শিরোনাম

রবিউল আউয়াল মাসের অধিক ফযিলত

আমার সংবাদ ডেস্ক  |  ১৮:১৯, নভেম্বর ২৭, ২০১৮

রবিউল মাসের মধ্যে রবিউল আউয়াল বিশেষভাবে উলেল্গখযোগ্য। কেননা এ মাসেই হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) দুনিয়ায় আগমন করেন। আবার এ মাসেই তিনি আল্লাহ প্রদত্ত রিসালাতের সব দায়িত্ব পালন শেষে আল্লাহতায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে মাওলার সান্নিধ্যে গমন করেন। নবীর (সা.) সুন্নতকে মানবজীবনে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আলেমরা এ মাসে বেশি বেশি করে হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) জীবনী আলোচনা করে থাকেন।

কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা সর্বশেষ নবী হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরাও নবীর জন্য রহমতের দোয়া কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।’-সূরা আহযাব : ৫৬

হাদিসে আছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করবেন।’-আবু দাউদ

উপরোক্ত আয়াত ও হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি ভালোবাসা প্রত্যেক মুমিনের প্রতি অবশ্য কর্তব্য ও ইমানের অঙ্গ। প্রখ্যাত সাহাবী হজরত আনাস (রা.) ও হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ওই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ পরিপূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তার কাছে নিজ নিজ পিতা-মাতা, সন্তান ও সব মানুষ হতে প্রিয় না হই।’-সহিহ বুখারি

এই হাদিসের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) ভালোবাসাকে অপরাপর ভালোবাসার ঊধর্ে্ব স্থান দেওয়া ও রাসূলের হুকুমের অনুগত থাকা ইমানের পূর্ণতা লাভের পূর্বশর্ত। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে নবী! আপনি বলুন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা-মাতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাইবোন, তোমাদের পত্নী, তোমাদের বংশ, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের এমন ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ কর; আল্লাহতায়ালা ও তার রাসূল এবং তার রাহে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় না হয়, তাহলে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।’-সূরা তওবা : ২৪

এ আয়াতের মর্ম হলো, যারা দুনিয়াবি সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিয়ে আল্লাহ ও তার রাসূলের সম্পর্ককে উপেক্ষা করেছে তাদের করুণ পরিণতির দিন সমাগত। দুনিয়ার মধ্যেই সে আজাব আসতে পারে। তবে আখেরাতের আজাব অবশ্যই ভোগ করতে হবে। উলিল্গখিত আয়াতে সব মুমিনের প্রতি এ আদেশ দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা এমন উন্নত স্তরে রাখা ওয়াজিব, যে স্তরে অন্য কারও ভালোবাসা স্থান পায় না। তাই যার ভালোবাসা এ স্তরে নেই সে শাস্তির যোগ্য অপরাধী। সুতরাং মানবজীবনে সামগ্রিক সুখ-শান্তি পেতে হলে সর্বক্ষেত্রে নবীর (সা.) তথা সুন্নতের অনুসরণ অপরিহার্য।

বর্তমান বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও ক্ষমতাবানদের নানাবিধ জুলুম-নির্যাতন, ফেতনা-ফ্যাসাদসহ যাবতীয় অন্যায়-অত্যাচারের মূলোৎপাটন ঘটাতে হলে হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। মানবসমাজে সত্য ও ন্যায়ের রাজত্ব কায়েম করে শান্তি ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিশ্চয়তা বিধান দিতে পারে একমাত্র তাঁরই আদর্শ। কারণ, ইসলাম বাদে অন্য কোনো ধর্ম পূর্ণতায় পৌঁছানি।

সেসব ধর্মের প্রবক্তারা নিজ নিজ পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ধর্মপ্রচার করেছিলেন। সুতরাং হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) আনীত পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। শুধু রবিউল মাস এলেই অশ্রুসিক্ত নয়নে নবীকে স্মরণ করার প্রবণতা মন থেকে মুছে ফেলতে হবে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। এটা প্রত্যেক মুমিনদের জন্য ফরজ।

সুতরাং নবীর স্মরণে শুধু দরুদ-সালাম পেশ নয়, অশ্রুসিক্ত মোনাজাতে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখে নয়, আমাদের পথ চলতে হবে হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি পূর্ণ ভালোবাসা রেখে তাঁর রেখে যাওয়া নীতি-আদর্শ, শিক্ষা তথা আল্লাহতায়ালার বিধানগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। তবেই তো সার্থক হবে আমাদের জীবন। নচেৎ রবিউল আউয়ালের স্মরণে, রবিউল আউয়ালের আগমনে আমাদের কোনো ফায়দা হবে না।

অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের মুসলিম সমাজের কিছু লোক নবী প্রেমের নামে হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) জীবনাদর্শ ও সুন্নতকে বাদ দিয়ে নানাবিধ আচার-অনুষ্ঠানকে রবিউল আউয়াল মাসের অন্যতম অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলেছে। বস্তুত এ কার্যাবলির কোনো শরয়ী ভিত্তি নেই। সত্যিকারার্থে হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) ভালোবাসার অর্থ হলো, তিনি যেসব গুণে গুণান্বিত ছিলেন সেগুলোর চর্চা করা ও নিজেদের মাঝে সেগুলোর বাস্তবায়ন করা এবং যেসব বিষয় তিনি পরিহার করেছেন ও পরিহার করতে বলেছেন তা পরিহার করা। এ মর্মে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রাসূলের (সা.) আনীত দ্বীনকে তোমরা আঁকড়ে ধর, আর যা তিনি নিষেধ করেছেন তা পরিহার কর।’-সূরা আল হাশর : ৭

হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমাদের মধ্য থেকে যারা পরকালে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আশা রাখে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ -সূরা আহযাব : ২১

হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) আদর্শ ও গুণাবলি সম্পর্কে হজরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) চরিত্রই হলো আল কোরআন। অর্থাৎ কোরআনে বর্ণিত সব গুণাগুণ যেমন_ সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা, আমানতধারী, কোমল স্বভাব, আত্মীয়তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, এতিম-অসহায় ও বিধবাদের সহায়তা করা, গৃহপরিচারিকা, অধীন, স্ত্রী, পরিবার-পরিজনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছিল।

তাই আমাদের উচিত হলো, শুধু রবিউল আউয়াল মাসেই রাসূলের (সা.) ভালোবাসাকে সীমিত না রেখে বছরের প্রতিটি দিনে, প্রতিক্ষণে, প্রতি মাসে মোটকথা_ জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) সুন্নতের অনুসরণের মাধ্যমে তাঁর রেখে যাওয়া জীবনাদর্শকে বাস্তবায়ন করা।

আরও পড়ুন- ৫ ওয়াক্ত নামাযের সঠিক নিয়মাবলী

হিজরি সনের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল শুরু হয়েছে। এ মাস মানব ইতিহাসের উজ্জ্বলতম অধ্যায়ের স্মারক। এ মাস মুসলমানদের কাছে একই সঙ্গে শোকের ও আনন্দের। প্রসিদ্ধি রয়েছে যে, রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে নবী করিম (সা.) জন্মগ্রহণ করেছেন ও ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু ঐতিহাসিকদের বিশাল একটি দল নবী করিমের (সা.) জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ কোনোটিই নিশ্চিতভাবে ১২ রবিউল আওয়াল বলা ঠিক নয় বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অনেক গবেষকই নবীর (সা.) জন্ম তারিখ ৯ রবিউল আউয়াল সোমবার ও ওফাতের তারিখ ২ রবিউল আউয়াল সোমবারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ঐতিহাসিকদের মতভেদ সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্বে ১২ রবিউল আউয়ালকেই নবী করিমের (সা.) জন্ম ও মৃত্যু দিবস ধরা হয়।

তবে এখানে কাকতালীয় একটি বিষয় হলো, নবী করিমের (সা.) জন্ম ও মৃত্যু তারিখ যাই হোক ঐতিহাসিকরা এ ব্যাপারে একমত যে, দিন দু’টি ছিল সোমবার। এটা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাই নবী করিমের (সা.) জন্মের কারণে বছরের প্রতিটি সোমবার অতি মূল্যবান হয়ে গেছে। প্রতি সপ্তাহের এ দিনে নফল রোজা রাখার অনেক ফজিলত। দিন হিসেবে এটা পরিপালিত হয়ে থাকে, তারিখ দেখে নয়। এ দিনে রোজা রাখা প্রকৃত নবী প্রেমের বহিঃপ্রকাশ।

এ প্রসঙ্গে হাদিস ইরশাদ হয়েছে, ‘নবীজিকে (সা.) সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনে আমাকে নবুওয়ত দান করা হয়েছে।’ মুসলিম

মুসলিম শরিফে বর্ণিত বিশুদ্ধ এই হাদিস দ্বারা মহানবী (সা.) তার জন্মদিনে উম্মতের করণীয় কী, তা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই প্রকৃত নবী-প্রেমিক হতে হলে প্রতি সোমবার রোজা রাখা চাই। সেই সঙ্গে রোজা বৃহস্পতিবারও রোজা রাখা উচিত। এসব আমল বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

অন্য আরেক হাদিসে নবী (সা.) বলেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়ে থাকে। অতএব রোজা অবস্থায় আমার আমলনামা পেশ করা হোক, এটা আমি পছন্দ করি।’ তিরমিজি

তাই আসুন, নবীপ্রেমে আমরা প্রতি সোমবার নফল রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে তুলি। রোজা অবস্থায় আল্লাহর দরবারে আমাদের আমলনামা পেশ করার সৌভাগ্য অর্জন করি। যদি কোনো কারণে সারা বছর এ রোজা পালনের তওফিক না হয়, কমপক্ষে রবিউল আওয়াল মাসে এ ইবাদতে নিজেকে ব্যস্ত রাখি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত