শিরোনাম
ঢাকার রাজপথ পানিতে থৈ-থৈ

জল ও যানজটে চরম দুর্ভোগ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ আহমেদ ফেরদৌস খান  |  ০০:৩৯, অক্টোবর ২২, ২০১৭

নিম্নচাপের প্রভাবে সারা দেশেই বৃষ্টি হচ্ছে। গত দু’দিনের ক্রমাগত বৃষ্টিতে জনজীবনে নেমেছে অস্বাভাবিকতা। জল ও যানজটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রাজধানীবাসী। বৃষ্টিতে বেশিরভাগ এলাকা ছাড়াও ঢাকার অনেক রাজপথ পানিতে থৈ-থৈ করছে। গতকাল শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই ঘর থেকে বের হননি। কাজের তাগিদে যারা থেকে বের হয়েছেন তারাই পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। গত তিন দিনের বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। টানা বৃষ্টিতে নগরীর নিচু এলাকার অলি-গলিসহ কোনও কোনও এলাকার প্রধান সড়কেও পানি জমে যায়। এতে দুর্ভোগে পড়েন অফিসগামী মানুষ। বিশেষ করে সমস্যায় পড়ে স্কুলগামী শিশুরা। কর্মস্থলের যাওয়ার পথে যানবাহনের অভাবে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখা যায় অনেককে। রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকা হাঁটুপানিতে ডুবে যায়। সড়কে যানবাহন চলাচলও থমকে গিয়ে দুর্ভোগের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। সকালে আকাশে কালো মেঘ ও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দেখেও যাঁরা বাইরে বের হয়েছিলেন, তাদের বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় নগরীতে ১৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকাল শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সকাল থেকেই রাজপথে গণপরিবহনের উপস্থিতি ছিল কম। সকালে রাজধানীর মিরপুর এলাকার প্রধান সড়কগুলোতে হাঁটু সমান পানি জমে যায়। মিরপুর ১০ নম্বর থেকে শেওড়াপাড়া পর্যন্ত সড়কটি পানিতে থৈ থৈ করতে দেখা যায়। পুরো রোকেয়া সরণিতে পানি জমে যায়। সড়কে গণপরিবহনের উপস্থিতি কম হওয়ায় অনেক মানুষকে হেঁটে গন্তব্যে ফিরতে দেখা যায়। কিছু কিছু স্থানে পানিতে আটকা পড়ে যানবাহন বিকল হয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, মালিবাগ, পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোড, খিলক্ষেতের প্রধান সড়কসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র।
এসব এলাকায় অলিগলিতে পানি জমে দোকানপাট ডুবে গেছে। ভাঙাচোরা রাস্তাগুলোয় যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেশি। ঝুঁকি নিয়ে জলমগ্ন ভাঙা রাস্তায় চলতে হচ্ছে রিকশা-সিএনজিসহ ব্যক্তিগত যানবাহনগুলোকে।
বনানী ১১ নম্বর এলাকা থেকে হোটেল র‌্যাডিসনের আগের ফ্লাইওভার পর্যন্ত সড়কেও হাঁটু পানি। উত্তরা যাওয়ার পথে থেমে থেমে পানির মধ্যে গাড়ি চলছে। উত্তরা থেকে ফেরার পথে রয়েছে যানজট। নৌবাহিনী সদর দফতরের সামনে এত পানি আগে কখনও দেখা যায়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বসুন্ধরা সিটির পেছনের রাস্তায় কোমরসমান পানি। এখানে পানি পারাপারের জন্য ভ্যান ও রিকশার সহায়তা নিতে হচ্ছে। পানি পারাপারের জন্য রিকশা ও ভ্যানচালকেরা হাঁকডাক দিচ্ছেন। ১০ টাকার বিনিময়ে পানি পারাপার হচ্ছেন এই এলাকার মানুষ।
গ্রিন রোডে গ্রিন লাইফ হাসপাতালের সামনেও একই দৃশ্য। এমনিতেই সেই রাস্তায় রিকশার সংখ্যা কম, এই সুযোগে রিকশাচালকেরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, গ্রিন লাইফ হাসপাতালের সামনে থেকে ফার্মগেটে রিক্সা ভাড়া ২০ থেকে ২৫ টাকা। অথচ বৃষ্টির কারণে রিকশাচালকরা ১০০ টাকা ভাড়া চাচ্ছে।
পান্থপথের একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন সুলতানা বেগম। মিরপুর-১২ নম্বরে তার বাসা। তিনি বলেন, বাসা থেকে বের হয়ে দেখি রাস্তাগুলো যেন নদী। বিকল্প পথ ব্যবহার করে অনেক অপেক্ষার পর একটি সিএনজি পেয়েছি। কিন্তু ভাড়া দ্বিগুণ দিতে হয়েছে। গতকালকের চেয়ে আজ (শনিবার) রাস্তায় পানি অনেক বেশি বলে তিনি জানান।
অতিবৃষ্টির কারণে রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের সড়কটি নদীতে পরিণত হয়। ডুবে যাওয়া সড়কে লাইফবোটের মাধ্যমে যাত্রী পারাপার করছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। অনেকেই ফায়ার সার্ভিসের এই সেবামূলক কাজের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বরত কর্মীরা আমার সংবাদকে বলেন, ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতে মানুষকে খুব ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ দুর্ভোগ থেকে কিছুটা মুক্তি দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরগুলোকে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদে থাকতে বলা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গত তিন দিন ধরে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
নিম্নচাপের প্রভাবে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১-২ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছাসে প্লাবিত হতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপটি এখন পর্যন্ত স্থল নিম্নচাপ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকাজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে। এর প্রভাবে আজ সারা দিনই বৃষ্টি হয়েছে। কোথাও থেমে থেমে, কোথাও টানা ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আজ রোববারও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকবে এবং বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে দুপুরের পর বৃষ্টিপাত কমতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে খুলনায় ১৬৩, বরিশালে ১৮৬, রাজশাহীতে ৯২, ময়মনসিংহে ১০০, চট্টগ্রামে ১০, সিলেটে ৮ ও রংপুরে ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় গোপালগঞ্জে। এখানে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৭১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
সদরঘাট থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ : দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে নদীবন্দরে ২ নম্বর সংকেত বহাল থাকায় ঢাকা সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ৪১ নৌ-রুটে সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে বি আইডব্লিউটিএ।
গতকাল শনিবার বিকেল ৪টা থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বি আইডাব্লিউটিএর সদরঘাটে দায়িত্বরত নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদিন বলেন, নদীবন্দরগুলোতে দুই নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ঢাকা সদরঘাট টার্মিনাল হতে শনিবার বিকেল ৪টা থেকে ৪১ নৌ-রুটে সব ধরণের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি ভালো না হওয়া পর্যন্ত এ নির্দেশ বহাল থাকবে।'
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, রংপুর, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালি, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলসমূহের উপর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব/দক্ষিণ দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। সেই সাথে বৃষ্টি/বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দরে ২ নম্বর নৌ-হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানায়, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকার নিম্নচাপটি উত্তর ও উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাগর উত্তাল থাকায় এখনও তিন নম্বর সতর্কতা সংকেত বলবৎ রয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপটি স্থল নিম্নচাপ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম এলাকাজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, শনিবার দিনভর বৃষ্টি হবে। রোববার থেকে বৃষ্টি কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
আজ বৃষ্টি কমতে পারে : রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল শনিবারও এ বৃষ্টি থামেনি। তবে আজ রোববার বৃষ্টি কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকার নিম্নচাপটি উত্তর ও উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সাগর উত্তাল থাকায় এখনও তিন নম্বর সতর্কতা সংকেত বলবৎ রয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপটি স্থল নিম্নচাপ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম এলাকাজুড়ে বিস্তৃত রয়েছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক।
তিনি জানান, এর প্রভাবে শনিবার দিনভর বৃষ্টি হবে। রোববার থেকে বৃষ্টি কমার সম্ভবনা রয়েছে।
টানা বর্ষণের কারণে রাজধানীসহ সারাদেশে ভোগান্তি নেমে এসেছে। জলাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজধানীবাসী।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ১৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে গত শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ১৪৯ মিলিমিটার।
রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে গোপালগঞ্জে ২৭১ মিলিমিটার।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল শনিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চল ও উড়িষ্যা এলাকায় অবস্থানরত স্থল নিম্নচাপটি উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে গতকাল শনিবার সকাল ৯টায় পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল এলাকায় অবস্থান করছিল।
এতে বলা হয়, এটি আরও উত্তর অথবা উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় বায়ু চাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে এবং গভীর সঞ্চালণশীল মেঘমালা তৈরি অব্যাহত রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত