শিরোনাম

আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ  |  ০০:১৯, নভেম্বর ২১, ২০১৮

আজ ১৪৪০ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ। মুসলমানদের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক দিন। এইদিনে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা দুজাহানের বাদশা জগতকূলের শিরোমনি সর্বশ্রেষ্ট নবি হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ও ওফাত দিবস। এই দিনটি মুসলমানরা বিভিন্ন আয়োজনে, নামাজ-রোজা ও ইবাদতের মাধ্যমে পালন করেন। দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা. নামেও পরিচিত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, আজ থেকে ১৪৪৮ বছর পূর্বে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে সুবহে সাদিকের সময় মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত কোরাইশ বংশে মা আমিনার গর্ভে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পূর্বেই তিনি পিতৃহারা হন এবং জন্মের অল্পকাল পরই প্রিয় মাকে হারান। দুঃখ-কষ্ট ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চাচা আবু তালেবের আশ্রয়ে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। চল্লিশ বছর বয়সে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব লাভ করেন। নবুওয়াতের দায়িত্ব পেয়ে তিনি তৎকালীন অসভ্য বর্বর ও পথহারা জাতিকে সত্যের সংবাদ দিতে তাদের কাছে তুলে ধরেন আল্লাহর একত্ববাদের বাণী। কিন্তু অসভ্যরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াত গ্রহণ না করে তাঁর ওপর নির্যাতন শুরু করে। তাঁর দাওয়াতি কাজকে থামিয়ে দিতে নানামুখি চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করতে থাকে একের পর এক। কিন্তু নবি করিম (সা.) তাতে দমে যাননি। বরং আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা করে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনবাজি রেখে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকেন। ফলে ধীরে ধীরে সত্যান্বেষী মানুষ তার সঙ্গী হতে থাকে। অন্যদিকে কাফিরদের ষড়যন্ত্রও প্রবল আকার ধারণ করে। এমনকি একপর্যায়ে তারা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার পরিকল্পনা করে। তখন নবি করিম (সা.) আল্লাহর নির্দেশে জন্মভূমি ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় তিনি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করেন এবং মদিনা সনদ নামে একটি লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেন। যা পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবে পরিচিত। এ সংবিধানে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানসহ সবার অধিকার স্বীকৃত হয় যথাযথভাবে। মদিনায় হিজরতের পর মক্কার কাফিরদের সঙ্গে নবি মুহাম্মাদ (সা.)-কে বেশ কয়েকটি যুদ্ধও করতে হয়। সম্মুখিন হতে হয় নানাবিধ প্রতিকূল পরিস্থিতির। এভাবে ২৩ বছরের নিরন্তর শ্রম সাধনায় অবশেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিজয় অর্জন করেন। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তা পূর্ণতা লাভ করে। অতঃপর বিদায় হজের ভাষণে তিনি আল্লাহর বাণী শোনান বিশ্ববাসীকে। বলেন, আজ থেকে তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ করে দেওয়া হলো। তোমাদের জন্য দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থা হিসেবে একমাত্র ইসলামকে মনোনীত করা হয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রেখে যাওয়া সেই শান্তি প্রতিষ্ঠার আদর্শ থেকে মুসলমানরা বিমুখ হওয়ায় বর্তমান বিশ্বে অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে বলে ইসলামি স্কলাররা মনে করেন। ইসলাম বিরোধীদের হাতে আজ বিশ্বের সর্বত্র মুসলমানরা নানাভাবে নিগৃহীত হচ্ছে। অন্যায়, অবিচার, হত্যা আর বর্বরতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নবি করিম (সা.) যে পথে, যে আদর্শের ভিত্তিতে তৎকালীন অসভ্য সমাজের শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আমাদের সামনে এখনও সেই আদর্শ, সেসব উপকরণ বিদ্যমান। তাই বর্তমান অশান্ত এই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.)-এর মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই বলেও ইসলামি বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন। আজ ১২ রবিউল আউয়াল (মিলাদুন্নবী সা.) উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এই দিনে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনের ওপর আলোচনা, সেমিনার ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনসহ বিভিন্ন চ্যানেল বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে থাকে। জাতীয় দৈনিক ও অনলাইনগুলো বিশেষ প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করে থাকে।
ইসলামি স্কলারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আল্লাহর হাবিব ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ হযরত রাসুলে আকরাম (সা.) সমগ্র বিশ্বে জুলুম, অত্যাচার, অবিচার, নির্মম নির্যাতন, ফেতনা-ফ্যাসাদ, পৈশাচিকতা, হত্যাকা-ের মূলোৎপাটন ঘটিয়ে সত্য ও ন্যায়ের রাজত্ব কায়েম করে বিশ্বমানবের কল্যাণ, মুক্তি ও মানবতা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছিলেন। মানব জাতির সঠিক (সিরাতুল মুস্তাকিম) পথের নির্দেশনায় হযরত রাসুল (সা.)-এর মতো অন্য কোনো মানব বিশ্বজনীন আহ্বান রাখতে পারেননি। তারা নিজ নিজ সীমিত পরিসরে ধর্ম প্রচার ও প্রসার করেছিলেন। এ মাসে তাই আমরা মহানবি হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর সিরাত অর্থাৎ জীবন আলোচনা, পবিত্র কুরআন পাঠ, দরসে হাদিস, দরূদ, সালাত ও সালাম এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিকের ওপর সবিস্তার আলোকপাত করে নিজ নিজ জীবনে বাস্তবায়িত করার ব্রত নিয়ে নিজ কর্তব্য বলে মনে করেন আলেমরা। এই দিনটাকে কিছু মুসলমান ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ নামে পালন করেন। ১২ রবিউল আউয়ালে নবি (সা.)-এর জন্মদিবস পালন করে র‌্যালি বের করে, মিষ্টি ও শিরনি বিতরণ করে। এটাকেই রাসুল প্রেম জ্ঞান করেন। তবে এব্যাপারে দেশের কওমি মাদরাসা ও আলিয়া মাদরাসার অধিকাংশ আলেমরা বেদআ’ত বলে দাবি করেছেন। তারা আরও বলেন, ইসলামে ঈদে মিলাদুন্নবি বলতে কিছু নেই। ইসলামে ঈদ দুটি। এর বাইরে কোনো ঈদ নেই। তারা বলেন, নবি কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিবস কি ১২ রবিউল আউয়াল? নিশ্চিত ও সর্ব সম্মতভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত বা মৃত্যু দিবস কি ১২ রবিউল আউয়াল নয়? যে দিনে রাসুলে কারীম সা. ইন্তেকাল করলেন সেদিনে আনন্দ উৎসব করা কি নবি-প্রেমিক কোনো মুসলমানের কাজ হতে পারে? শরীয়তের দৃষ্টিতে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা কি জায়েয? এব্যাপারে তারা বলেন, এটি রাসুলুল্লাহ (সা.) কিংবা তাঁর খলিফাদের সুন্নাত ছিল না। ফলে এটি একটি নিষিদ্ধ নব উদ্ভাবন। কেননা নবিজী (সা.) বলেছেন : আমি তোমাদের আমার এবং আমার পরবর্তী সঠিক পথপ্রাপ্ত খলিফাদের অনুসরণের ব্যাপারে তাগিদ দিচ্ছি; তোমরা একে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাক। [দ্বীনের মধ্যে] নব উদ্ভাবিত বিষয় সম্পর্কে সাবধান হও, কেননা প্রতিটি নবোদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত এবং প্রতিটি বিদআতই হচ্ছে পথভ্রষ্টতা, আর প্রতিটি পথভ্রষ্টই জাহান্নামী। (আহমাদ, তিরমিযী)। এভাবেই হাদিসের বাণী তুলে ধরে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা ঠিক নয়। সারা পৃথিবীর মুসলমানরা দোয়া-দরূদ ও বিভিন্ন প্রকার ইবাদতের মাধ্যমে দিনটি পালন করবে। আমাদের দেশেও দিবসটি পালনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। মুসলমানদের এ দিবসটি পালনে অধিক আগ্রহ দেখা যায়। দিনটির মর্যাদায় দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত