গ্যাসের দাম বাড়লে কঠিন হবে জীবনযাত্রা

প্রিন্ট সংস্করণ॥বিশেষ প্রতিবেদক  |  ০০:৩৭, মার্চ ১৫, ২০১৯

নতুন বছরের শুরুতে একদফা বাসাভাড়া বেড়েছে। সরকার গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়ায় ফের বাসাভাড়াসহ অন্যান্য খরচ বাড়ার আশঙ্কা করছেন ঢাকাসহ সারা দেশের ভাড়াটিয়ারা। গ্যাসের দাম বাড়লে বাড়বে পরিবহণ খরচও। এর প্রভাব পড়বে বাজারের ওপরও।জানা গেছে, বাড়িভাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল সংযুক্ত রয়েছে, এমন ভাড়াটিয়াদের বলে দেওয়া হয়েছে, সরকার গ্যাসের দাম বাড়ালে তাদেরও ভাড়ার সঙ্গেই বাড়তি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রভাব বাসাভাড়া ও পরিবহণ খরচ এবং বাজারের ওপর পড়বে বলে মনে করছে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। তাই অযৌক্তিকভাবে গ্যাসের দাম না বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। ভাড়াটিয়ারা বলছেন, রাজধানী ঢাকা এমনিতেই একটি ব্যয়বহুল শহর। খুবই সাধারণ জীবনযাপনে হিমশিম খেতে হচ্ছে ঢাকায় বসবাসকারী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের। মাসের শুরুতেই আয়-রোজগারের অর্ধেকটা ভাড়া বাবদ খরচ হয়ে যায়। এছাড়া নিত্যপণ্যের দামও আকাশছোঁয়া। এ অবস্থায় বাড়তি ভাড়া পরিশোধ আর্থিক চাপ বাড়াবে। আরো কঠিন করে তুলবে জীবনযাপন।জীবনযাত্রার সব ব্যয়ের সঙ্গে আবাসন খাতে দফায় দফায় ব্যয় বাড়ানোর কারণে বিপাকে পড়ছেন লাখ লাখ ভাড়াটিয়া। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে দেশে সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও এর প্রয়োগ না থাকায় বাড়িওয়ালারা তাদের খেয়াল খুশিমতো ভাড়া নির্ধারণ করছেন।বাংলাদেশ হাউজ অ্যান্ড ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, সরকার নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে পারছে না, তাহলে দাম বাড়াবেন কেন? দুর্নীতি ছাড়া গ্যাসের কোনো কাজ হয় না। এই দুর্নীতি বন্ধ করতে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। আর গ্যাসের দাম বাড়লে সেই বাড়তি টাকা বাড়িওয়ালারা দেবে না নিশ্চয়? তাদের তো ভাড়া সমন্বয় করতেই হবে।কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত জরিপ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকা মহানগরীর ৭০ শতাংশ মানুষই তাদের মোট আয়ের কমপক্ষে ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া খাতে ব্যয় করেন। এ অবস্থায় নতুন করে আবার ভাড়াসহ জীবনযাত্রার সব ব্যয় বাড়লে নগরবাসীর জন্য তা মরণদশা হবে বলেও তারা মনে করেন।বাড়িওয়ালারা সাধারণত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, হাউজ বিল্ডিংয়ের ঋণের প্রদেয় অর্থ, সিটি কর্পোরেশনের কর, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানিসহ পরিষেবা খাতের বিল বৃদ্ধির অজুহাতে ভাড়া বাড়িয়ে থাকে। তবে পরিষেবার খরচ বা কর যতটুকু বাড়ে, ভাড়া তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বাড়ানো হয়। এক্ষেত্রে ভাড়াটিয়াদের আয় বাড়ার প্রশ্নটি থাকে উপেক্ষিত।বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে এলাকাভেদে বাড়িভাড়ার ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। উত্তরার কম ঘনবসতিপূর্ণ পর্যাপ্ত পরিষেবাপ্রাপ্ত এলাকায় বাড়িভাড়া তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পরিষেবা অপর্যাপ্ত হলেও ভাড়া বেশি। বাড়ির আয়তন ও প্রাপ্ত পরিষেবার ভিত্তিতে ভাড়াটেদের আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাজধানীর বাড়িভাড়াসংক্রান্ত নীতিমালা সরকারের অবিলম্বে নির্ধারণ করা উচিত।ক্যাবের তথ্যমতে, গত ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৪০০ শতাংশের বেশি। ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ভাড়া বেড়েছে ২৭৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে বেড়েছে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০০০ সালে এ বাড়ার হার ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০০৩ সালে বেড়েছিল ১৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। ২০০৫ সালে বাড়ে ২০ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০০৬-২০০৮ পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ে। ২০০৬ সাল থেকে গত ১০ বছরে ভাড়া বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।ক্যাবের আরেক গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানীতে ১৯৯০ সালে পাকা ভবনে দুই কক্ষের একটি বাসার ভাড়া ছিল ২ হাজার ৯৪২ টাকা। ২০১৫ সালে সেই ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ১৫০ টাকা। বর্তমানে এই ভাড়া এসে ঠেকেছে ২১ হাজার ৩৪০ টাকায়।বিভিন্ন গবেষণায় রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়ে যাওয়ার দুটি মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকা এবং চাহিদার তুলনায় ভাড়া বাড়ির সংখ্যা কম থাকা। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের হিসাবে ঢাকায় বাড়িঘরের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এর সঙ্গে প্রতি বছর প্রায় ৮ হাজার করে নতুন বাড়ি যোগ হচ্ছে। রাজধানীতে প্রতি বছর আবাসন সুবিধা বাড়লেও এখানকার জনসংখ্যা বাড়ছে তার চেয়ে বেশি হারে।ভাড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ড নামে সরকারের একটি বিভাগ থাকলেও এর কোনো কার্যকারিতা নেই। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১’ এবং ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৬৪’ শীর্ষক দুটি আইন বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু কোনো বাড়িওয়ালাই এ আইন মানেন না বলে ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ। অর্থের বিনিময়ে সব রকম প্রাতিষ্ঠানিক সনদ ও অনুমতি সহজলভ্য বলে অধিকাংশ বাড়িওয়ালা এসব আইনের বিষয়ে আগ্রহী নয়। একইসঙ্গে ভাড়াটিয়াদের অজ্ঞতার কারণে আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না।উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১ জুলাই বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের সার্বিক সমস্যা নিরসনে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ওই রায়ে বলা হয়, কমিশন সুপারিশ না করা পর্যন্ত ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী সরকারের আর্থিক সক্ষমতাসাপেক্ষে প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়িভাড়া-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একজন করে নিয়ন্ত্রক, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক ও উপনিয়ন্ত্রক নিয়োগের উদ্যোগ নেবে।রায়ে আরও বলা হয়, এটি পরিষ্কার যে, নাগরিকদের জীবন ধারণে অন্যান্য মৌলিক উপকরণের মতো আবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। যে কারণে আবাসন ব্যবস্থাকে একটি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় ছেড়ে না দিয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণমূলক আইনিব্যবস্থায় নেয়া প্রয়োজন।