শিরোনাম

আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে বিলুপ্ত প্রায় সেচ যন্ত্র ‘দোন’

তপু সরকার হারুন, শেরপুর  |  ১৪:৫৮, মে ২৬, ২০১৯

আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি’র সেচ যন্ত্রের ভীরে প্রায় বিলুপ্ত সনাতনি সেচ ‘দোন’ এখন আর খুব একটা চোখে পড়ে না। কালে ভাদ্রে এ যন্ত্রটি এখনও কোথাও দেখা গেলেও তা কেবল সল্প পরিসরের জমি বা অল্প জমি’র সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য আজও কোনো কোনো কৃষক এর ঐতিহ্য ধরে রেখেছে নিজেদের প্রয়োজনেই।

দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কম সময়ে অধিক ফসল ফলাতে কৃষি বিজ্ঞানীরা নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় যুগ যুগ ধরে কৃষিতে ব্যপক উন্নয়নের পাশপাশি কৃষি কাজে ব্যবহৃত নানা যন্ত্রপাতি প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে আসছে। সেই সাথে ক্রমেই বিলপ্তি হয়ে যাচ্ছে সনাতনি ওইসব কৃষি প্রযুক্তি। বিশেষ করে শত শত বছর আগে মানুষ কৃষি কাজে পানির জন্য নানা কৌশলে সেচ দিতেন। এরমধ্যে অন্যতম পদ্ধতি ছিল ‘দোন’ এর সাহায্যে ফসলের ক্ষেতে পানি সরবরাহ করা।

জানা যায়, আগেকার দিনে ফসলি জমিতে পানি সেচের ব্যবস্থা জন্য ব্যবহার করা হতো টিন বা বাঁশের তৈরি সেঁউতি ও কাঠের দোন। নদি, খাল-বিল বা জলাশয় থেকে টিন বা বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি সেঁউতি দিয়ে পানি সরবরাহ করা হতো। আর উচু নিচু জমিতে পানি সেচ দিতে সেচযন্ত্র কাঠের দোন ছিল অতুলনীয়।

গ্রামবাংলার কৃষকেরা আদিকাল থেকেই চিন্তা চেতনার ফসল হিসেবে আবিস্কার করেছিল এ কাঠের দোন। আম, কাঁঠাল জাতীয় গাছের মাঝের অংশের কাঠ কেটে নিয়ে তার মাঝখানে খোদাই করে ড্রেন তৈরি করে পানি সেচ দেয়ার ব্যবস্থা করা হতো। কোন কোন স্থানে নারিকেল, তাল, জিগা, সুপারি ও পাইন গাছ দিয়ে এ দোন তৈরি হতো।

তবে বর্তমানে প্রযুক্তির কারণে কাঠের তক্তা দিয়েও এ দোন তৈরি করা হয়। এতে করে পানি সেচ দিতে শ্রমিক ছাড়া কোন প্রকার খরচ হয়না। তাছাড়া এটি সহজে বহনীয়। দোনে সেচ দেয়া খুব মজার কাজ, ক্রস আকারে দুটি বাঁশের শক্ত খুঁটি মাটিতে পুঁতে তার সাথে লম্বা অন্য একটি বাঁশ বেঁধে এক অংশে দোনের মাথা অন্য অংশে মাটির ভরা (ওজন) তুলে দিয়ে পানিতে চুবিয়ে তুললে এক সাথে অনেক পানি উঠে আসে এভাবে অনবরত পানি সেচ দিলে দ্রুত সেচের কাজ হয়।

‘দোন’ আমাদের দেশের বিলুপ্তপ্রায় প্রাচীণ সেচ যন্ত্রের অন্যতম একটি সেচ যন্ত্রটি। আধুনিক কালে শ্যালো, ডিপ, এলএলপি প্রভৃতি যন্ত্রচালিত সেচযন্ত্র আসায় গ্রামীণ কৃষিসমাজ থেকে দোন প্রায় উঠেই গেছে। তবু এখনও ভূপৃষ্ঠের পানি যেসব জায়গায় সহজলভ্য সে রকম কিছু এলাকায় শুকনো মওসুমে দোনের ব্যবহার মাঝে মধ্যে চোখে পড়ে।

নকলা উপজেলা সদরের জোড়া ব্রীজ এলাকার কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, এ জায়গাটি বলেস্বর নদী। এখানে এক সময় সারা বছর পানি থাকতো। আমাদের বাপ-দাদারা এখান দিয়ে বর্ষায় বিভিন্ন স্থানে নৌকা নিয়ে কৃষি পন্য আনা-নেয়া করতো। সেসময় এ নদী থেকে এই দোনের সাহায্যে ফসলের ক্ষেতে পানি দেওয়া হতো। এখন সব শুন্য। নদী হয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত।

তবে চৈত্র মাস আসার আগ পর্যন্ত এখানে কিছু পানি থাকে। এ পানির পরিমান খুবই সামান্য বিধায় দোনের সাহায্যে পানি তোলা খুব সহজ। তাই আজো এ দোন ব্যবহার করে বোরো ফসলের জমিতে সেচ দেয়া হয়। এছাড়া আমাদের সামান্য এই জমিতে মটর দিয়ে সেচ দেয়া পোষাবে না।

সচেতন মহলের মতে, আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা আমাদের জন্য আশীর্বাদ হলেও গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক বাহক আমাদের পূর্ব পুরুষের তৈরি কৃষিন্ত্রপাতি সভ্য সমাজ ও অনাগত জাতীর চেনার জন্য চালু রাখা প্রয়োজন।

জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন জানায়, দেশে বর্তমানে সকল জমি শত ভাগ সেচের আওতায় আসায় এখন আর ওই সনাতনি ‘দোন’ এর সাহায্যে সেচ দেয়ার প্রয়োজন হয়না। ফলে কৃষকরা এখন আর দোন ব্যবহার করে না। তবে কালে-ভাদ্রে যেসব স্থানে দুই একটি ‘দোন’ চোখে পড়ে তা খুবই অল্প সময়ের জন্য এবং অল্প পানির ধারা থেকে ব্যবহার করা হয়। কয়েক দিন পর যখন পানি শুকিয়ে যায় তখন ওই ‘দোন’ অকেজো হয়ে পড়ে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত