শিরোনাম

ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবে মাতবে দেশ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০০:৩৯, নভেম্বর ১৫, ২০১৭

‘এই হেমন্তে কাটা হবে ধান/ আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলের বান...।’ বান এসেছে ফসলের। এখন কৃষকের গোলাভর্তি ধান। শেষ হয়েছে মরা কার্তিক। শুরু হয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সমৃদ্ধির অগ্রহায়ণ। আজ বুধবার ১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ। নতুন মাসের প্রথম দিন উদযাপিত হবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসব। ফসলকেন্দ্রিক সবচেয়ে প্রাচীন এবং প্রধান উৎসবে মাতবে গ্রামবাংলা। নতুন চালে হবে নবান্ন। ঘরে ঘরে চলবে পিঠাপুলির আয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে প্রথম পৃষ্ঠার পর
অনেক কিছু। বর্তমানে সারা বছরই কিছু না কিছু ফসল হয়। গ্রামও সনাতন মাড়াই প্রথা বিলুপ্ত করে যন্ত্র¿যুগে প্রবেশ করেছে। কৃষি এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে। শহুরে মানসিকতার কাছে প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে গ্রামীণ মূল্যবোধ। হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক উৎসব। আগের মতো বিপুল আয়োজনে এখন আর পালিত হয় না নবান্ন উৎসব। তবে পুরোপুরি ম্লান হয়ে যায়নি নবান্নের আনন্দ। আজ এতিহ্যবাহী আচার উৎসবে মাতবে বাঙালি। প্রাকৃতজনের জীবন ও লোক চেতনায় উদ্ভাসিত হবে নগরও। রাজধানী শহর ঢাকায়ও থাকবে নবান্ন উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। অসাম্প্রদায়িক উৎসবে যোগ দেবে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ। নিজের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হবে নতুন প্রজন্ম। নবান্ন মানে নতুন অন্ন। নতুন চালের রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবটি নবান্ন নামে পরিচিতি পায়। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এ উৎসব শুরু হয়। ইতিহাস বলে, হাজার-হাজার বছর আগে কৃষিপ্রথা চালু হওয়ার পর থেকেই নবান্ন উৎসব পালন হয়ে আসছে। তখন থেকেই ঘরে ফসল তোলার আনন্দে নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন সেগুলোর অন্যতম। প্রতিবারের মতো এবারও অগ্রহায়ণের শুরুতে সোনার ফসলে ভরে উঠেছে কৃষকের জমি। হেমন্তের মৃদুমন্দ বাতাসে খেলা করছে পাকা ধানের শীষ। আপন মনে হেলছে, দুলছে। দেখে মন ভরে যায়। সোনালি ফসলের দিকে তাকিয়ে নতুন নতুন স্বপ্ন বুনছেন কৃষক। ধান কাটার কাজও শুরু হয়ে গেছে বিভিন্ন অঞ্চলে। নতুন ধানে হবে নবান্ন। পাকা ধানের সোনালী মাঠে, তাই কাস্তে হাতে কৃষকের আনাগোনা। নতুন ধানে পিঠা-পুলি, পায়েস, মুড়িমুড়কি আর মোয়াসহ নানা খাবার তৈরি হবে এ দিনে। বাড়িতে বাড়িতে মেয়ে-জামাইসহ আমন্ত্রিত হবেন আত্মীয়রা। তাই ব্যস্ততা বেড়েছে কৃষক-কৃষাণীর। এ বছর দুবারের বন্যায় ক্ষতির পরও ধানের ভালো ফলন এবং বাজারমূল্য ভালো হওয়ায় দারুণ খুশি এলাকার কৃষক। তাই সামনের নবান্ন উৎসব তাদের মনে এনে দিয়েছে বাড়তি আনন্দ। নবান্নের আয়োজনকে ঘিরে কৃষকের পাশাপাশি কৃষাণীরাও ব্যস্ত সময় পার করছেন। ঢেঁকিতে ধান ভেনে আটা করা আর সেটা দিয়েই তৈরি হবে পিঠা-পুলি। আমন্ত্রণ জানানো হবে আত্মীয়স্বজনদের। দিনটিকে ঘিরে আনন্দের মাত্রা বেড়ে যায় গ্রামের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে। আত্মীয়স্বজনদের সাথে আনন্দ করে ঘুরে বেড়ানো, গ্রাম্য মেলায় দল বেঁধে যাওয়া, খাবার খাওয়াÑ সব মিলিয়ে বেশ আনন্দেই কাটে দিনটি।
আজ নবান্ন উৎসবের দিনে বাংলার কৃষকের ঘরে হরেক পদের রান্না হবে। এক সময় কুড়ি থেকে চল্লিশ পদের তরকারি করা হতো। তার কিছু হলেও দেখা যাবে আজ। তালিকায় থাকবে সব ধরনের শাক, ভর্তা, ভাজি। পিঠাপুলি ও পায়েসের কথা তো বলাই বাহুল্য। আজ এর শ্রেষ্ঠ সময়। ঘরে ঘরে পিঠাপুলি, পায়েস হবে। সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, নবান্ন উৎসবের সঙ্গে ধর্মীয় কিছু আনুষ্ঠানিকতাও যোগ করা হয়। হিন্দুরা নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃপুরুষ অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন। পার্বণবিধি অনুযায়ী হয় শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। শাস্ত্রমতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়। কে চায় অমন পাপ করতে! অমুসলিম রীতিতে, নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্ন পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাক ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করে। আত্মীয়স্বজনকে পরিবেশন করার পর গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড়সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন। নতুন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাককে নিবেদন করা বিশেষ লৌকিক প্রথা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কাকের মাধ্যমে ওই খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। এ নৈবেদ্যকে বলে ‘কাকবলি’। অতীতে পৌষসংক্রান্তির দিনও গৃহদেবতাকে নবান্ন নিবেদন করার প্রথা ছিল। কাকবলির আগে আরও তিনটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার নিয়ম রয়েছে। সেগুলো হচ্ছেÑ লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ ও বীরবাঁশ। বীরবাঁশের প্রথা মূলত বরিশাল অঞ্চলের। এর নিয়ম অনুযায়ী, বাড়ির উঠানের মাঝখানে একটি গর্ত করা হয়। তার চারপাশে পিটুলী দিয়ে আলপনা আঁকা হয়। এর পর গর্তে জ্যান্ত কই মাছ ও দুধ দিয়ে একটি বাঁশ পোঁতা হয়। ওই বাঁশের প্রতি কঞ্চিতে বাঁধা হয় ধানের ছড়া। নবান্ন উৎসবে কাকবলি, লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ হয়ে গেলে সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। এর আগে কেউ কিছু মুখে নেন না। বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া গ্রামে এখনও নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত