শিরোনাম

নিষ্ক্রিয় জাতীয় পার্টি

প্রিন্ট সংস্করণ॥আসাদুজ্জামান আজম  |  ০০:২০, মার্চ ১৪, ২০১৯

জাতীয় নির্বাচনের পর কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে সংসদীয় বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। নেই কোনো দৃশ্যমান সাংগঠনিক কার্যক্রম। সদ্য অনুষ্ঠিত ডাকসু ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ছিল না কোনো তৎপরতা। শুধু প্রার্থী দিয়েই সীমাবদ্ধ থেকেছে দলটির নেতারা। চলমান উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। কাকরাইলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও বনানীস্থ চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের বনানী কার্যালয়েও সুনসান নীরবতা। দলীয় নেতা বা কর্মীদের দেখা মেলা দায়। কেন্দ্রের কোনো কর্মসূচি না থাকায় পার্টির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও ঝিমিয়ে পড়েছে। তথ্য মতে, গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নেতৃত্ব নিয়ে দলটির শীর্ষ পর্যায়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ অসুস্থ হওয়ার পর পার্টির কো- চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদের দায়িত্ব পান। কিন্তু অবস্থান পরিষ্কার করা হয়নি বেগম রওশন এরশাদের অবস্থান। আর এ কারণে বেগম রওশন এরশাদসহ দলের একটি বড় গ্রুপ দলে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, নতুন দায়িত্বে আসার পর জিএম কাদের ও তার অনুসারীরাও কোনো তৎপরতা দেখাতে পারেনি। গত ১ জানুয়ারি ছিল জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। প্রতি বছর দিনটি ব্যাপক উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা হলেও এবার ছিল ব্যতিক্রম। কোনো বড় ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়নি। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় ১ জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সভা-সমাবেশ না করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এক সপ্তাহ বা ১৫ দিন পর সমাবেশ, র্যালি বা আলোচনা সভা করা যেত। দলীয়ভাবে কোনো পোস্টারও করা হয়নি।ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে শুধু শাফীন আহমেদকে লাঙ্গল প্রতীকটাই দেয়া হয়েছে; আর কিছু নয়। দলের শীর্ষ নেতারা কেউ শাফীন আহমেদের প্রচারণায় অংশ নেননি। কেন্দ্র থেকেও কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি। শাফীন আহমেদ নিজস্ব কিছু নেতাকর্মী নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম জয় বলেন, এখানে শাফীন কোনো বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে লাঙ্গল। এ লাঙ্গল প্রতীককে জয়যুক্ত করতে সবাই যদি সম্মিলিতভাবে মাঠে নামত, তাহলে ফলাফল আরও ভালো করতে পারতাম। সারা দেশে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন চলছে। বিএনপি এতে অংশ নিচ্ছে না। জাতীয় পার্টি শক্তভাবে মাঠে অবস্থান নিয়ে ভালো ফলাফল করতে পারত। কিন্তু নির্বাচনী মাঠে নেই জাপার প্রার্থীরা। হাতে গোনা কয়েকজন উপজেলায় প্রার্থী থাকলেও কেন্দ্রের নেতারা কোনো খোঁজখবর নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। এইচ এম এরশাদ বর্তমানে অনেকটা সুস্থ থাকলেও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার সুস্থতা কামনায় তিনটি মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত হননি দলটির সিনিয়র নেতারা। তবে ওই সময়ে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি এবং গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ঠিকই নেতারা অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। চাকবাজারে চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দলটির তেমন তৎপরতা ছিল না। জিএম কাদেরসহ কয়েক নেতা ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে অসুস্থদের দেখতে গেলেও যাননি চুড়িহাট্টায়, জোরালো দাবিও জানাননি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন বা দায়ীদের বিচারের। এ ছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি মতো দিবসেও ছিল না কোনো কর্মসূচি। ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনেই সীমাবদ্ধ ছিল কর্মসূচি। দলটির এক প্রেসিডিয়াম সদস্য জানান, জাতীয় পার্টির নেতারা এখন সরকারে সুবিধা নিতে ব্যস্ত। জিএম কাদের এবং রাঙা দায়িত্বে আসার পর সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ার কথা থাকলেও বাড়েনি। আসলে একটি গ্রুপ সেটা চায় না বলেই তারাও পেরে উঠছেন না। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. সাহিদুর রহমান টেপা বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ স্যারের অসুস্থতার কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রম কিছু কম। তিনি এখন অনেকটা সুস্থ্য, আশা করছি সামনের দিনগুলোতে সব ধরনের কর্মসূচি নেয়া হবে। জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বেই দল চলে। এ ছাড়া আমরা এখন সংসদের কার্যক্রমে ব্যস্ত রয়েছি। সংসদের অধিবেশন শেষ হলেই পার্টির চেয়ারম্যানের অনুমোদন সাপেক্ষে কর্মসূচি হাতে নেয়া হবে। জাপা সূত্র জানায়, জাতীয় পার্টি মতানৈক্য নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই দলটি দুটি ধারায় বিভক্ত। বিভক্তির শুরু হয় গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে। ওই নির্বাচন ইস্যুতে জাপায় এরশাদ ও রওশনকে কেন্দ্র করে দলে দুটি বলয় তৈরি হয়। দলের সিনিয়র নেতাদের একটি অংশ রওশন এরশাদকে সামনে রেখে নিজেদের সুবিধা আদায় করে নেন। এরপর থেকে জাতীয় পার্টি চলছে বলয় দুটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। নির্বাচনের অংশ নেয়ার পক্ষে অবস্থান নেন রওশন ও তার অনুসারীরা। নির্বাচনের বিপক্ষে অবস্থান এরশাদ ও তার অনুসারীরা। এ সময় দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রওশনের সঙ্গে না পেরে এরশাদ কোণঠাসা হয়ে পড়েন। নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় উপনেতা নির্বাচন নিয়ে এরশাদ-রওশন দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসে। সে যাত্রায় রওশন এরশাদ বিরোধী দলীয় নেতাসহ সরকার এবং দলের কর্তৃত্ব ছিল রওশনপন্থিদের। সময়ের সঙ্গে এরশাদ ও রওশন সম্পর্ক ভালো হলে আবারো কর্তৃত্ব আসে এরশাদপন্থিদের হাতে। গত একাদশ জাতীয় নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এরশাদ নিজেই। সরকারে না থাকার ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেন এরশাদ। নিজে বিরোধীদলীয় নেতা, দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙাকে চিফ হুইপের দায়িত্ব দেন। আর ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে পার্টির কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন সিনিয়র নেতাদের একটি অংশ।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত