শিরোনাম

গা শিউরে ওঠার মতো স্বর্ণ পাচারকারীদের কৌশল

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০৫:০৪, মার্চ ১৪, ২০১৯

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মাঝে মধ্যে ধরা পড়ছে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণের বার। এসব স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় মামলাও হচ্ছে। আবার ধরা পড়ছে স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সদস্যরা। আবার দ্রুতই জামিনে বের হচ্ছেন। ফলে চক্রগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অব্যাহত অভিযানেও স্বর্ণ চোরাচালান বন্ধ হচ্ছে না। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির তোয়াক্কাই করছে না। সোনা পাচারের অংশ হিসেবে চক্রটি বেছে নিচ্ছে অভিনব ও অদ্ভূত সব কৌশল। আর কৌশলের অনেকগুলোই গা শিউরে ওঠার মতো। এসব পাচারকৃত স্বর্ণের অধিকাংশই ভারতে পাচার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।সূত্র জানায়, চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নেই, আর দায়েরকৃত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দীর্ঘদিন চলে যাচ্ছে। ফলে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা আদালতের মাধ্যমে জামিনে এসে পুনরায় স্বর্ণ পাচারে জড়িয়ে পড়ছে। গতকাল বুধবার সকালেও বিমানবন্দরে সোলার সিস্টেমের ভেতর থেকে সাড়ে পাঁচ কেজি স্বর্ণসহ চেন জিফা (২৯) ও ডিং শোসেং (৩৫) নামে চীনের দুই নাগরিককে আটক করে কাস্টমস। তারা সোলার সিস্টেমের ভেতরে কৌশলে স্বর্ণের বার পাচারের চেষ্টা করে। তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে আসা এয়ার এরাবিয়ার ফ্লাইটে শাহজালালে নামেন। এ সময় বিমানবন্দরের গ্রিন চ্যানেল অতিক্রমের কাস্টমস কর্মকর্তারা সন্দেহ করেন। পরে লাগেজের ভেতরে সোলারের ব্যাটারি থেকে ১০ তোলা ওজনের ২৪ করে মোট ৪৮টি স্বর্ণবার পাওয়া যায়। এর দাম দুই কোটি ৭৯ লাখ টাকা হবে বলে ঢাকা কাস্টমস হাউজের ডেপুটি কমিশনার অথেলো চৌধুরী জানিয়েছেন। এর আগে গত ১১ মার্চ বিমানবন্দরে চট্টগ্রাম থেকে আসা বিজি-১২৮ বিমানের বাথরুম থেকে সোয়া ১২ কেজি স্বর্ণ জব্দ করে ঢাকা কাস্টমস হাউস। আর গত ৬ মার্চ শাহজালাল বিমানবন্দরে কুয়ালালামপুর থেকে ফেরার সময় দুই যাত্রীর জুতার সোলে লুকিয়ে রাখা অবস্থয় ২৪ টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক স্বণ চোরাকারবারী চক্রের সদস্যরা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও দুবাই থেকে সোনার চালান এনে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার করছে। এই স্বর্ণ চোরাকারবাসি চক্রের সদস্য আমিরুল ইসলাম (২৭) প্রায় সাড়ে চার কেজি সোনাসহ বিমানবন্দরে ধরা পড়ে। তার বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়। ওই মামলায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃত স্বর্ণগুলো তার ভগ্নিপতি ফরিদ আহমেদ মিনার বলে তিনি স্বীকারোক্তি দেন। তার নির্দেশেই কয়েক দফায় সোনার চালান এনে তিনি ভারতে পাচার করেছেন। ওই মামলায় পুলিশ ফরিদ মিনা ওরফে ধলা ও তার শ্যালক আমিরুল ইসলামকে আসামি করে চোরকারবারি অভিযোগে বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা করা হয়। মামলা নম্বর ৮২(৭) ২০১৪। আর উদ্ধারকৃত আটটি সোনার বারের ওজন ছিল ৪ দশমিক ৩৯৫ কেজি। বিমানবন্দর কাস্টমস হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রাপাচারকারী দলের অন্যতম সদস্য ফরিদ ওরফে মিনা সোনা পাচারকারী দলেরও অন্যতম গডফাদার। তিনি গত ২০১০ সাল থেকে সোনা ও মুদ্রা পাচারে জড়িত। রাজধানী ঢাকায় তিনি একাধিক ঠিকানা ব্যবহার করতেন। আর তার বাড়ি গোপালগঞ্জর জেলার মুকসেদপুরে। তার বাবার নাম সোলায়মান মিনা বলে জানা গেছে। মামলার সূত্রে জানা গেছে, স্বর্ণ পাচারকারীদের গডফাদার ফরিদ ওরফে মিনার পাচারকারী চক্রের সদস্যদের মধ্যে আবু বকর মিনা ওরফে আবু (৫৮) ও আবুল হাসান মিনা (৪৭) অন্যতম। তারা মূলত সোনা ও মুদ্রা পাচারকারীদের ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করে থাকে। পুলিশের সঙ্গে ফরিদ মিনার চোরাচালানের দ্রব্য ছাড়িয়ে নেয়া ও দেন দরবারের কাজ করে পুলিশের এক সদস্য। আর সোনা চোরাচালানে ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করে মুকসুদপুরের নুমান মিনা (৩৬), হাফিজুর শেখ (৩৫), মামুন সিকাদার (৩২), সালাহউদ্দিন মিনা (২৮), সৌরভ মিনা (২৭), ইকবাল শেখ (৩২) ও আবুল হোসেন ওরফে উলু। রোমান সম্পর্কে গডফাদার ফরিদের ভাগ্নে। এদের মধ্যে সৌরভ মিনা থাইল্যান্ড থেকে পায়ুপথে সোনা বহন করে আনার সময় বিমানবন্দর কাষ্টমস কর্মকর্তাদের হাতে গ্রেপ্তার হন। বিমান বন্দর কাস্টমস হাউসের একজন কর্মকর্তা জানান, এরা সবাই ফ্রিকুয়েন্ট ট্রাভেলার। বিদেশ গিয়ে সোনা দেশে এনে ভারতে পাচার করাই তাদের অন্যতম পেশা। এদের পাসপোর্ট যাচাই করলে সোনা ও মুদ্রা চোরাচালানের আরও অনেক তথ্য পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এই প্রতারকচক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ খুঁজছে বলে জানা গেছে। এ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মোকসেদপুরের বাসিন্দা শেখ রনি আহমেদ নামে এক ব্যক্তি উপজেলা চেয়্যারম্যান বরাবর অভিযোগ দিয়েছিলেন। ওই অভিযোগে বলা হয়েছে- ফরিদ মিনা রনির মালিনাকানাধীন ট্রাভেল এজেন্সির কর্মচারী ছিলেন। শুরু থেকেই তার স্বভাব চরিত্র ভালো ছিল না। তিনি ছোটখাটো চুরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত ২০১০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ফরিদ মিনা সাত-আট জনের একটি দল রনি ও তার ভাগ্নেকে মারধর করে ধনমন্ডি এলাকা থেকে নগদ ৩০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় একই বছরের ৬ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় মামলা করা হয়। ওই মামলার পর ফরিদ মিনা ও তার ভাই রনির বিরুদ্ধে নানাভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এসব প্রতারক ও চোরাচালানী চক্র পুলিশ, র্যাব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও দুদকসহ বিভিন্ন স্থানে বেনামে অভিযোগ করে। শুধু তাই নয়, ব্যবসায়ী রনির পরিবারকে হত্যার ষড়যন্ত্র হিসেবে ২০১৬ সালের কোরবানির ঈদের পর দিন বিদ্যুতের মেইন তার থেকে সংযোগ এসে বাড়ির ওঠান ও ঘরে দিয়ে রাখে। এসব অভিযোগ তদন্ত করেন ডিবির সাবেক যুগ্ম কমিশনার।অভিযোগের তদন্তকারি ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, আবু বকর মিনা ওরফে আবু, ফরিদ মিনা ওরফে ধলা ছিনতাইকারী ও প্রতারক চক্রের সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় ছিনতাই মামলা (নম্বর ৭৫(৯)০৭ রয়েছে। ধলা ও তার শ্যালক আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে চোরকারবারী হিসেবে বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা রয়েছে। যার নম্বর ৮২(৭) ২০১৪। ওই মামলার প্রধান আসামি আমিরুল ইসলামের কাছে আটটি সোনার বার উদ্ধার হয় যার ওজন ছিল ৪ দশমিক ৩৯৫ কেজি। তাদের বিরুদ্ধে মুকসুদ পুর থানায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মামলা রয়েছে। যার নম্বর ৫(০২) ২০১৭। এ ছাড়া আবু বকর মিনার মামাতো ভাই ঢাকার শ্যামপুরের কুখ্যাত সন্ত্রাসী নাছির শেখ গুলি করে ও ককটেল ফাটিয়ে মিরহাজিরবাগের জনৈক ব্যবসায়ী জামাল মিনাকে হত্যার চেষ্টা করে। ওই ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। যার নম্বর ০৮(৫)১২। আর কুমিল্লার মুরাদনগর থানায় একটি প্রতারণনার মামলায় এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয় নাসির শেখের। মুকসুদপুর থানায় জিআর মামলায় তাদেরকে ডাকাত দলের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন থানায় তাদের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি মামলা ও জিডি রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ফরিদ মিনা ও আবু বকর মিনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত