শিরোনাম

মশক নিধনে ব্যর্থ সব উদ্যোগ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম  |  ০১:০৩, মার্চ ১৪, ২০১৯

মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনের নানা উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে। মশার যন্ত্রণায় নগরবাসী অতিষ্ঠ। অথচ দুভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই মশার কামড় থেকে জনগণকে রেহাই দেয়া সম্ভব বলে মনে করছেন নগরবাসী। তাদের মতে, ফগার মেশিনের ব্যবহার, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম, জনসচেতনতা এবং লিফলেট বিতরণ না করে সিটি কর্পোরেশনের জলাশয় পরিষ্কার এবং সকালে মশার লার্ভা মারতে তরল ওষুধ ছিটালেই মশা নিয়ন্ত্রণে আসবে। এসব কথার সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হাসান কিছুটা একমত পোষণ করে আমার সংবাদকে বলেন, উড়ন্ত মশা মারতে বিকেলে ফগার মেশিন ওষুধ ছিটানো তেমনটি কার্যকর নয়। তবে মশার লার্ভা ও জলাশয়গুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু জলাশয় পরিষ্কারের পর পুরো বছর মনিটরিং সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার উপদ্রব ঠেকাতে গিয়ে গরমের শুরুতেই নিম্নমানের ওষুধ (এডাল্টিসাইড) নিয়ে বিপাকে পড়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। এতে সঠিক সময়ে মশা নিধন কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি সিটি কর্পোরেশন। ফলে এই মুহূর্তে মশার উৎপাত অনেকটাই বেড়ে গেছে। দিন-রাত সমান তালে মশা কামড়াচ্ছে। মশার মাত্রাতিরিক্ত উপদ্রব থাকায় দৈনন্দিন কাজ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনাও করতে পারছে না।মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনে চলতি বছরে ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। এর মধ্যে ডিএনসিসি ২১ কোটি টাকা এবং ডিএসসিসি ২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ। আগের বছরেও বরাদ্দ ছিল প্রায় সমপরিমাণ। কিন্তু এবার নতুন বছরে শুরুতেই ফল প্রায় শূন্য। নগরবাসী সবচেয়ে মশাবাহিত রোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন। মশক নিধন কর্মসূচির বিভিন্ন এলাকার কচুরিপানা পরিষ্কার, মশার ওষুধ ছিটানো, সরঞ্জামাদি ক্রয় ইত্যাদি। এই খাতে প্রতিবছর সিংহ ভাগ অর্থ ব্যয় করা হইলেও নগরবাসী কেন কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না? বর্তমানে মশার উপদ্রব এতটা বেড়েছে যে, নগরবাসীর বাসায় অবস্থান করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।সরেজমিন দেখা যায়, কোটবাড়ী খাল, ক্যান্টনমেন্ট সার্কেলের মৌসাইদ গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব সীমানার জুমাই খাল, রাজাবাজার খাল, ধানমন্ডি খাল, পরীবাগ খাল, আরামবাগ খাল, গোপীবাগ খাল, ধলপুর খাল, ধোলাইখাল, যাত্রাবাড়ী এবং কদমতলী খালসহ অধিকাংশ খালে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এসব খাল পরিষ্কার না করায় মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব খাল পরিষ্কারের কথা উঠলেই দুই সিটি কর্পোরেশনের দাবি- এটি তাদের দায়িত্ব নয়, খালগুলোর মালিক যারা তারাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করবে।দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের কাছে জানা যায়, বর্তমানে ঢাকাবাসীর সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণায় মশার কামড়। এলাকায় মশার উৎপাতের পেছনে নালা, ডোবা না করাকেই দায়ী করছে। মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, মাতুয়াইল ও শনিরআখড়া ডোবা ও নালা ঝাঁকে ঝুাঁকে মশা উড়তে। সেখানে সিটি কর্পোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ও উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে কর্মীদের দেখা মেলে না। মশারি, কয়েল কিংবা ইলেকট্রিক ব্যাট দিয়েও মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মশার উপদ্রব বাড়ার কথা স্বীকার করে ডিএসসিসির ২১ নাম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট এম এ হামিদ খান আমার সংবাদকে বলেন, নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। ওষুধের ঘাটতি নেই। তুলনামূলক অন্যসব ওয়ার্ডের চেয়ে এখানে মশা কম। এরপরও মশার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। বেড়েই চলছে। ডিএনসিসি ওষুধ সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষায় সন্তোষজনক না হওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এখন চীনের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে মানসম্মত ওষুধ আনা হয়েছে। ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরো বলেন, অ্যাগ্রো লিমিট নামে একটি প্রতিষ্ঠান মশার ওষুধ দিত ডিএনসিসিকে। কিন্তু ফিল্ড টেস্টে প্রতিষ্ঠানটির ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। তাই এই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্ল্যাকলিস্টেড করা হয়েছে। তবে আমাদের কাছে যে ওষুধ রয়েছে তা দিয়ে মশক নিয়ন্ত্রণকাজ পরিচালনা ভালোভাবেই করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘চীন থেকে আমরা চার লাখ লিটার ওষুধ আনছি। দুই ধাপে দুই লাখ লিটার করে আসবে এসব ওষুধ। তবে মশক নিয়ন্ত্রণকাজ অব্যাহত রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ৩০ হাজার লিটার ওষুধ আনা হয়েছে। আগামী ১৮ মার্চ থেকে ক্র্যাশপ্রোগ্রাম শুরু করতে যাচ্ছে।’ ডিএনসিসিতে ২২শ’ বিঘার মতো জলাশয় রয়েছে। এসব জলাশয়ে ময়লা-আবর্জনা থাকায় মশার প্রজনন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শরিফ আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে কর্মীরা নিয়মিত কাজ করেন। কাজের উপস্থিতি নিশ্চিত ও নিয়মিত ডিউটি আদায় করতে তাদের তদারকির দায়িত্ব ওয়ার্ড কাউন্সিলদের দেয়া হয়েছে। এখন ফাঁকিবাজির সুযোগ নেই। মশা মারার জন্য যেসব কীটনাশক ব্যবহার করা হয় তা উন্নতমানের। এবার মশার ওষুধের গুণগত মানের পরিবর্তন এনেছে ডিএসসিসি।নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করেন, শুধু বাজেট বাড়ালেই মশা নিধন হবে না। বরাদ্দের পুরো ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা মহানগরে প্রতিনিয়ত লোকসংখ্যা বাড়ছে। তাই মশা নিধনে দুই সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমও বাড়ানো উচিত। মশার উপদ্রব বড়ায় মশারি ও কয়েলের বাজারে প্রভাব পড়েছে। পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় বিক্রি বেশ বেড়েছে। ডিএনসিসির সঙ্গে নতুন যুক্ত হওয়ায় কামারপাড়া এলাকায় পাইকারি বাজারে কয়েল বিক্রেতা আহসান হাবিব বলেন, গত কয়েকদিনে কয়েল বিক্রির হার ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। একই কথা বলেন গুলিস্তানে মশারি বিক্রেতা ফজলু মিয়া। তাদের বিক্রি বেড়ে গেছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত