শিরোনাম

ট্রাফিক সপ্তাহেও বেপরোয়া বাস

প্রিন্ট সংস্করণ॥নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০১:০১, মার্চ ২০, ২০১৯

নিরাপদ আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন আবরার আহমেদ চৌধুরী। গত বছর বাসচাপায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনে সোচ্চার ছিল আবরার। সেই আন্দোলন থেমে গেছে। কিন্তু থেমে নেই দুর্ঘটনার নামে মানুষ হত্যা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে দুই বাসের বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় প্রাণ হারালেন উদীয়মান প্রতিভা আবরার আহমেদ চৌধুরী (২০)। নিহত আবরার বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) আন্তর্জাতিক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। সকাল সাড়ে ৭টায় রাজধানীর নর্দ্দায় যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিইউপির বাসে উঠতে যাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস প্রথমে তাকে ধাক্কা দেয়। এরপর চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আবরার নিয়ম মেনে নির্ধারিত জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল। কিন্তু বেপরোয়া বাসচালক তাকে বাঁচতে দিলো না। এদিকে আবরারের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তার সহপাঠীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় নর্থ সাউথ ও ইনডিপেনডেন্টসহ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষ। আবরারের মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদে বসুন্ধরা গেট সংলগ্ন সড়ক থেকে শুরু করে কুড়িল থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত মোট ছয়টি জায়গায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে তারা। এতে সকাল থেকেই ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করার আহ্বান জানালেও শিক্ষার্থীরা তা মানেননি। শিক্ষার্থীরা এর আগে অগোছলোভাবে মেয়রের কাছে ১২ দফা দাবি তুলে ধরেন। পরে নির্ধারিত ৮ দফা দাবি নির্ধারিত করেন। মেয়র বলেন, ঘটনাস্থলেই নিহত শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীর নামে আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ২-৫ জনকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে দাবি-দাওয়াগুলো উপস্থাপন করারও আশ্বাস দেন তিনি। তখন খবর আসে অভিযুক্ত বাসের চালক সিরাজুল (২৯)-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মেয়র আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অভিযুক্তের সর্বোচ্চ বিচারের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, তাদের প্রতিনিধি দল গুলশান থানায় যাবেন। বাসের চালক আটক হয়েছে কি না তা প্রত্যক্ষ করবেন। আটক হলে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তা তারা পর্যবেক্ষণ করবেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা অবরোধ প্রত্যাহার করবেন না। তারা ঘটনাস্থলে ওই জায়গায় আবরারের গায়েবানা জানাজা পড়বেন বলে জানান। এরপর মেয়র ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।ঘটনার পর একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, নিহত আবরার নিয়ম মেনেই রাস্তা পার হচ্ছিল। কিন্তু সুপ্রভাত বাসের চালক অন্য একটি বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পারাপাররত আবরারকে প্রথমে ধাক্কা ও পরে চাপা দেয়। বাসটি আবরারকে খানিকটা টেনেও নিয়ে যায়। আবরারের সহপাঠী আব্দুল কাদির খান বলেন, এর আগে আমরা যে দাবিতে আন্দোলন করেছিলাম ও রাস্তায় নেমেছিলাম, সে দাবি কতটুকু বাস্তবায়ন করা হয়েছে? সড়ক নিরাপদ করার যে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল, তা যে বাস্তবায়ন করা হয়নি, আবরারের মৃত্যুই তার বড় প্রমাণ। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আট দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- পরিবহন সেক্টরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, প্রতি মাসে চালকদের লাইসেন্সসহ সব কাগজপত্র চেক করা, আটক চালক ও সম্পৃক্ত সবাইকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তি, ফিটনেসবিহীন বাস ও লাইসেন্সবিহীন চালক অপসারণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আন্ডারপাস, স্পিড ব্রেকার ও ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, সড়কে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি (আইনের পরিবর্তন), দায়িত্বে অবহেলাকারী প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশকে স্থায়ী অপসারণ, প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চলাচল বন্ধ করে নির্দিষ্ট বাস স্টপ ও যাত্রী ছাউনি করা। অবরোধের কারণে সড়কের দুপাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মেয়র আতিকুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের বলেন, সড়কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যতগুলো সমস্যা রয়েছে, তোমরা আমাদের সঙ্গে থাকো, আমরা একটি একটি করে সমস্যা চিহ্নিত করে সেটা সমাধানে কাজ করবো। সুপ্রভাত পরিবহনের কোনো বাস ওই রুটে চলতে দেয়া হবে না। খুব শিগগিরই ছয়-সাতটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজধানীর বাস চলাচল একটি পদ্ধতির আওতায় আনা হবে। অবরোধকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সব ব্যবস্থা নেব। আপনারা অবরোধ তুলে নেন। অবরোধকারীরা মেয়রের আহ্বানে সাড়া দেননি। তারা মেয়রকে বলেন, জাবালে নূর পরিবহন এখনো চলছে। এখনো প্রতিদিন সড়কে প্রাণহানি ঘটছে। অবরোধকারীদের এমন মন্তব্যের পর মেয়র ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। বিকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন। এ সময় জয়েন্ট কমিশনার (ট্রাফিক উত্তর) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম) শেখ নাজমুল আলম ও উপ-কমিশনার (গুলশান) মোস্তাক আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলেন, ইন্ডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইদা মাহবুব-ই জান্নাত, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের আহমেদ মুইন নাহিদ।শিক্ষার্থীরা বলেন, আপনারা (আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা) নিয়মের কথা বলছেন, আমরা রাস্তায় মরছি- এ পরিস্থিতির সমাধান কবে?এ সময় জয়েন্ট কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঘটনার পরই আমরা ঘাতক বাস ও চালককে আটক করেছি। তোমরা নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করছ, আমরাও এতে অনুপ্রাণিত। কারণ, আমরাও নিরাপদ সড়ক ও যানজটমুক্ত রাজধানীর জন্য কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, তোমাদের এ আন্দোলন আমাদের ওপর চাপ তৈরি করবে এবং কাজকে বেগবান করবে। তোমরা জানো, রাজধানীর ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা ছিল। আমরা সেখান থেকে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করেছি। হয়তো আমরা সবকিছু শেষ করতে পারিনি কিন্তু ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা উত্তরণে বেশকিছু সফলতা পেয়েছি। রাতারাতি সব হয় না, আমাদের সময় দাও।জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম) শেখ নাজমুল আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্যই আমরা এখানে আছি। তাদের প্রতি আমাদের বলপ্রয়োগ করার কোনো পরিকল্পনা নেই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ডিএনসিসি এবং পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের মোটিভেশনের চেষ্টা করছি। তবে তারা আমাদের অনুরোধ এখনো রাখেনি। তারা রাস্তা অবরোধ করে আছে, আমরাও রয়েছি।ডাক্তার হতে চেয়েছিল আবরারআবরারের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। মেডিকেল কলেজে সুযোগ না পেয়ে ভর্তি হয় বিইউপিতে। ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনশিপ (আইআর) বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। তবে আগামী বছর আবারো মেডিকেল ভর্তিপরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।নিহত মেধাবী এ শিক্ষার্থীর বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আরিফ আহাম্মেদ চৌধুরী। মা ফরিদা ফাতেমী। তাদের দুই ছেলের মধ্যে আবরার বড়। বেলা দেড়টার দিকে মিরপুর সেনানিবাসের মধ্যে বিইউপি এডিবি গ্রেড গ্রাউন্ড মাঠে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় আবরার আহমেদের বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আরিফ আহমেদ চৌধুরী, বিইউপির ভিসি মেজর জেনারেল মো. এমদাদ-উল বারী, ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম, আবরার আহমেদের সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আত্মীয়-স্বজন জানাজায় অংশ নেন। পরে দাফনের জন্য আবরারের লাশ বনানী কবরস্থানের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আবরারকে দাফন করা হয়। এ সময় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে ‘এ’ এবং ‘ও’ লেভেল পাস করেছিলেন আবরার। তার ছোট ভাই আবীদ আহমেদ চৌধুরী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র। বসুন্ধরা ডি ব্লকে ভাড়া বাসায় থাকতেন তারা। ছেলেকে শেষ বিদায় দিতে এসে মা ফরিদা ফাতেমী চিৎকার করে বলেন, ‘আমার বাবাকে কখনো একা ছাড়তে চাইতাম না। ও বলতো, আম্মু তুমি যদি আমাকে একা চলাফেরা করতে না দাও, তবে আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট হবো কীভাবে? সবাই আমার বাবাটাকে অনেক পছন্দ করতো। পরিবারের মাথার মুকুট ছিলি তুই। আমাদের একা ফেলে চলে গেলি কীভাবে? আমি কীভাবে তোকে ছাড়া থাকব? তুই একবার ফিরে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে মা বলে ডাক বাবা।’ছেলেকে কবরে শুইয়ে দেয়ার দৃশ্য দেখে আবরারের বাবা মুষড়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘জীবনে অনেক কষ্টের সময় পার করেছি। ছেলেকে কবরে শুইয়ে দেয়ার মতো কষ্ট আর কিছুর সঙ্গে মিলবে না। জীবনের সকল সফলতা যেন একটি ঘটনায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। আমার বাবাটা আর আমার কাছে আসবে না, কোনো দিন আর আমি তার মুখে বাবা ডাক শুনতে পারব না।’এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় অবরোধ তুলে নেয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। আজ সকাল ৮টা থেকে ফের অবরোধের ঘোষণা দেন তারা। গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-অপারেশন) আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘাতক সুপ্রভাত বাস ঢাকা-মেট্রো-ব-১১-৪১৩৫ চালককে আটক করা হয়েছে। চালকের নাম সিরাজুল ইসলাম (২৯)। তার ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা যাচাই-বাছাই চলছে। এ ঘটনায় হেলপার পলাতক রয়েছে। তাকে ধরতে অভিযান চলছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত