর্ধশতাধিক ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেবে বিআইডব্লিউটিএ। এ জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়রের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকসহ বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। এই কমিটির পরামর্শে দ্রুত কাজ শুরু হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। জানা যায়, ঢাকার চারপাশে পাকা-আধাপাকা ৪৫টি ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিন-চারতলা মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, মাজার, মন্দির ও স্নানঘাট রয়েছে। এ ছাড়া অননুমোদিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিচতলায় দোকান ও গুদাম ভাড়া দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নদী দখল করে এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রভাবশালীরা নদীর তীর ভরাট করে ফেলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নদীর রক্ষা ও সীমানা পিলার স্থাপনে ৮৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এ জন্য নদী দূষণ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। এ বিষয়ে নৌ-প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ঢাকার আদি বুড়িগঙ্গা এখন আর নদী নয়, এটা একটি আদি বুড়িগঙ্গা এলাকায় পরিণত হয়েছে। নদী দখল করে তৈরি হয়েছে বিশাল অট্টালিকা, মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দখলদার যত বড় প্রভাবশালী হোক না কেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অব্যাহত থাকবে।বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, ঢাকা নদীবন্দরের বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর তীরে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ২৫টি, আদি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে রয়েছে ছয়টি, টঙ্গী এলাকায় তুরাগ নদীর তীরে রয়েছে সাতটি এবং নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে রয়েছে সাতটি অবৈধ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ঢাকার শ্যামপুরে দোতলা ‘মসজিদে নূর মোহাম্মদীয়া’, সূত্রাপুরে একতলা ‘দয়ালবাবা হজরত গঙ্গা শাহ (রাহ.) নুরানী গায়েবি বাবা দরবার শরিফ’ ও উল্টিগঞ্জ এলাকায় তিনতলা ‘উল্টিগঞ্জ জামে মসজিদ ও মাজার’, শ্যামবাজারে তিনতলা ‘শ্যামবাজার জামে মসজিদ’। এই মসজিদের নিচতলায় একটি পানের দোকান ও আন্ডারগ্রাউন্ডে কাঁচামালের গুদাম ভাড়া দেয়া হয়। এ ছাড়া সদরঘাট এলাকায় সাড়ে চারতলা ‘বায়তুল নাজাত জামে মসজিদ এবং সদরঘাট ছিন্নমূল এতিমখানা’। এই মসজিদের নিচতলায় ২১টি পাকা দোকান ভাড়া দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কোতোয়ালি এলাকায় নদীর তীরে অননুমোদিতভাবে গড়ে উঠেছে ‘বিনা স্মৃতি স্নানঘাট’। কেরানীগঞ্জের মান্দাইল এলাকায় দোতলা ‘মান্দাইল জামে মসজিদ’, খয়েজ নগরে একতলা ‘খয়েজ নগর শাহী জামে মসজিদ’, কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া লঞ্চঘাট এলাকায় দোতলা ‘খোলামোড়া ঘাট জামে মসজিদ ও খোলামোড়া মহিলা মাদ্রাসা’, কামরাঙ্গীরচরের বরিশুরঘাট এলাকায় দোতলা ‘বায়তুন নূর জামে মসজিদ’, কামরাঙ্গীরচরের নিজামবাগ এলাকায় দোতলা ‘জামিয়া তালবিয়া আশ্রাফুল উলুম মাদ্রাসা’, কামরাঙ্গীরচরের আশ্রাফাবাদ এলাকায় একতলা ‘বাইতুল নূর জামে মসজিদ’, আশ্রাফাবাদ এলাকায় একতলা ‘বাইতুল হোসনা জামে মসজিদ’, কামরাঙ্গীরচরের নবাবচর এলাকায় দোতলা ‘নূর এতিমখানা ও মাদ্রাসা’, কামরাঙ্গীরচরের মাদবরপাড়া এলাকায় একতলা ‘বুড়িগঙ্গা গণপাঠাগার সমাজকল্যাণ সংস্থা’, পূর্ব কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ এলাকায় একতলা সেমি পাকা ‘মুসলিমবাগ টাওয়ার জামে মসজিদ’, কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ এলাকায় পাকা ‘মুসলিমবাগ মৃত ব্যক্তির গোসলের স্থান’, কামরাঙ্গীরচরের বেড়িবাঁধের নূরবাগ এলাকায় দোতলা ‘বাইতুর রহমান জামে মসজিদ’, কামরাঙ্গীরচরের লালগুদাম এলাকায় তিনতলা ‘আল-আকসা জামে মসজিদ’, কামরাঙ্গীরচরে কয়লাঘাট এলাকায় একতলা জামে মসজিদ, আশ্রাফাবাদ এলাকায় দোতলা নুরজাহান জামে মসজিদ, মিরপুরের ব্রিজঘাট এলাকায় শাহী জামে মসজিদ, বড়বাজার এলাকায় চারতলা বড়বাজার জামে মসজিদ, দোতলা বড়বাজার মসজিদ, দারুস সালাম এলাকায় দোতলা জাহানাবাদ বাইতুল রহমান জামে মসজিদ গড়ে উঠেছে। এদিকে লালবাগের ইসলামবাগে চারতলা জান্নাতুল বাকি জামে মসজিদ, শহীদনগর বেড়িবাঁধ এলাকায় আধা পাকা জান্নাতুল মাওয়া জামে মসজিদ, হাজারীবাগ এলাকায় আধা পাকা ‘আ. রহিম চিশতি দরবার শরিফ’, ইসলামবাগের খলিফাঘাট এলাকায় চন্দ্রপাড়া খানকা শরিফ, আবদুল্লাপুর এলাকায় একতলা বায়তুল নূর জামে মসজিদ, টঙ্গীবাজারে দুটি পাকা বিল্ডিংয়ে টঙ্গীবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, ঢাকার দক্ষিণখানের একতলা বায়তুন নূর জামে মসজিদ, উত্তর খানের গুদারঘাট এলাকায় একতলা মসজিদুল হুদা, খিলক্ষেত পাতিরা এলাকায় একতলা পাতিরা ঋষিপাড়া কালীমন্দির, খিলক্ষেতের ডেলনা এলাকায় একতলা ডেলনা এতিমখানা ও ইসলামীয়া মাদ্রাসা, কায়েতপাড়া বাউলের বাজারে একতলা সুধারাম বাউল সেবাশ্রম গড়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ বন্দরে আধাপাকা গাউসুল আজম জামে মসজিদ, সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলোগেট এলাকায় আধাপাকা পাঁচতারা জুনিয়র হাইস্কুল, সিদ্ধিরগঞ্জের শ্মশানঘাট এলাকায় একতলা কালী-শিবমন্দির, সিদ্ধিরগঞ্জের কাঁচপুর ল্যান্ডিং স্টেশন এলাকায় টিনশেড ঘরে পাঞ্জেগানা নামাজ ঘর, রূপগঞ্জের রূপসী এলাকায় একতলা পাকা দক্ষিণ রূপসী বায়তুল আনাম জামে মসজিদ, রূপগঞ্জ এলাকায় একতলা পাকা হযরত পাঁচপীর শাহ দরগাহ শরিফ, চানপাড়া এলাকায় গড়ে উঠেছে দোতলা মেসের পাগলের মাজার। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ অংশ নদীর তীর দখল করে তৈরি করা হয়েছে। তাই নদীর সীমানা পিলারের ভিতরে যতটুকু অংশ পড়বে, তা উচ্ছেদ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানান্তর করা হবে বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়।জানা গেছে, রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকার চারপাশের নৌ-পথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বৃত্তাকার নৌ-পথ খননের প্রকল্প নেয়া হয় ২০০০ সালে। দুই দফা খনন কাজ শেষে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয় এই প্রকল্পের কাজ। ৯০ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১০ কিলোমিটার নৌ-পথ খনন করে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীর অবৈধ দখল ও দূষণের কারণে আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে এই নৌ-পথটি। এ ছাড়া নদীর উপরে নির্মিত সড়ক ও রেলপথে ১০টি সেতুর উচ্চতা কম থাকায় এর নিচ দিয়ে পণ্য ও যাত্রীবাহী কোনো নৌযান চলাচল করতে পারে না। বৃত্তকার এই নৌ-পথের মধ্যে ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ-সদরঘাট পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার হলো দ্বিতীয় শ্রেণির নৌ-পথ। এ ছাড়া সদরঘাট-মিরপুর-টঙ্গী-ডেমরা পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার হলো তৃতীয় শ্রেণির নৌ-পথ। এই তৃতীয় শ্রেণির নৌ-পথের ওপর বিদ্যমান সড়ক ও রেলপথে মোট ১৫টি সেতু রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি সেতুর উচ্চতা নদীর পানির স্তর থেকে খুবই কম। এই সেতুগুলোর মধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) চারটি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তর (এলজিইডি) চারটি ও রেলওয়ের দুটি সেতু রয়েছে বলে অভ্যন্তরীণ নৌ-কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র জানায়। তবে ঢাকার চারপাশের নৌ-পথ উদ্ধারে আবার সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান কমোডর এম. মোজাম্মেল হক বলেন, নদী দূষণ ও দখলদার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। দখলদার যত শক্তিশালী হোক না কেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। চারটি নদীর তীর উচ্ছেদ করে সীমানা পুনরায় নির্ধারণ করা হবে। এর জন্য ১০ হাজার সীমানা পিলার স্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে নদীর রক্ষা ও সীমানা পিলার স্থাপন বিষয়ে ৮৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে পরিকল্পনা কমিশন। এই প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে দুই বছর। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ৫০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া তিনটি ইকোপার্ক ও ২০টি জেটি নির্মাণ করা হবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত