শিরোনাম

বিশ্বে যেভাবে পালিত হয় বড়দিন

প্রিন্ট সংস্করণ॥জিয়া উল ইসলাম  |  ১১:২৯, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮

খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব বড়দিন। খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যিশুখ্রিস্ট এ দিনে বেথলেহেমে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, সৃষ্টিকর্তার মহিমা প্রচার এবং মানবজাতিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে প্রভু যিশুর এ ধরায় আগমন ঘটেছিল। বড়দিন, ক্রিসমাস বা ‘এক্সমাস’ যে নামেই ডাকা হোক না কেন ২৫ ডিসেম্বর মানেই খ্রিস্টান ধর্মালম্বীদের অনেক আনন্দ। বিশ্বের অনেক দেশেই দিনটিতে সরকারি ছুটি থাকে। ২৪ ডিসেম্বর রাতে ক্রিসমাস ইভ বা বড়দিনের সন্ধ্যা পালনের মধ্যদিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটি উদযাপন। যিশুর জন্মের আগের দিন ২৪ ডিসেম্বর ক্রিসমাস ইভ পালন হয় বিশ্বজুড়ে। খ্রিস্টান ধর্ম মতে, যিশুর জন্ম হয়েছে ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত মধ্যরাতে। ক্রিসমাস ইভে মধ্যরাতে যিশুর জন্মের সময়ের আগমুহূর্তে মানুষরা গির্জায় জড়ো হন। এ সময়ের আগেই উপহার আদান-প্রদান করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড়দিন উদযাপন হয় যেভাবে তা হলো : ইতালিতে বড় দিনের উৎসব শুরু ৮ ডিসেম্বর শেষ হয় ৬ জানুয়ারি। সে দিনই ক্রিসমাস ট্রি তৈরি হয়ে যায় ইতালিতে। যিশুর জন্মের সময়ের ছবি ফুটিয়ে তুলতে মা মেরি, জোসেফ, যিশু, একটি গাধা ও একটি হাঁসও তৈরি করে। এটাকে তারা প্রিসেপ বলে। ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন। সেদিন ওরা সব প্রিসেপে আর ক্রিসমাস ট্রি তুলে ফেলে। ইতালিতে বড়দিনের আরেকটা মজা আছে। ওখানকার বাচ্চারা বড়দিনে রাখাল সেজে পাইপ বাজিয়ে বাজিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বড়দিনের গান গায় আর ছড়া কাটে। বিনিময়ে সব বাড়ি থেকে তাদের টাকা দেয়া হয়। আর সে টাকা দিয়ে ওরা বড়দিনের উপহার কেনে। ইউরোপ-আমেরিকানদের মতো করেই পালন করে বড়দিন অস্ট্রেলিয়া। বড়দিনে অস্ট্রেলিয়ায় খাবার-দাবারের মধ্যে একটা বিশেষ পুডিং থাকে। সে পুডিংয়ের ভেতরে এক টুকরো সোনা থাকে। সে সোনার টুকরোটা যার ভাগ্যে পড়ে, ধরে নেয়া হয়, তার ভাগ্য খুবই ভালো। ক্যাঙ্গারু অস্ট্রেলিয়ায় এক ঐতিহ্যবাহী প্রাণী। আর এই ক্যাঙ্গারু সান্তার গাড়িটি টেনে নিয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিসমাসের দিন দুটি বড় বড় খেলাও অনুষ্ঠিত হয়। এটাও ওদের ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটার নাম বক্সিং ডে টেস্ট। ডিসেম্বরের ২৫-২৬ তারিখকে ওরা বলে বক্সিং ডে, আরেকটা খেলা হয় ইয়ট রেস। সিডনি থেকে হোবার্ট পর্যন্ত হয় এই ইয়ট রেস। ক্রিসমাসের আগে তারা ক্রিসমাসের আগমনী বার্তা সবাইকে জানিয়ে দিতে অ্যাডিলেডে ৪ লাখ মানুষের শোভাযাত্রার আয়োজন করে। এ ছাড়াও মেলবোর্নে ‘ক্যারোলস বাই ক্যান্ডললাইট’ নামে একটা মিউজিক্যাল শো হয়। ব্রাজিলে বড় বড় শহরগুলো পুরোই সেজেগুজে বড়দিন পালন করে। এমনকি তুষার পড়ে না বলে ওরা অনেক সময় ক্রিসমাস ট্রির উপর তুলা দিয়ে বরফের মতো বানিয়ে রাখে! আর সবচেয়ে মজা হয় কিউরিতিবা শহরে। সেখানে যাকে বলে ঘরবাড়ি সাজানোর প্রতিযোগিতাই হয়! ক্রিসমাসের দিন বিচারকরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাদের বাসা সবচেয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে, তা খুঁজে বের করেন। তারা চকলেট আর কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে তৈরি এই বিশেষ খাবারটির নাম- ব্রিগেডেইরো খায়। আর ২৪ ডিসেম্বর রাত ১২টা বাজলেই, মানে ২৫ ডিসেম্বর হওয়ার সাথে সাথে ওদের চার্চগুলোতে ‘মিসা দ্য গ্যালো’ উদযাপন করা হয়। মেক্সিকোতে ক্রিসমাসে ৯ দিন ধরে শহরের মানুষরা শহরের ঘরের দরজা থেকে দরজায় ঘুরে বেড়ায়। আসলে বেথলেহেমে আসার পর মা মেরি যিশুকে নিয়ে দিনের পর দিন এভাবে মানুষের ঘরের দরজা থেকে দরজায় ঘুরে বেড়িয়েছিল; কিন্তু কেউ তাকে আশ্রয় দেয়নি। সেই করুণ ঘটনা স্মরণ করেই তারা এই আচার পালন করে। মেক্সিকানদের ক্রিসমাসের উৎসবও ১২ ডিসেম্বর ‘লা গুয়াদালুপানা’ নামের ভোজ দিয়ে শুরু হয়ে শেষ হয় ৬ জানুয়ারি, ‘এপিফানি’ নামের ভোজ দিয়ে। এ ছাড়াও মাঝরাতে শিশুদের স্টকিং (মোজা) উপহারে দেয় তারা। সেই পুরনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে রাশিয়া বড়দিন পালন করে ৬ জানুয়ারি। ক্রিসমাস আর নববর্ষ একসঙ্গে, ওদের নববর্ষের উদযাপনেও ঠিক মধ্যেখানে একটা ক্রিসমাস ট্রি রাখা হয়। ওরা ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে পাইন গাছের বদলে বেশির ভাগ সময়েই ব্যবহার করে স্প্রাস গাছ। ১৭ শতকে পিটার দ্য গ্রেট ইউরোপে ঘুরতে এসে ক্রিসমাস উদযাপন করতে দেখেন। আর ওদের উদযাপন দেখে তার এতই ভালো লেগে যায়, তিনি রাশিয়াতেও গিয়ে তার প্রচলন করেন। বড়দিনে নাইজেরিয়ার মানুষ বড় শহর ছেড়ে গ্রামের ছুটে আসে। কেনাকাটা করে ওখানে বড়দিনের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- ওরা কিন্তু বড়দিনের কেক তেমন একটা তৈরি করে না; ওরা রান্না করে নানা পদের মাংস, স্থানীয় নাম জুলোফ রাইস, টুয়ো, ফুফু ইত্যাদি রান্না করে উৎযাপন করে। আমগাছ বা কলাগাছ দিয়ে ভারতে ক্রিসমাস ট্রি সাজিযে পালিত হয়। আবার দক্ষিণ ভারতে, তামিলনাড়ু কেরালা- কর্ণাটক- অন্ধ্র প্রদেশের মানুষরা ঘরের ছাদে ছোট ছোট মাটির প্রদীপ জ্বালায়। তবে শহুরে খ্রিস্টানরা আবার পশ্চিমাদের মতোই, মানে ইউরোপ-আমেরিকানদের মতোই বড়দিন উদযাপন করে।বাংলাদেশে বড়দিনে সরকারি ছুটি থাকে। বড়দিন উপলক্ষে বড় বড় হোটেলগুলোতে তো বিশেষ আয়োজন থাকেই, সাজানো হয় ক্রিসমাস ট্রিও। অন্য দেশে যেখানে পাইন গাছ দিয়ে ক্রিসমাস ট্রি বানানো হয়, সেখানে আমাদের দেশে সাধারণত ব্যবহৃত হয় ঝাউগাছ। আবার ক্রিসমাসের খাবার হিসেবে বিশেষ কেকের পাশাপাশি উৎসবে পিঠা-পুলি, পোলাও, মাংস, বিরিয়ানি, এসবও থাকে। ক্রিসমাস ক্যারল বা ক্রিসমাসের যে গানগুলো গাওয়া হয়, সেগুলোও সব ইংরেজি গানই গাওয়া হয় না, তার মধ্যে থাকে ভাটিয়ালী গান, কীর্তন, এমনকি রবীন্দ্রসঙ্গীতও থাকে। ২৪ ডিসেম্বর রাতে ভ্যাটিকানে শুরু বড়দিনের কার্যক্রম। বড়দিনের আগের রাতের সন্ধ্যায় ক্রিসমাস ইভ সমাবেশে বক্তৃতা দেন পোপ। এই বক্তৃতায় বিশ্বে অনেক বিষয় তুলে ধরা হয় সবাই প্রার্থনা করে কাটান দিনটি। এ ছাড়াও মিসর, তুরস্কের কঙ্গো প্রজাতন্ত্র , যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, চীন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই চার্চে ধর্মীয় সমাবেশ মাধমে পালিত হয় বড় দিন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত