শিরোনাম

ইটভাটায় কৃষি ও পরিবেশ ধ্বংস

প্রিন্ট সংস্করণ॥নজরুল ইসলাম মুকুল, কুষ্টিয়া  |  ০২:১০, এপ্রিল ১৬, ২০১৯

দেশসেরা উর্বরা কৃষিজমি ও উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য উৎপাদনের অঞ্চল খ্যাত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা কুষ্টিয়া। জেলার মোট এক লাখ ৬২ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে প্র্রায় এক লাখ ১৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি। এর মধ্যে অতি উর্বরা তিন বা অধিক ফসলি কৃষিজমির পরিমাণ মাত্র ৭৬ হাজার হেক্টর। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এখানে উৎপাদিত খাদ্যশস্য জেলার ২২ লাখ মানুষের বার্ষিক চাহিদার যোগান দিয়েও উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য অন্যান্য জেলায় সরবরাহের যোগান দিচ্ছে। কিন্তু বেপরোয়া ইটভাটা স্থাপনে ক্রমবৃদ্ধি হারে কৃষিজমি ধ্বংসের ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন শঙ্কার মুখে বলে মনে করছেন কৃষি বিভাগ। ইটভাটা মালিকরা বেআইনি স্বীকার করলেও কিছুই করার নেই উল্লেখ করে সবাইকে ম্যানেজ করেই এসব করছেন তারা। দায় নিতে নারাজ সংশ্লিষ্টরা একে অন্যের উপর দায় দিচ্ছেন। তারা বলছেন, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবেন। প্র্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই একটি অভিযান পরিচালিত হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। সংশ্লিষ্টদের পাল্টাপাল্টি এমন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মাঠে নামেন দুদক এবং বিধি লঙ্ঘনের সত্যতা পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন দুদক কুষ্টিয়ার সহকারী পরিচালক হাফিজুল ইসলাম। কুষ্টিয়া জেলার ছয়টি উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে গড়ে উঠা তালিকাভুক্ত ১৫২টিসহ দুই শতাধিক ভাটা মালিকদের কেউই নিয়ম মেনে ভাটা স্থাপন করেননি। এমন অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন চৌধুরী বলেন, ভূমি জোনিং অ্যাক্ট-২০১০, কৃষিজমি সুরক্ষা আইন-২০১৫, পরিবেশ সুরক্ষা আইন-১৯৯৫সহ ইট প্র্রস্তুত ও ভাটা স্থাপনে আইনগত নীতিমালা-২০১৩ সবই লঙ্ঘিত হয়েছে উপজেলার সকল ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে। সরেজমিন অভিযানে গিয়ে ইটভাটা স্থাপনে লাইসেন্স বা ছাড়পত্র কিছুই পাওয়া যায়নি ভাটামালিকদের কাছে। ইটভাটা মালিক সমিতির নেতৃবৃৃন্দ বশির উদ্দিন, আব্দুল হাকিম, মহিদুল, শরিফুল ইসলাম মুকুল ও খোকনসহ একাধিক সদস্যের সাথে আলাপকালে তারা জানান, আমরা ভ্যাট-ট্যাক্সসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরেই নিয়মিত টাকা দিচ্ছি। অথচ প্র্রশাসন অভিযানের নামে প্র্রায়ই জরিমানা আদায় ও ভাটা ভাঙচুরসহ নানাভাবে আমাদের ক্ষতি সাধন করছেন? অধিকাংশ ভাটামালিকই আইন-কানুন সম্পর্কে খুব একটা সচেতন নয়। কোন জমিতে ভাটা করলে কৃষি ও প্ররিবেশ ধ্বংস হবে না সেটা সংশ্লিষ্ট প্র্রশাসনই ঠিক করে দেয়। টাকা যখন দিচ্ছি; তাহলে আমাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখার দাবিও করছি প্র্রশাসনের কাছে। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার যুগিয়া গ্রামের কেএইচবি ভাটার পোড়ায় মিস্ত্রী রাজু মিয়া জানান, কাঠ পুড়িয়ে ইটের উৎপাদন ভালো হয়; কয়লা পোড়ালে মোট ইটের তিন ভাগের মধ্যে এক ভাগ ইট নষ্ট হয়ে যায়। সমানতালে পোড়ে না। সে কারণে কাঠ পোড়ানো হয়। পাঁচ লাখ ইটের একটি ভাটায় প্র্রতিদিন প্র্রায় ৪০০ মণ বা ১৬ মেট্টিক টন কাঠ পোড়ানো হয়। এক রাউন্ড ইট পোড়াতে ২২-২৩ দিন সময় লাগে। বছরের ইট পোড়ানো মৌসুমে ৫ মাসে প্র্রতি ভাটায় কমপক্ষে পাঁচ রাউন্ড করে ইট পোড়ানো হয়। পরিবেশবিদ গৌতম কুমার রায় বলেন, ১৫২টিসহ প্র্রায় দুই শতাধিক ইটভাটা। এক মৌসুমে গড় পাঁচ রাউন্ডে ১৩০দিন ধরে ইট পোড়াতে প্র্রতি একটি ভাটায় একদিনে ১৬ মে.টন কাঠ পুড়লে এক মৌসুমে কাঠ পোড়াচ্ছেন দুই হাজার ৮০ মে.টন। জেলার সবগুলো ইটভাটার হিসাব মতে, প্র্রায় তিন লাখ ১২ হাজার মে.টন কাঠ পুড়ছে ভাটাগুলোতে।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামার বাড়ি) কুষ্টিয়ার উপ-পরিচালক বিভুতি ভূষণ সরকার বলেন, বাংলাদেশে কৃষি ধ্বংসের অন্যতম প্র্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইটভাটা। এক দশকে জেলার অতি উর্বর তিন ফসলি ৭৫ হাজার ৮৮০ হেক্টর কৃষিজমির মধ্যে ২৮৮ হেক্টর জমিতে গড়ে উঠা ইটভাটা প্র্রত্যক্ষভাবে ধ্বংস করেছে। সেই সাথে এর দুষণ ও বিরূপ প্র্রভাবে চতুর্দিকে আরও চারগুণ জমি ফসলহানির শিকার হচ্ছে। অর্থাৎ জেলার মোট কৃষি জমির ৭ শতাংশের অধিক পরিমাণ বন্ধ্যাত্বের শিকার হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক(শস্য) ড. হায়াৎ মাহমুদ বলেন, উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনে দেশের হাতে গোনা কয়েকটি জেলার মধ্যে কুষ্টিয়া অন্যমত। নানাবিধ কারণে উদ্ধৃত্ত খাদ্য উৎপাদনের এই ধারা ক্রমান্বয়ে শঙ্কাগ্রস্ত হয়ে উঠছে কৃষিজমি ধ্বংসের ফলে। ক্রমবর্ধমান গতিতে নানামুখি অকৃষিজ খাতে চলে যাচ্ছে ফসল আবাদি জমি। অনুমোদন ছাড়াই ভাটা মালিকরা সবাইকে ম্যানেজ করে, কৃষি জমিতে ইট প্র্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নীতিমালা লঙন করছে; দুদক সদর দপ্তরে প্র্রাপ্ত এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্র্রশাসনকে সাথে নিয়ে পরিচালিত অভিযানে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন বলে জানালেন দুদক কুষ্টিয়ার সহকারী পরিচালক হাফিজুল ইসলাম। পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার সিনিয়র কেমিস্ট মিজানুর রহমান বলেন, জেলায় মাত্র ২৬টি ইটভাটার পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়প্রত্র নেয়া থাকলেও অন্যদের কোনো ছাড়পত্র নেই।কিভাবে এসব ভাটা চলছে তা সংশ্লিষ্ট প্র্রশাসন বলতে পারবে। তবে এসব অবৈধ ভাটা মালিকদের সাথে পরিবেশ অধিপ্তরের কারো সাথে কোনো অনৈতিক সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন তিনি। কুষ্টিয়ার জেলা প্র্রশাসক মো. আসলাম হোসেন জানান, জেলায় ভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে ভাটা মালিকরা নীতিমালা লঙ্ঘন করে এসব করছেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে কেউ ইচ্ছে করলেই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে পারবেন না। কৃষিজমিকে অকৃষিজ দেখিয়ে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে এমন অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানালেন তিনি।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত