শিরোনাম

কার্যক্রম চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ  |  ০১:০৫, মার্চ ১৪, ২০১৯

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত সমবায় সমিতিভিত্তিক একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিকল্পনা। যার লক্ষ্য হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জন্য তহবিল সৃজন এবং ওই তহবিল পারিবারিক খামারে বিনিয়োগপূর্বক স্থায়ীভাবে আয় সৃজনের মাধ্যমে টেকসই দারিদ্র্যবিমোচন। জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনায় অবদান রাখা। ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে একনেকের অনুমতিক্রমে প্রকল্পটি শুরু হয়। শুরুর দিকে প্রকল্পটি ব্যাপক সাড়া পেলেও বর্তমানে তার কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে শীতলতা। দারিদ্র্যবিমোচন স্বপ্ন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে নেয়া এই ক্ষুদ্র সঞ্চয় মডেলের প্রকল্প এখন চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। মাঠপর্যায়ে আলোচনা করে দেখা যায়, মাঠে যেমন রয়েছে সমন্বয়হীনতা তেমনি রয়েছে জনবলের অভাব। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ৪০ হাজার ৫২৭টি সমিতি রয়েছে। যার অধিকাংশেই সমন্বয়হীনতা রয়েছে। নিয়মিত উঠান বৈঠক হচ্ছে না। এছাড়াও দিন দিন ঋণখেলাপি বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে কোনোভাবেই এ প্রকল্পের লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব না। গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জন্য এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগের প্রথম প্রকল্প। এ প্রকল্প যদি সফলতার মুখ না দেখে তাহলে অন্য প্রকল্পের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন অনেকে। বর্তমানে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঝুঁকিগুলো হচ্ছে- ঋণখেলাপি বৃদ্ধি, ঋণের সঠিক ব্যবহার না হওয়া, ঋণের সীমাবদ্ধতা, ঋণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা, ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন, ঋণ ফেরত না পাওয়া, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এছাড়া নানা দুর্বলতার কারণে প্রকল্পটি মুখথুবড়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে প্রকল্পের পরিচালক আকবর হোসেন আমার সংবাদকে জানান, দারিদ্র্যবিমোচনে জাতীয়ভাবে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, আমরা সেখানে অবদান রাখতে চাই। তবে দরিদ্রতার হার শতকরা ১০-এ নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না। হয়তবা শতকরা ১৫-এ তে নামার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে জনবল সমস্যা রয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ মাঠ সহকারী দরকার তা বর্তমানে নেই। ৮ হাজার ৯৪১ জন মাঠ সহকারীর মধ্যে বর্তমানে ৩ হাজার ২০০ জন রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে আশা প্রকাশ করেন, এ মাসের মধ্যে সমস্ত মাঠ সহকারী নিয়োগ দিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম যথারীতি চলবে। অন্যদিকে প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক। তাদের ব্যাপারে মাঠ থেকে অভিযোগ রয়েছে- তারা অনলাইন লেনদেন ও ঋণ বন্ধ করে দিয়েছে। তবে অভিযোগটিকে পুরো অস্বীকার করেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, কার্যক্রম যথারীতি চলছে। কোনো সমস্যা নেই। অনলাইনে লেনদেন যেমন চলছে তেমনি ঋণও প্রদান করা হচ্ছে। সদস্যদের স্বার্থে ১৬টি বেসরকারি ব্যাংকে প্রকল্পের টাকা রাখা হয়েছে। শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেই বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। এসডিজি ২০৩০ ও উন্নত বাংলাদেশ ২০৪১- দুটোই নির্ভর করছে সরকারের বিশেষ বিশেষ প্রকল্প ও কর্মসূচির ওপর। সাথে ব্যাংকিং খাতের সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি দূরীকরণ। শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ-১ হচ্ছে- একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, যার সাথে সম্পৃক্ত পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক। দেশে প্রথম সরকারি সহায়তায় দরিদ্র মানুষের স্থায়ী তহবিল গড়ে দেয়া। এটি প্রচলিত মাইক্রোফিন্যান্সিংয়ের উন্নত এক নতুন অধ্যায়। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সরকারের ১৪৬টি প্রকল্প রয়েছে। যার জন্য সরকারের বাজেট রয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। যার মাধ্যমে দরিদ্র জণগোষ্ঠীকে একটি সুন্দর জায়গায় পৌঁছানোর মাধ্যমে উন্নত দেশ হিসেবে গড়তে চান বাংলাদেশকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রকল্পটি দেশব্যাপী ৪ হাজার ৫০০ ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে একটি করে মোট ১ লাখ সমিতির ৬০ লাখ হতদরিদ্র ও দরিদ্র পরিবার নিয়ে কাজ করছে। এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, দরিদ্র জনগণ মাসে ২০০ টাকা সঞ্চয় করলে সরকার ২০০ টাকা বোনাস দেয় এবং ৬০ জনের একটি সমিতিতে বছরে অতিরিক্ত দেড় লাখ টাকা ঘূর্ণায়মান তহবিল দেয়। এভাবে একটি সমিতিতে বছরে প্রায় ৪.৫ লাখ টাকার তহবিল, যা দুই বছরে প্রায় ৯ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। এসবই সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অনুদানের টাকা। ২০১৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত ৪০ হাজার সমিতির মোট মূলধন গড়ে ওঠে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা যার মধ্যে সদস্যদের ১৫৫০ কোটি এবং সরকার দিয়েছে ৪ হাজার কোটি; যাতে যোগ হয়েছে নিজেদের দেয়া ৮ শতাংশ সার্ভিস চার্জ ও ব্যাংক সুদ। এ অর্থ দরিদ্র জনগোষ্ঠী উঠান বৈঠকে বসে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ছোট ছোট ৩১ লাখ পারিবারিক খামার গড়ে তোলে এবং কিস্তিতে কিস্তিতে তা পরিশোধ করে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুদ্র সঞ্চয় মডেলের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- ৬০ জন সদস্যের ৪০ জনই নারী। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- গরিবের এ আর্থিক লেনদেন স্বচ্ছতার সাথে নিশ্চিত হয় উঠান বৈঠকে বসে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এ তহবিল উপকারভোগীদের গ্রাম উন্নয়ন সংগঠনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থাকে অর্থাৎ তহবিল স্থায়ী, প্রয়োজন শুধু স্থায়ী বিনিয়োগ, যার মাধ্যমে স্থায়ী আয় ও স্থায়ী দারিদ্র্যবিমোচন ঘটবে। প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ৮ হাজার কোটি টাকা টার্গেট গ্রুপ ৬০ লাখ পরিবার বা ৩ কোটি দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষ। কাজেই বলা যায়, এ প্রকল্পের ক্ষুদ্র সঞ্চয় মডেলের সঠিক বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকল্পের উদ্যোগটি ভালো যদি সেটাকে প্রপারলি এগিয়ে নেয়া যায়, তাহলে দরিদ্র মানুষের মাঝে একটা ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। প্রকল্প পরিচালকের সাথে কথা বলে জানা যায়, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শেষ হবে না। এর মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর জন্য তারা আবেদন করবেন। অর্থাৎ ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করতে চান প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা। তবে এই সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির অর্জন কতটুকু হবে সেটাই এখন সবার কাছে প্রশ্ন। তবে এখনো যে সময় রয়েছে সরকার ভালোভাবে হস্তক্ষেপ করলে পুরোপুরি অর্জন সম্ভব বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত