শিরোনাম

নলছিটিতে বেড়ে গেছে মুড়ি ব্যবসায়ীদের কর্মব্যস্ততা

প্রিন্ট সংস্করণ॥মো: রাজু খান, ঝালকাঠি  |  ০১:৩৮, মে ২৪, ২০১৮

ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নসহ মোট ১২ টি গ্রামে সারাবছর ধরেই মুড়ি ভাজার কাজ হয়। পবিত্র রমজানের ইফতারি যত আইটেমই থাকুক না কেন মুড়ির বিকল্প নেই। তাই রমজান এলেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় এ সকল এলাকায়। কোন ধরণের রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়া হাতে ভেজে উৎপাদিত মুড়ি সুস্বাদু হওয়ায় চাহিদা দেশ জুড়ে। উপজেলার জুড়কাঠি, ভরতকাঠি, তিমিরকাঠি, দপদপিয়াসহ ১২ টি গ্রামে। তবে রমজান আসতে না আসতেই এই মুড়ির চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তাই এসব গ্রামে এখন দিন-রাত চলছে মোটা চালের মোটা মুড়ি ভাজার কাজ। গ্রামগুলো ঘুরে জানা গেছে, এসব গ্রামের কয়েকশো পরিবার কয়েক যুগ ধরে মুড়ি ভেজে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এখন প্রতিটি পরিবারে একজন নারী মুড়ি ভাজার মূল ভূমিকায় রয়েছেন, যাকে পরিবারের অন্য সদস্যরা সহায়তা করে থাকেন। রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার ছাড়া এসব মুড়ি এখন প্রসিদ্ধ বরিশাল, ঢাকা ও ফরিদপুর জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণে এই গ্রামগুলো এখন মুড়ি পল্লী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। দক্ষিণ তিমিনকাঠি গ্রামের ষাটোর্ধ্ব হাবিব সরদার বলেন, বুঝ শক্তি হবার পর থেকে দেখি মুড়ি ভাজতে। বাবার কাছে শুনেছি তার পূর্ব পুরুষ থেকেই মুড়ি ভাজার কাজ চলছে। তিনি আরো জানান, আড়তদারদের দেওয়া চালে ৫০ কেজির এক বস্তা চালে ৪২ থেকে ৪৩ কেজি মুড়ি হয়। মুড়ি ভাজার লাকড়ি, হাড়ি-পাতিলের খরচ দিয়ে ৫০ কেজি মুড়ি ভেজে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪শ টাকা পাওয়া যায়। এর মধ্যে খরচ বাদে টেকে মাত্র আড়াইশো টাকা। দক্ষিণ তিমিনকাঠি গ্রামের কাজল বেগম জানান, ৩০ বছর আগে বিয়ে করে এই বাড়িতে এসে নারীদের মুড়ি ভাজতে দেখেছেন। সেই থেকে তিনিও এই মুড়ি ভাজার কাজের সঙ্গে মিশে গেছেন। মুড়ি ভাজার কৌশল নিয়ে জানান, মুড়ি ভাজতে হলে হাতের টেকনিক জানাটা অনেক দরকার। পাশাপাশি মুড়ি ভাজার উপজোগী মাটির চুলা ও সরঞ্জামের ? গুরুত্বও অনেক। প্রথমে মোটা চাল লবণ পানির সঙ্গে মিশিয়ে মাটির পাত্রে হালকা ভাজেন। এক্ষেত্রে ৫০ কেজি বস্তার চালের জন্য এক কেজি লবণের প্রয়োজন হয়। চাল ভাজার পাশাপাশি অন্য মাটির পাত্রে বালির মিশ্রণ গরম করতে হয়। এরপর মাটির অন্য পাতিলের মধ্যে গরম বালি ঢেলে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে লবণ পানি মেশানো ভাজা চাল ঢেলে দেন। ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ডের নারাচাড়ায় তৈরি হয়ে যায় ভালো মানের মুড়ি। তিনি বলেন, চুলার তাপ ও সংসারের কাজের জন্য রাত ৩টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যেই সবাই চেষ্টা করেন ওই দিনের ভাজার কাজ শেষ করতে। একদিনে কেউ ৫০ কেজি, অনেকে আবার ১শ কেজি চালের মুড়িও ভাজেন। ময়না বেগম বলেন, চুলার আগুনের প্রচন্ড গরম সহ্য করতে হয়। তাই যাদের বয়স বেড়েছে তাদের কষ্ট হয় একাজে। তবে এটি নারীদের জন্য আলাদা কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। আ: ছত্তার হাওলাদার জানান, স্কুল পড়ুয়া ছেলে ইমরান ছোটবেলা থেকেই মুড়ি ভাজার কাজে মাকে সাহায্য করছে। আমি কোন আড়ৎদারদের সাথে চুক্তিবদ্ধ নই। ৪/৫জন পাইকার এসে আমার মুড়ি নিয়ে যায়। পাইকাররা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালান করেন। তিনি আরো জানান, যে কষ্ট সে অনুযায়ী শ্রমমূল্য না পেলেও এটি একটি শিল্পের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মুড়ি ভাজার কাজের সঙ্গে অনেক পরিবার জড়িয়ে যাচ্ছে। এর অর্থেই চলে তাদের জীবন-জীবিকা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াসহ যাবতীয় খরচ।কাজল বেগম জানান, অনেকে আড়ৎদারদের সাথে চুক্তি করে চাল নিয়ে মুড়ি উৎপাদন করে শ্রম বিনিময় করেন। আবার অনেকে নিজ খরচে হাতে মুড়ি তৈরী করে পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। বরিশাল বিএম কলেজের মাস্টার্স পড়ুয়া ছাত্র মো: রকিবুল ইসলাম হাসান জানায়, আমাদের গ্রামসহ (দক্ষিণ তিমিরকাঠি) আশপাশের ১২ টি গ্রামেই সারাবছর মুড়ি উৎপাদন করে। কোন রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মুড়ি তৈরী করে। এক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীদের ভুমিকা অনেক বেশি। এখানকার মুড়ি সুস্বাদু হওয়ায় চাহিদা সারা বছরই থাকে। তবে রমজান এলে ইফতারীতে মুড়ির ব্যবহার বেশি হয় বলে ব্যস্ততাও বেড়ে যায় কয়েকগুন। স্থানীয় আড়ত মেসার্স খান ব্রাদার্স এর প্রোপ্রাইটর মো: শহিদুল ইসলাম জানান, এ অঞ্চলের হাতে ভাজা মোটা মুড়ির জনপ্রিয়তা ও কদর সবসময়ই। কিন্তু মেশিনে ভাজা চিকন মুড়ির কারণে কিছুটা বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ফলে তাদের কম দামে মুড়ি বিক্রি করতে হয়, আর শ্রমিকরাও কম টাকা পাচ্ছেন। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের চার থেকে পাঁচটি আড়ৎ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল যেমন, চট্টগ্রাম, মাগুরা, ফরিদপুর, ঢাকা, সিলেট, টাঙ্গাইল থেকে পাইকার এসে আমাদের কাছ থেকে কিনে নেয়। প্রতিটি আড়তে বর্তমান রমজান মাসে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ মন মুড়ি বিক্রি হয়। রোজার আগে এতো চাপ বেড়ে যায় যে, দক্ষ জনবল থাকার পরও চাহিদা অনুযায়ী মুড়ি ভাজা সম্ভব হয় না। আগে ভেজে জমানোও যায় না কারণ, নেতিয়ে গেলে ক্রেতারা নিতে চান না। চার আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, এ অঞ্চল থেকে এখন প্রতিদিন দেড় থেকে তিনশ মণ মুড়ি দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। যা কেজি প্রতি ৮০ টাকা দরে আড়ৎদাররা বিক্রি করছেন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত