শিরোনাম

‘বাংলাদেশই আমাদের দেশ পাকিস্তান যেতে চাই না’

এএইচএম কাউছার॥প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১৬:১৩, আগস্ট ১৫, ২০১৭

 চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী ঝাউতলায় বিহারী এলাকার বাসিন্দা মো. রফিক (৮০)। ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর রাজনৈতিক কারণে ভারতের বিহার ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। তিনি এখন চট্টগ্রাম পাহাড়তলী সরকার বাহাদুর স্কুল ক্যাম্পে ১১ নং রুমে পরিবার নিয়ে বাস করেন। তার তিন ছেলে, ছয় মেয়ে নিয়ে কোনোরকমে দুইটি রুমে থাকেন। রফিক মিয়ার মতো এরকম ২১৫ পরিবার সরকার বাহাদুর স্কুলে কোনোরকম চরম অবহেলিতভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

চরম অবহেলিত এই যাপিত জীবনের কথা জানতে চাইলে রফিক মিয়া বলেন, ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার আমি বাংলাদেশে চলে আসি। আমি সরকার বাহাদুর স্কুলে পড়ালেখা করেছি। আবার এ স্কুলে আমার পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। ১৯৭১ সালের পর আইসিআরসি (ইন্টারন্যাশনাল রেড়ক্রস সোসাইটি) সরকার বাহাদুর স্কুলকে বিহারী থাকার জন্য ক্যাম্প করে দিয়েছিল। যে স্কুলে পড়ালেখা করেছি সেই স্কুলে বসবাস করতে হচ্ছে। আমার মতো অনেক বিহারী দেশ ছেড়ে চলে আসছিল বাংলাদেশে। আমি বর্তমানে বাংলাদেশের ভোটার। আমরা মতো অনেক বিহারী ভোটার আছে। এখানে শুধু আমরা ভোট দিতে পারি। তবে তেমন কোনো নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাই না। ক্যাম্পে বসবাসকারীরাও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমরা পুনর্বাসন চাই, আমরা পাকিস্তান যেতে চাই না এটাই আমাদের দেশ।

সরেজমিন সরকার বাহাদুর ক্যাম্পের ভিতরে গেলে দেখা যায়, তাদের মানবেতর যাপিত জীবনের অবস্থা। সরকার বাহাদুর ক্যাম্পের দুই তলা ভবনে বাস করেন ২১৫ পরিবার। প্রথম তলায় বাস করেন ৭৫ পরিবার। ২য় তলায় ১৪০ পরিবার। ঘিঞ্জি ঘরে তাদের বসবাস। ক্যাম্পবাসীর মূল সমস্যা হলো পুনর্বাসন। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে যে ঘরে ঢুকেছিলেন, সেই ঘরেই আজও বসবাস করছেন তারা। সংসার বড় হয়ে ছেলেমেয়ে হয়েছে। তাদের নাতি নাতনিও হয়েছে। সদস্য সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু ১০ ফুট ঘরই আছে তাদের। পরিবারের সকলেরই একসঙ্গে থাকতে হচ্ছে। অমানবিক জীবনযাপন করছেন অবাঙালি পরিবারের সদস্যরা। কারো পরিবারে ৫ জন। আবার কোনো পরিবারে ৭-৮ জন সদস্য। এরপরও ঘিঞ্জি ঘরে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে এমন কি ছেলের স্ত্রীকে নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। বয়স্ক মানুষরা অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছেন। দেখার কেউ নেই।

সরকার বাহাদুর স্কুল ক্যাম্পের বাসিন্দা সাবানা বলেন, আমরা স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখানে থাকি। বিল্ডিংয়ের ছাদ ভেঙ্গে যাওয়ায় বৃষ্টি পড়লে আমাদের ঘরে পানি পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করি। পানির অভাবে টয়লেটগুলোর অবস্থাও খারাপ। পানি স্বল্পতার কারণে পরিষ্কার রাখা যাচ্ছে না। এতে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে। ক্যাম্পবাসীর সামাজিক নিরাপত্তা নেই। চারদিকে দুর্গন্ধ। অসুখ বিসুখ হচ্ছে। বর্ষাকালে ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

আবদুল কাইয়ুম সিদ্দিক বলেন, আমরা পাকিস্তান যেতে চাই না। আমরা আটকেপড়া পাকিস্তানি না। আমরা এখন এদেশের নাগরিক। অনেকেই ভোটার আইডি কার্ড পেয়েছে। তবে ক্যাম্পের ঠিকানায় কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না। আমি ভোটার। ভোট দিতে পারি। ভোট নিচ্ছে। কিন্তু নাগরিক সুযোগ সুবিধা পাচ্ছি না। আমাদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। কারণ আমরাও মানুষ। আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই। পুনর্বাসন চাই। অনেক চিঠি চালাচালি হয়েছে। কোনো কাজ হয়নি।

আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল জানান, আমাদের দিকে সরকারের নজর দেয়া উচিত। আমরা যেভাবে বসবাস করছি সেখানে একটি পশুও বসবাস করতে পারবে না। এক মানুষ কোনোভাবে যেতে পারে এমন গলির ভেতরে খুপড়ি খুপড়ি রুমগুলোতে বাস করছেন। একজন লোক মারা গেলে দেওয়াল ভেঙে বের করতে হয়। কারণ, যে সরু গলি দিয়ে বাসায় ঢুকতে হয়, সেই গলি পথ দিয়ে অসুস্থ বা মৃত ব্যক্তির লাশ বের করা সম্ভব না। আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি। আমরা চাই পুনর্বাসন। তবে বর্তমান সরকার আমাদের জন্য কাজ করছে। আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হলে আর সমস্যা থাকবে না। আমাদের জীবনযাপন অমানবিক। আমরা এদেশের নাগরিক। বাংলাদেশই আমাদের দেশ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত