শিরোনাম

দাবি একটাই নিরাপদ সড়ক

প্রিন্ট সংস্করণ॥নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০০:০৬, মার্চ ২১, ২০১৯

দাবি একটাই। তা হলো নিরাপদ সড়ক। এ দাবিতে সোচ্চার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বাসচাপায় সহপাঠী আবরারের মর্মান্তিক মৃত্যুতে তারা শোকাহত। প্রতিবাদে নেমেছে আন্দোলনে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহমত সচেতন মহলের। ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার সকালে যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের রাস্তায়। সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী। ঘটনার প্রতিবাদে সেদিন ওই রাস্তা দিনভর অবরোধ করে রাখেন বিইউপিসহ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রাত্রি বিরতিতে দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল বুধবার অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা ছিলো তাদের। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন দ্বিতীয় দিনে আরও বেগবান হয়। ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরেও। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর। একাত্মতা প্রকাশ করে শাহবাগে অবস্থান নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন ও রাস্তা অবরোধে ঢাকার অধিকাংশ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যানবাহনের সংখ্যাও ছিলো খুবই কম। এ আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে বেলা ১১টার দিকে সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অবস্থান নেয় সিটি কলেজ, ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুল, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বিজ্ঞান কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ‘সড়ক দুর্ঘটনার পরবর্তী শিকার নিজে কি না’? এমন প্রশ্নের সাথে উই ওয়ান্ট জান্টিস লেখা-সংবলিত প্ল্যাকার্ড বুকে নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। বেলা ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিলে মূল সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানীর উত্তরার হাউস বিল্ডিং মোড়ে রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করে উত্তরা ইউনিভার্সিটিসহ কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।দ্বিতীয় দিনের আন্দোলনের শুরু হয় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রবেশমুখে অবস্থান নেয়ার মধ্য দিয়ে। সেখানে বিইউপি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আইইউবিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। তারা নিজেদের মতোই ক্লাস বর্জন করে নিজ নিজ ক্যাম্পাস এলাকায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলনে শরিক হতে সারাদেশের শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানান। এর কিছুক্ষণ পর বেলা ১১টার দিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তার সঙ্গে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া ও বিইউপির উপাচার্য মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারী। এ সময় তারা দুর্ঘটনাস্থলে আবরারের নামে একটি পদচারী সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে মেয়র জানান, তাদের দাবি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে ছাত্রদের ফিরে যেতে বলেন তিনি। তিনি সেখানে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। যেভাবেই হোক সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বলেন, তাদের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আশ্বাসে আস্থা নেই তাদের। শিক্ষার্থীরা বলেন, এর আগেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় সব দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছিল কিন্তু তারপরও চালকদের বেপরোয়া গতি কমেনি। জাবালে নূরের রুট পারমিট বাতিলের কথা বলা হলেও তা করা হয়নি। কিন্তু আর কত আশ্বাসে থাকতে হবে? আমরা আশ্বাস নয়, সমাধান চাই। তারা পূর্বের ৮ দফা দাবির সঙ্গে আরও কিছু দফা দিয়ে মেয়রের সামনে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তবে বেলা ২টার দিকে মেয়র গাড়ি পাঠিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ জন প্রতিনিধিকে মেয়রের কার্যালয়ে ডেকে নেন। সেখানে প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি দীর্ঘ সময় বৈঠক করেন। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। শাহবাগ মোড়ে আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর। তিনি ছাত্রদের দাবি মেনে নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। বিকাল ৪টার দিকে শাহবাগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন ডাকসুর এজিএস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনে গাড়ির কাগজপত্র ও চালকের লাইসেন্স চেক করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চেকপোস্ট বসানো যেতে পারে। সাদ্দাম বলেন, আমরা ২৩ মার্চ ডাকসুর দায়িত্ব নিচ্ছি, প্রয়োজনে আমরা একটা কমিটি করে দেবো। যাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পরিবহনগুলো শৃঙ্খলা মেনে চলে। আমরা শৃঙ্খলা মানার একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। যাতে পুরো বাংলাদেশ বুঝতে পারে শৃঙ্খলা মেনে পরিবহন চলাচল করতে পারে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত সময়ের মধ্যে দাবি মেনে নেয়ার আল্টিমেটাম দেন। অন্যথায় আজ সকাল ১০টা থেকে ফের আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে গতকালের মতো রাস্তা থেকে সরে যায়। এরপর স্বাভাবিক হয় যান চলাচল।

লাইসেন্স নেই চালকের
ঘটনাস্থলে আবরারের স্মরণে পদচারি সেতুর উদ্বোধনকালে ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম জানান, আবরারকে চাপা দেয়া বাসটির চালকের ভারী যান চালানোর লাইসেন্স ছিল না। যে চালক সুপ্রভাত পরিবহনের বাসটি চালাচ্ছিলেন, তার হালকা যান চলাচলের লাইসেন্স ছিল। এটি নিয়ে তিনি বাসের মতো ভারী যান চালাচ্ছিলেন। এটা কীভাবে সম্ভব! তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আইন অনুযায়ী তার দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। এ সময় ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, সুপ্রভাত পরিবহনের সব বাসের সার্ভিস বন্ধ রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির রুট পারমিট বাতিল করা হয়েছে।

চালক ৭ দিনের রিমান্ডে
আবরারকে চাপা দেয়ার ঘটনার পরই সু-প্রভাত (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৪১৩৫) বাসের চালক সিরাজুল ইসলামকে (২৪) আটক ও রেষারেষিতে থাকা অপর বাসটিও জব্দ করে পুলিশ। রাতে এ ঘটনায় গুলশান থানায় মামলা হয়। গুলশান থানার ওসি (অপারেশন) আমিনুল ইসলাম গতকাল বেলা পৌনে ৩টার পর সিরাজুলকে ঢাকা মহানগর হাকিম দেবদাস চন্দ্র অধিকারীর আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এক সপ্তাহের জন্য আন্দোলন স্থগিতগতকাল বিকালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠকে বসেন আন্দোলনরত বিইউপির শিক্ষার্থীদের ১০ জনের প্রতিনিধি দল। সেখান থেকে ফিরে এক সপ্তাহের জন্য আন্দোলন স্থগিত রাখার ঘোষণা আসে প্রতিনিধিদের কাছ থেকে। আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধি বিউইপির ছাত্র ফয়সাল এনায়েত বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, আগামী ২৮ মার্চ বেলা ১১টায় তারা আবার মেয়রের কার্যালয়ে বৈঠকে বসবেন। সেখানে দাবি পূরণের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। অগ্রগতি দেখে যদি আমরা সন্তুষ্ট না হই, তাহলে আবার বিক্ষোভ শুরু হবে। দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলবে না। সারা দেশের সকল শিক্ষার্থী তাতে অংশ নেবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে, তবে সেটা ২৮ তারিখের পর।কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধি দলটি প্রগতি সরণির বসুন্ধরা গেটে শিক্ষার্থীদের অবস্থানে যান। ফয়সাল এনায়েত সেখানে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানিয়ে কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন। বিক্ষোভকারীদের একাংশ তাতে আপত্তি তুলে অবস্থান চালিয়ে যেতে চাইলেও ঘণ্টাখানেক আলোচনার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে শিক্ষার্থীরা রাস্তা ছেড়ে চলে যায় এবং প্রগতি সরণির ওই অংশ দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বসুন্ধরায় যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে সামনে নর্দ্দা এলাকায় সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন বিইউপির ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী। এ সময় তিনি নির্ধারিত স্থানে রাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ওঠার জন্য জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। আবরারের মৃত্যুর প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসহ ও দায়ী ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেন। একই সাথে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আট দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাসচালকের শাস্তি, নতুন বাসচালকরা যেন যথাযথ নিয়মে ড্রাইভিং লাইসেন্স পান, জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবহার, জেব্রা ক্রসিংয়ের সামনে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপন, প্রগতি সরণির সামনে পদচারী-সেতু স্থাপন। ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরোধ প্রত্যাহার করে। তবে গতকাল সকাল থেকে এ আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত র্যাখার ঘোষণা দেয়া হয়। ওই ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল ৮ দফার আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। এর আগে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর বাসচাপায় মৃত্যুর প্রতিবাদে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। সারা দেশেই তা ছড়িয়ে পড়ে। ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলে ওই আন্দোলন। সেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন নিহত আবরারও। নিরাপদ সড়কের দাবিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেছিলেন তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত